Life of Pi – দর্শককে নির্বাক বিস্ময়ে ফেলে রাখে যে মুভি

The-Life-Of-Pi-movie-poster

কিছুক্ষন আগে মুভিটা দেখে শেষ করলাম। ডিনার সেরে লিখতে বসলাম। একটা পূর্ণাংগ রিভিউ লেখার ইচ্ছে আছে। এর আগে লিখেছিলাম মূলত তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া। রিভিউ এর আগে এই মুভি বিষয়ক কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:

১. আইডিএম রেটিং – ৮.৩
২. পরিচালক: আং লি (কানাডিয়ান)
৩. চিত্রনাট্য: ডেভিড ম্যাজে
৪. উপন্যাসের লেখক: ইয়ান মার্তেল
৫. অভিনয়: সুরজ শর্মা (প্রধান চরিত্র), ইরফান খান (প্রধান চরিত্র-গল্পকার রূপে), আদিল হুসেইন (প্রধান চরিত্রের বাবা) , টাবু (প্রধান চরিত্রের মা)
৬. মুক্তি পেয়েছে: ২১ নভেম্বর ২০১২, আমেরিকাতে।
৭. মুভি নির্মানে ব্যয় হয়েছে: ১২ কোটি ইউএস ডলার। (প্রায়)
৮. এখন পর্যন্ত আয় করেছে:  ৯ কোটি ৭০ লাখ ইউএস ডলার। (প্রায়)
৯. ঘরানা: ফ্যান্টাসি, এ্যাডভেঞ্চার এবং ড্রামা।
১০. রিলিজ ফরম্যাট: থ্রিডি।
১১. মুভির নাম: পাই এর জীবন। [Life of Pi]

সাইনোপসিস:

শুরুটা যেভাবে হয়: গল্পের শুরুটা হয় মূলত মনোলগ বা স্টোরি টেলিং লগ দিয়ে। গল্পকার ও প্রধান চরিত্র ইরফান খান (প্রাপ্তবয়স্ক পাই) তার একজন লেখক বন্ধুকে তার জীবনের একটি গল্প বলছে। লেখক বন্ধুটি একটা উপন্যাসে হাত দেয়। কিন্তু বেশীদূর এগোতে পারে না। কিছু অংশ লিখে ক্ষান্ত দেয়। তখন সে ঘটনাক্রমে পাই এর কাছে আছে নতুন একটি গল্পের খোজেঁ। পাই পাতেল গল্প বলা শুরু করে। তার জীবনের সেরা এবং একমাত্র গল্প! লেখক বন্ধু অবাক-বিস্মিত শ্রোতা হয়।

প্লট/বিশ্লেষন:

ঘটনার মূল পটভূমি ১৯৫৪ সালের যখন সবেমাত্র ফরাসিরা ভারতের পন্ডিচেরী অংশটা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে হস্তান্তর করেছে। পাই পাতেল একটা ১৬ বছরের কিশোর যে কিনা সেই পন্ডিচেরীতে জন্মগ্রহন করেছে। তার জন্ম এবঙ বেড়ে ওঠা দুটোই হয় তার ব্যবসায়ী বাবার মালিকানাধীন একটা চিড়িয়াখানায়। মুভির একটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র, রিচার্ড পারকার, আদতে একটা রয়েল বেঙ্গল টাইগার, তার সাথে প্রথম পরিচয় হয় তার বাবার চিড়িয়াখানাতেই।

পাই ছোটবেলা থেকেই প্রচন্ড আস্তিক একজন মানুষ হিসেবে বড় হয়। সে হিন্দু, ইসলাম এবং ক্রিশ্চানিটি – তিনটা ধর্মেই একসাথে পালন করে। সে পুজো দেয়, সে নামায পড়ে, সে চার্চে যায়। জীবনের প্রখরবোধ তাকে স্রষ্টার উপর অবিচল আস্তা রাখতে শেখায় যা কিনা তার জীবন বাচিঁয়ে দেয়।

সরকারের সাথে একটা ঝামেলা হবার কারনে পাই এর বাবা কানাডাতে পাড়ি জমাতে চায় সপরিবারে। তার আগে বিক্রি করে দেয় বসতবাড়ি, ব্যবসা আর চিড়িয়াখানাটা। নিজের বলতে থাকে শুধু চিড়িয়াখানার জন্তুগুলো। সে সব সে একে একে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের চিড়িয়াখানাকে বিক্রি করে দেবার চেষ্টা করে।

পাই তার বাবা-মা ও এক বড় ভাইকে নিয়ে পাড়ি জমায় জাপানিজ একটা নৌযানে। সেখানে বিট্রিশ এ্যালায় ফরাসিরা যে কি পরিমান রুক্ষ ও দুর্নিবার অভদ্র, কানাডিয়ান পরিচালক সেটা ফুটিয়ে তোলেন রান্নাঘরের পাচক আর পাই এর বাবার কথপকথনের মাধ্যমে।

ইতিমধ্যে একদিন প্রচন্ড এক ঝড় ওঠে সমুদ্রে বুকে। পাই বিছিন্ন হয়ে পড়ে তার পুরো পরিবারের কাছ থেকে। দুর্ঘনটাক্রমে পাই একটা শিপরেক (লাইফবোটের চেয়ে আকারে বড়, অনেকটা আমাদের দেশের ট্রলারের মতো) উঠে পড়ে। সংগী হয় একটা জেব্রা, শিপরেকের তাবুর নীচে লুকিয়ে থাকা একটা হিংস্র হায়েনা, একটা হনুমান আর একটা রয়েল বেঙ্গল টাইগার। মূল সিনেমা বা পাই এর মূল গল্প এখানে থেকেই শুরু হয়। সেটা শেষ হয় টানা ২২৭ দিন সমুদ্রের বুকে অমানুষিক লড়াই করে টিকে থাকার মধ্য দিয়ে। এই লড়াই ছিলো যেমন ক্ষুধা-তৃষ্ণা আর পানির বিরুদ্ধে তেমনি ছিলো নিজের আর তার সাথে থাকা পশুদের বিরুদ্ধেও।

পাই এর সামুদ্রিক জীবনকে আমরা নীচের ছবির মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারি:LifeOfPiChart_FULL

দর্শন আর এ্যাডভেঞ্চারের চমৎকার মিশেল ভিন্নধর্মী এই মুভিটি ইতিমধ্যেই সারা বিশ্বে বেশ হৈ চৈ ফেলে দিয়েছে। মুভির এনিমেল স্পেশাল ইফেক্টগুলো সিম্পলী সুপার্ব!! পরিচালকে জান প্রাণ দিয়ে খেটেছেন মুভিটা বানানোর জন্য, সেটা বোঝা যায় তার শুটিং স্পট আর ইস্পেশাল ইফেক্টগুলা দেখলে।

এর মাঝে একবার দেখানো হয় পাই’র শিপর‍্যাক অত্যন্ত নয়নাভিরাম একটা দ্বীপে এসে ভিড়েছে। দ্বীপের মূল বাসিন্দা লাখ লাখ মিরকাত। [এক প্রকার প্রাণী বিশেষ।] কিন্তু দ্বীপটা যে আসলে আস্ত একটা জ্যান্ত কারনিভোরাস [অনেকটা ভেনাস ফ্লাই ট্র্যাপের মতো একটা ফাদঁ, যেটা দিয়ে পশুপাখি ধরে তাদের মাংস খাওয়া হয়।] আর তার টলটেলে স্বচ্ছ জলাধারগুলো যে রাতের অন্ধকারে বিষাক্ত এসিডে পরিণত হয়,  সেসব দর্শক ঘুনাক্ষরেও টের পাবে না। এই অংশটুকু দেখে আমার বারবারই মনে হচ্ছিলো, আমি কল্পবিজ্ঞানী লেখক জুলভার্ণের কোন একটা বিখ্যাত উপন্যাসের চিত্রায়ন দেখছি। শুধুমাত্র দ্বীপের অংশটুকুর শুটিং এর জন্যই পরিচালককে ১০ এ ১০ দিতে আমি আপত্তি করবো না।

অসাধারন এর সংলাপ, মিউজিক, কোরিওগ্রাফি, প্রধান চরিত্রের ম্যাকাপ, সিনেমাটোগ্রাফি আর কাহিনীর ধারাবাহিকতা মুভির অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক। দর্শককে শেষপর্যন্ত নিয়ে যাবে রীতিমতো টেনে হিচঁড়ে!

শেষের দিকে ভেবেছিলাম “ফাইট ক্লাব’ মুভির মতো একটা দারুন টুইস্ট আছে। কিন্তু না, সস্তা কোন টুইস্টোর ধার ধারেননি লি সাহেব। কিন্তু যারা টুইস্ট পছন্দ করেন, তাদেরকেও হতাশ হবে না। কারন শেষের দিকে পাই সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্প বলে দর্শককে। যারা টুইষ্ট পছন্দ করেন তারা চাইলেই সেখান থেকে সেটা খুজেঁ নিতে পারবেন। আর মুভিটার একটা অভূতপূর্ব মজা এখানেই।

আমার মনে হয় লাইফ অব পাই আমার জীবনে দেখা সেরা এ্যাডভেঞ্চার মুভি! আরো অনেক কিছু লেখার ইচ্ছে ছিলো, কিন্তু ইতিমেধ্যই অনেক লিখে ফেলেছি। বাকীটা দর্শকদের উপর ছেড়ে দিলাম।

আমার স্কোর:

কাহিনীর অনবদ্যতা: ৮.৫/১০
সিনেমাটোগ্রাফি: ৯/১০ [সুমদ্রের মাঝখানে শিপর‍্যাকের উপর পাই আর রিচার্ডের দৃশ্যায়ন দর্শক দীর্ঘদিন ভুলতে পারবে না]
সংলাপ: ৮/১০ [মুভির কিছু কিছু সংলাপ তো মুগ্ধ হয়ে বসে বসে ভাববার মতো!]
মিউজিক: ৮/১০
ম্যাকাপ: ৯/১০
কাহিনীর ধারাবাহিকতা: ৮.৫/১০
কোরিওগ্রাফি: ৬.৫/১০
স্পেশাল ইফেক্ট: ৯/১০
সর্বমোট গড়: প্রায় ৮ / ১০

MV5BNTg2OTY2ODg5OF5BMl5BanBnXkFtZTcwODM5MTYxOA@@._V1_SX640_SY720_

 

স্বপ্নদুয়ারে রেজিষ্ট্রেশন না করেও আপনার ফেসবুক আইডি দিয়েই মন্তব্য করা যাবে। নীচের টিক চিহ্নটি উঠিয়ে কমেন্ট করলে এই পোষ্ট বা আপনার মন্তব্যটি ফেসবুকের কোথাও প্রকাশিত হবে না।

টি মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *