আমেরিকাতে সমকামী বিয়ের বৈধতা প্রসঙ্গে কিছু কথা


PrideDesignঅষ্ট্রেলিয়াতে প্রতি বছরের শুরুর দিকে মারদিগ্রা (Mardi Gras) নামের একটা প্যারেড হয়। লেন্ট মৌসমের রোজা রাখার আগে সবাই মিলে পেট পুরে ভালো মন্দ খায়, ইচ্ছেমতো রিচ ফুড খায়, সেটাকেই তারা উদযাপন করে মারদিগ্রার মাধ্যমে। এটা আদ্যোপান্ত খ্রিষ্টিয় ধর্মীয় উৎসব কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই দিনে অষ্ট্রেলিয়ার সমস্ত সমকামী দম্পতি রাস্তায় নেমে আসে। কি তাদের বাহারি সাজ, কি তাদের পোষাক আষাক!! চারিদিকে আনন্দের হুল্লোড় বয়ে যায়। তারা জানে আপনি তাদের মতো নন, কিন্তু ঐদিন রাস্তায় আপনার সাথে দেখা হলো তারা আপনাকে চকোলেট দিবে, বিয়ার সাধবে, হাসিমুখে হ্যান্ডশেইক করে একসাথে ছবিও তুলবে।
Continue reading

নিজের স্বপ্নকে ছোয়াঁর অনুভূতিটা কেমন?

8069191976_3549fa5c89_k
আমার প্রবাস জীবনের সবচাইতে বন্ধুবৎসল যে মানুষটাকে পেয়েছিলাম সে সুখন ভাই। আমার বছরখানেকের সিনিয়র। শিল্প মন্ত্রনালয়ে সচিব পদে চাকুরী করা অত্যন্ত সৎ একজন বাবার একমাত্র পুত্রসন্তান। বাবা তার সন্তানকে বিশাল অংকের টাকা ঋন করে বিদেশে পড়তে পাঠিয়েছেন। এখানকার বেশীরভাগ ছাত্রই পড়াশোনায় খুব বেশী সিরিয়াস না। প্রায় সবারই টার্গেট থাকে কোনমতে পড়াশোনা শেষ করে স্থায়ী নাগরিকত্ব পাওয়া। (তাদের দোষ নেই, বিদেশী ছাত্রদের জন্য অষ্ট্রেলিয়াতে পড়াশোনার খরচ রীতিমতো আকাশচুম্বী। উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের সমস্যা নেই কিন্তু মধ্যবিত্ত সন্তানদের এই টাকার পুরাটোই জোগাড় করতে হতো সেখানে কামলা খেটে। সারা সপ্তাহ মাথার ঘাম পায়ে ফেলে টাকা কামিয়ে সেই টাকা দিয়ে সেমিষ্টার ফি দিতে হতো। এরপর আবার পড়ালেখা? আবার পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট? এসব শুনলেও লোকে হাসতো।)

কিন্তু, সুখন ভাইর স্বপ্ন ছিলো খুব ভালো পড়াশোনা করে ক্যারিয়ারটাকে যতটা সম্ভব শক্ত করে ফেলা। স্থায়ী নাগরিকত্ব পেলে ভালো, না পেলেও ক্ষতি নেই। কিন্তু ভাল রেজাল্ট তাকে করতেই হবে।

সুখন ভাই ছিলেন অত্যন্ত ব্যাক্তিত্ববান, মেধাবী, সৎ, সুদর্শন, অসম্ভব বিনয়ী, রসিক এবং সাহায্যপরায়ন কোমল হৃদয়ের নিখাদ খাটিঁ একজন মানুষ। দেশ আর দেশের মানুষের জন্য আবেগের কোন সীমা ছিলো না তার। তার কাছ থেকে আমি জীবনের অনেকগুলো লেসন শিখেছি। কত্ত সুন্দর করে যে স্মৃতিচারণ করা যায়, তাকেই প্রথম দেখেছিলাম। আমি তার সাথে সাড়ে তিন বছর থেকেছিলাম। একই ঘরে পাশাপাশি বেডে। এই সাড়ে তিনবছরে এই মানুষটার কোন খারাপ দিক আমি অনেক খুজেঁও পাইনি। সেখানকার বাঙ্গালী ছাত্ররা সপ্তাহে ৫ দিন কাজ করতো, ২ দিন ক্লাস করতো। সুখন ভাই সপ্তাহে ৫ দিন ক্লাস করতো, ২ দিন কাজ করতো। সঙ্গত কারনেই ঐ ২ দিনে তিনি খুবই অল্প কিছু ডলার রোজগার করতেন যেটা দিয়ে তার সারা সপ্তাহের খরচ চালানো দুরুহ হয়ে ওঠতো। মাঝে মাঝে আমার কাছ থেকে লোন করতেন। যথাসময়ে পরিশোধও করে দিতেন।

আমি ভোরবেলা ঘুম থেকে ওঠে দেখতাম তিনি পড়ছেন। গভীর রাতে কাজ থেকে বাড়ী ফিরেও দেখতাম তিনি পড়ছেন। দিনের বেশীরভাগ সময় সে তার পড়ার টেবিলেই থাকতো। এর ফলও তিনি পেলেন।

অষ্ট্রেলিয়ার টেইফ থেকে প্রায় সবগুলো সাবজেক্টে হায়ার ডিসটিঙ্কশান নিয়ে ডিপ্লোমা করে ইউনোভার্সিটিতে ভর্তি হলেন। স্থানীয় ছেলেপেলেরাই দুয়েকটার বেশী হায়ার ডিসটিঙ্কশান পায় না। সুখন ভাই ৯টাতে পেলেন, তার উপর সে ওভারসীজ স্টুডেন্ট, এবং কমার্স তার বিষয় ছিলো না। যেদিন রেজাল্ট হলো, সেদিন ভোর বেলা অনলাইনে তার রেজাল্ট দেখে আমাকে ঘুম থেকে ডেকে বিছানায় থাকা অবস্থাতেই জড়িয়ে ধরেছিলেন। প্রচন্ড খুশীতে প্রচন্ড ব্যাক্তিত্ববান এই ছেলেটা বাচ্চাদের মতো লাফ ঝাপঁ করছিলো সেদিন।
ডিপ্লোমার সেমিষ্টার ফি ছিলো ৫ হাজার ডলার। সেটা দিতেই বেচারা হিমশিম খেতো। ইউনোভার্সিটি উঠার কিছুদিনের ভেতর সেমিষ্টার ফি এর চিন্তায় সুখন ভাইর চোখের নীচে কালি পড়ে গেলো, আর মাথার চুল পড়ে টাক হওয়ার দশা। কারন সে যে ইউনিতে ভর্তি হয়েছে, সিডনীর ওয়ান অব দ্য বেষ্ট। সেমিষ্টার ফি-টাও সেইরকমই বেষ্ট(!) প্রতি চার মাস অন্তর ৯ হাজার ডলার। টেইফের প্রায় দ্বিগুন।

এই খরচ জোগাতে সে এক একটা সেন্ট হিসাব করে খরচ করা শুরু করলো। আমরা বাসায় উইকএন্ডে স্যামন মাছ কিনে আনতাম, বারমান্ডি বা কিং প্রণ বা লবষ্টার কিনে এনে বার বি কিউ করে খেতাম। সে কখনোই আমাদের সাথে যোগ দিতো না। কেন দিতো না, সেটা বাসার কেউ না জানলেও আমি জানতাম। আমি তাকে বলেছিলাম, আপনার ভাগের টাকাটা আমি দিবো। আপনি আসেন। সে রাজী হয় নাই। এবং এক সময় সে আমাদের সাথে আর খাবারের টাকা শেয়ার করবে না বলে জানিয়ে দিলো। একা একা খাবে। ব্যাক্তিত্ববান এই মানুষটাকে নিয়ে অনেক যন্ত্রনা পোহাতে হয়েছিলো।
সকালে নাস্তা খেতো না, জিগেস করলে বলতো, কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না। রাতে বাসায় ফিরে খেতে ডাকতেই বলতো, আমরা আসার আগেই সে খেয়ে নিয়েছে।

হঠাৎ একদিন দুপুরে বাসায় এসে দেখি সে কিচেনের ফ্লোরে নিউজ পেপার বিছিয়ে পেয়াজঁ আর কাচাঁমরিচ দিয়ে পান্তা ভাত খাচ্ছে। আর কিছু নেই প্লেটে। আমাকে দেখে খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন। আমি খুবই বিরক্ত হলাম। আমি তার সামনে হাটুঁ গেড়ে বসে বল্লাম, ”সুখন ভাই। দিস ইজ টু মাচ। আমরা তো এখনো বেচেঁ আছি, তাই না? আপনাকে এইসব কেন খেতে হবে?” বুঝলাম, সে দিনে একবেলা খেতো। শুধু দুপুর বেলা। আর দুপুরবেলা পুরো বাসা খালি থাকে। তাই সেই সময়টায় সুখন ভাই প্রতিদিন পান্তাভাত খেয়ে সেমিষ্টারের জন্য টাকা বাচাঁতো।

আমার দীর্ঘ প্রবাস জীবনে, তাকে ছাড়া আর কাউকে দেখি নাই সেমিষ্টার ফি সেভ করার জন্য না খেয়ে থাকতে। বাকী সবাই ক্রেডিট কার্ড দিয়ে সেমিষ্টার ফি শোধ করতো। তারপর একটু একটু করে সুদসহ সেই টাকা শোধ করতো। সুখন ভাই কখনো ক্রেডিট কার্ড নেননি। আমি তার দ্বারা খুবই প্রভাবিত ছিলাম। সুখন ভাই নিজের স্বপ্ন আমার ভেতরও সঞ্চারিত করতে পেরেছিলেন। আমিও কখনো ক্রেডিট কার্ড নিইনি। আমিও তার ইউনিতেই ভর্তি হয়েছিলাম। (যদিও তার মতো অত ভালো রেজাল্ট করতে পারিনি।) তার মতই অডিটিং ফার্মে চাকুরী করার স্বপ্ন দেখতাম। (স্বপ্নটা সত্যিও হয়েছিলো)

যাহোক, পরম করুণাময় তার কষ্টের প্রতিদান দিয়েছেন। আমাদের ইউনির সবাই সামার ভেকেশানের জন্য মুখিয়ে থাকতো। অথচ সুখন ভাই সামারেও ক্রেডিট নিয়েছিলো, যাতে তাড়াতাড়ি পাশ করে বেরিয়ে বাবার করা ঋনগুলো শোধ করতে পারে। বেশী ক্রেডিট নেবার ফলে ইউনি থেকে সে চার বছরের কোর্স তিন বছরে সেরে ফেল্ল। এবং যথারীতি প্রচন্ড ভালো রেজাল্ট। গ্রাজুয়েশন করার পর অষ্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় ব্যাংকে চাকুরী পেলেন। কমনওয়েলথ ব্যাংক অব অষ্ট্রেলিয়া, ফাইনানসিয়াল এনালিষ্ট। বেতন বছরে ৪৫ হাজার ডলার। কিন্তু সুখন ভাই খুবই মনক্ষুন্ন হলেন। কারন তার সাথে কথা হয়েছিলো ৫০ হাজার দেবে। কিন্তু সে একজন ফ্রেশার, কোন অভিজ্ঞতা নাই, এই অজুহাতে ৫ হাজার কমিয়ে দিয়েছে। প্রথম যেদিন চাকুরীতে জয়েন করেন, সেদিন সকাল বেলা স্যুট টাই পড়ে সে পোজ দিলো, আমি ছবি তুলে দিলাম। রাতে বাবাকে দেখালো। আংকেল সরকারী সফরে একবার অষ্ট্রেলিয়াতে এসেছিলেন। তার সংগী সাথীরা সবাই সরকারী খরচে বিলাস বহুল হোটেলে থাকলো। আংকেল থাকলেন তার ছেলের সাথে। একটা ব্যাচেলর মেসে, এক বিছানায় গাদাগাদি করে। আমাদের ঘর দেখে বল্লেন, বাবা আমি তোমাদের জন্য গর্ববোধ করি। তোমরা বাচ্চা বাচ্চা ছেলে, বাবা-মা পরিবার পরিজন ছেড়ে এতদুরে একা একা থাকছো, পড়াশোনা করছো, আমি তোমাদের জন্য দোয়া করি। বলতে বলতেই আংকেলের গলা ধরে এলো। বুঝলাম, ছেলে তার বাপের মতো হয়েছে পুরোই।

প্রথম সপ্তাহের বেতন পেয়ে সে রাজ্যের বাজার করে আনলো বাসায়। আস্ত এক স্যামন মাছ কিনে আনলেন বাজার থেকে। সাথে মাশরুম, ক্যাপসিকামসহ বিভিন্ন রকমের সবজি ও হার্ব। স্যামন নিজ হাতে রান্না করে বাসার সবাইকে খাওয়ালেন। আমার চোখে পানি চলে আসছিলো বার বার। এই যন্ত্রনাদায়ক মানুষটার কাছ থেকে প্রচন্ড আবেগী হতেও শিখেছিলাম নিজের অজান্তেই।

সুখন ভাই অত্যন্ত সৌখিন মানুষ ছিলেন। তার পরের তিন সপ্হাতের বেতন জমিয়ে নিজের আর বাবার জন্য দুইটা ফসিলের ঘড়ি কিনলেন। তার ফসিলের ঘড়ির খুব শখ। দুনিয়াতে এত দামী ঘড়ি আছে সেইটা না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। বিকেলে আমাকে সাথে নিয়ে এ্যাপল ষ্টোর থেকে একটা আইফোন আর একটা ম্যাকবুক কিনলেন, ফেরার পথে সনি সেন্টার থেকে সনির একটা দামী ক্যামেরাও কিনলেন। ট্রেনে ওঠে বল্লেন, ছোটবোনটাকে এখানে নিয়ে এসে পড়াবেন। আগামী বছর দেশে গিয়ে পরিবারের সবাইকে নিয়ে সারা বাংলাদেশ ঘুরে বেড়াবেন। ইত্যাদি ইত্যাদি।

ঠিক ১ বছর চাকুরী করে ব্যাংকের চাকুরীটা ছেড়ে দিলেন সুখন ভাই। এপ্লাই করলেন বিগ ফোরের একটাতে। পৃথিবী সেরা ৪টা অডিটিং ফার্মের একটাতে। তার রেজাল্ট আর প্রিভিয়াস এমপ্লয়মেন্ট হিষ্টরীর জোরে বলতে গেলে আবেদন করার সাথে সাথে চাকুরী হয়ে গেলো। বেতনকের অংকটা অবিশ্বাস্য! বছরে ৮৫ হাজার ডলার। বাংলাদেশী টাকায় মাসে ৭ লাখ টাকা। এত অল্প বয়সী একটা ছেলে এত বেতনে চাকুরী করছে, আমি এমনটা আর দেখিনি। (আমি বলছি ২০০৯ সালের ঘটনা। এখন তার বেতন প্রায় দেড় লাখ ডলার হবার কথা।) একটাই সমস্যা, তাকে পার্থে চলে যেতে হবে। পার্থ হচ্ছে, চারপাশে মরুভূমি ঘেরা একটা অত্যন্ত উন্নত শহর। কিন্তু সেখানে জনবসতি কম। বাঙ্গালী খুব একটা নাই। সুখন ভাই বাঙ্গালী পাড়া ছাড়া থাকতে পারে না। তাই প্রচন্ড মন খারাপ করে সে পার্থে গেলো। যাবার আগে বলে গেলো, আমি গিয়েই আগে চেষ্টা করবো সিডনী বা মেলর্বোনে পোষ্টিং করার জন্য।

অফিস থেকে একটা গাড়ী আর দেড় হাজার স্কয়ার ফিটের একটা ফ্ল্যাট দিলেও কয়েক মাসের মাথায় একটা লেক্সাসের ফোর হুইল ড্রাইভ গাড়ী কিনলেন। দেশেও খুব সম্ভবত একটা ডুপ্লেক্স বাড়ী করেছেন। মাঝে মাঝে সিডনীতে বেড়াতে আসতেন। অফিস থেকে তাকে অবকাশ যাপনের জন্য বিলাস বহুল হোটেলের ভাউচার দিতো। সে সেটা ব্যবহার করতো না। সিডনীতে আসলেই হয় মুসল্লা নাহলে আমার বারান্দার টাইলসে শ্যাওলা ধরা বাসাটায় ওঠতো। আমার জন্য কয়েক কেজি বিফ ষ্টেক আর পার্থের বিখ্যাত কিউই জুস নিয়ে আসতো, সে জানতো আমি খেতে ভালবাসি। তারপর দুজনে মিলে বিফ ষ্টেক আর কিউ ফলের জুস খেতে খেতে পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করতাম। আমি আমার সামনে বসা ছেলেটার দিকে তাকিয়ে দেখতাম, লক্ষ্যের প্রতি প্রচন্ড অবিচল থাকা আর সংগ্রাম করার মানসিকতা মাত্র ৫ বছরের ভেতর এই ছেলেটাকে কোথায় পৌছেঁ দিয়েছে!

অনেকদিন ধরে একটি স্বপ্নকে তিল তিলে নিজের ভেতর লালন করে সেই স্বপ্নটাকে যখন বড় করা হয়…সেই স্বপ্নটাকে বাস্তবরূপ দেবার জন্য প্রানান্তকর পরিশ্রম করার পর যখন হুট করে একদিন দেখা যায় যে স্বপ্নটাকে ছুয়েঁ ফেলা গেছে…..স্বপ্নটা সত্যি হয়ে গেছে… অনুভূতিটা তখন কেমন হয়? খুশীর বাধঁ তখন কতটা ভেঙ্গে পড়ে? নিজের ভেতর কতটা আনন্দের জোয়ার টের পাওয়া যায়?

 

অনেকদিনের লালিত স্বপ্নটাকে কিভাবে ছোয়াঁ যায়, আর ছুয়েঁ ফেলার অনুভূতিটা কি, আমি সেটা জানি। সেটা অপার্থিব একটা। নিজের ভেতর প্রচন্ড আত্নবিশ্বাস গড়ে ওঠার একটা অনুভূতি। স্বপ্ন যত ছোটই হোক না কেন, দিগ্বিজয় করার একটা অনুভূতি। অনুভূতি। খুব সম্প্রতি এই অনুভূতি পেয়েছে আমাদের পাড়ার তমা আপু, তুষ্টি কঙ্কাবতী আর Foring Camelia তমার আপুর স্বপ্ন ছিলো বিসিএস ক্যাডার হওয়া, এ বারের বিসিএসের রেজাল্ট বেরুবার সময় আমি জান্তামই না যে তমাপু এবার পরীক্ষার দিয়েছে। আমি ভেবেছিলাম হয় সে দিয়ে ফেলেছে নয়তো পরে দেবে। ইন্টার পরীক্ষার পর বান্ধবীদের সাথে নীলগিরি বেড়াতে গিয়ে এত ভালো লাগলো যে এরপর থেকে তার স্বপ্ন হলো ওখানে সরকারী চাকুরী নিয়ে থিতু হয়ে যাওয়া। সরকারী চাকুরী কারন তাহলে চাকুরী ফাকিঁ দিয়ে পাহাড়ে পাহাড়ে ঘোরা যাবে।

তুষ্টি খুবই লক্ষী মেয়ে। মেয়েদের কত রকমের শখ থাকে। ফ্যাশন, জামাকাপড়, পারলার, চকলেট, আইসক্রিম, শপিং। তার এসব কিছু নেই। শুধু অনেকদিনের শখ/স্বপ্ন ছিলো একটা ডিএসএলআর কেনা। গতকাল সে অনেকগুলো নগদ টাকা দিয়ে সাহস করে একটা নাইকন ডি৭০০০ কিনে ফেলেছে। তার জন্য আরো খুশীর ব্যাপার হচ্ছে, পুরো টাকাটাই তার নিজের উপার্জিত অর্থ! আর ক্যামও একটা অসাধ্য সাধন করে ফেলেছে। তার বয়সী একটা মেয়ের কত্ত রকম স্বপ্ন থাকে। ক্যারিয়ার করা, স্বামী, সংসার, বাচ্চা-কাচ্চা, রান্না-বান্না, ঘর গোছানো, ফার্নিচার কেনা কত্তকিছু। কিন্তু এসব কিছুই না, তার অনেকদিনের স্বপ্ন ছিলো একটা পত্রিকা বের করবে। অনেক ছেলে মেয়ে ছোটবেলা থেকে লেখালেখি করে, সাহিত্যচর্চা করে, কিন্তু একটা ভালো লেখার জায়গার অভাবে লেখালেখির সেই অভ্যাসটা আর থাকে না একসময়। ক্যামের পত্রিকার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য, ছেলেমেয়েগুলোর সেই অভ্যাসটা ধরে রাখা। কয়েক মাস আগে দেখি লেখা আহ্ববান করলো, তারপর দেখলাম এমএস ওয়ার্ডে করে লেখকদের লেখা জোগাড় করছে। আজ সকালে দেখি সে তার পত্রিকার প্রচ্ছদ কাভার ফটোতে দিয়েছে। মানে পত্রিকা বেরুনোর সব কাজ শেষ। আজ কালকের ভেতরেই নাকি পত্রিকা ষ্ট্যান্ডগুলোতে পাওয়া যাবে। পত্রিকার নাম “ক্যামেলিয়ার চিঠি।” আমি অভিভূত হয়ে গেলাম। তার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে, শুধু এই কারনে নয়, অভিভূত হলাম কারন পত্রিকার নাম এবং প্রচ্ছদ কবিগুরুর কাছ থেকে ধার করা।

নিজের স্বপ্নকে ছুয়েঁ ফেলাটা অনেক আনন্দের একটা ব্যাপার। মজার ব্যাপার হলো, আমি নিজে সেটাকে কখনো সেভাবে দেখিনি। আমার স্বপ্ন ছোয়ারঁ অনুভূতি অসাধারন ছিলো, অবশ্যই, তবে সব সময়ই মনে হয়েছে এমনটাই তো হবার কথা ছিলো। এমনটাই তো হবে। যারা স্বপ্নকে লালন করে অনেকটা সময় ধরে, তাদের ভেতর এক ধরনের অভ্যস্ততা ও অভ্যাস গড়ে ওঠে। স্বপ্ন পূরন হয়ে যাবার পর তাই নিজের ভেতরটা ফাকাঁ লাগে, কি একটা যেন নেই, কি একটা যেন থাকার কথা ছিলো, এমনটা মনে হয়। এই কারনেই, খুব বেশী স্বপ্নবাজ মানুষদের সবগুলো স্বপ্ন কখনই পূরণ হয় না। কারন তারা একটা স্বপ্ন পূরন হবার সাথে সাথেই আরেকটাকে লালন করা শুরু করে দেয়।

আমি নিশ্চিত – সুখন ভাই, তমা আপু, তুষ্টি, ক্যাম এরা সবাই নতুন কোন এক স্বপ্নে আবার নতুন করে বিভোর হতে শুরু করেছে।

পোষ্টে ব্যবহৃত ছবির কপিরাইটঃ প্রলয় হাসান

https://www.facebook.com/proloyhasan/posts/10152062884417220