জ্বরের ব্যবচ্ছেদ!

3069173225_7790eb2fbc  জ্বর হওয়া আর দশটা সাধারন শরীর খারাপ হওয়ার মতো নয়। জ্বর হলে মানুষ একটা ঘোরের জগতে প্রবেশ করে। প্রতিবার জ্বর হবার সময় আমি গভীর এক ভ্রমের জগতে ডুবে যাই। যে জগতে আমি অদ্ভুত ও উদ্ভট সব স্বপ্ন দেখি। রাতের বেলা ঘুমের ভেতর আমরা যে ধরনের স্বপ্ন দেখি, জ্বরের ঘোরে দেখা স্বপ্ন তার চাইতেও অনেক বেশী বাস্তব ও গভীর হয়ে থাকে। এতটাই যে, সেটা যে স্বপ্ন সেই বোধটাই অনেক সময় লোপ পায়; বরং পুরোপুরি বাস্তব বলে ভ্রম হয়।
কয়েকবছর আগে যখন তীব্র জ্বর হলো, আমি স্বপ্ন দেখলাম, সন্ধ্যাবেলা মাঝ নদীতে আমি আর সুলগ্না একটা নৌকায় হাটুঁভাজ করে বসে বৃষ্টিতে ভিজছি। সাধারন কোন বৃষ্টি না, তুমুল বৃষ্টি, মুষলধারে বৃষ্টি! একটু পর পর প্রবল বাতাস বইছে। সেই বাতাসে নৌকা ভয়ংকরভাবে দুলছে। অথচ আমি আর সুলগ্না দুজনের কেউই সাতারঁ জানি না। এই দৃশ্যটা এত ভয়াবহ রকমের বাস্তবসম্মত ছিলো যে, জ্বর ভালো হবার পরও আমি চোখ বুজলে সেটা স্পষ্ট দেখতে পেতাম।
আমার বেশীরভাগ গল্পের প্লট আমি জ্বরের ঘোরে পেয়েছি। কলেজে পড়ার সময় একবার তো একটা আস্ত সাই-ফাই মুভিই দেখে ফেল্লাম। জ্বর ভালো হবার পর সেটা নিয়ে লিখলাম আমার জীবনের প্রথম সাই-ফাই গল্প
খুব জ্বর হলে মনে পড়ে সবচাইতে আপনজনদের। কে আপনার বেশী কাছের বা কাকে আপনি বেশী ভালবাসেন বা মিস করেন, সেটা বোঝা যাবে জ্বরের সময়। জ্বরের ভেতর যে মানুষটার কথা আপনার সবচাইতে বেশী মনে পড়বে, ধরে নিবেন আপনি আপনার অবচেতন মনে তাকেই সবচাইতে বেশী ভালবাসেন। এটা মুটামুটি প্রমানিত সত্য।
শুনেছি জ্বরের সময় মানুষের সেরিব্রাল ক্যাপিসিটি (মস্তিস্কের কার্যক্ষমতা) একটা বিশেষ অবস্থায় পৌছেঁ, যার ফলে অনেক সময় খুব ছোট বেলার ঘটনাও ছবির মতো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আমার জ্বরের সময় আম্মুর কথা সবচাইতে বেশী মনে পড়ে। খুব ছোটবেলায় জ্বর হলে আম্মু আমাকে গামছা ভিজিয়ে সারা শরীর মুছে দিতো। তারপর কাপড় বদলিয়ে কোলে করে ছাদে নিয়ে গিয়ে বুকে মাথা রেখে ঘুম পাড়াতো। আমার জীবনে এটা সবচাইতে সুখকর স্মৃতির একটি।
জ্বরের ঘোরে অনেকের মতো আমিও প্রলাপ বকি। সেসব বোঝা যায় না বলেই এর নাম ‘প্রলাপ’। বোঝা গেলে হতো ‘কথা’। একবার ছোট ভাইকে বল্লাম, সেগুলো রেকর্ড করতে। জ্বর ভালো হবার পর রেকর্ড বাজিয়ে শুনে হতভম্ব হয়ে গেলাম। যে কথাগুলো কাউকে বলা যায় না, সেগুলোই জ্বরের ঘোরে অবলীলায় বলে গেছি। ভাগ্য ভালো, কথাগুলো ছিলো অত্যন্ত অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য। তবে আমার কাছে দুর্বোধ্য ছিলো না।
জ্বরের সময় মাথায় পানি বা জলপট্টি দেয় সবচাইতে কাছের মানুষেরা। অথবা কথাটাকে এভাবেও বলা যায়, জ্বর হলে আপনাকে জলপট্টি দিয়ে দিবে যে, সে আপনাকে অবশ্যই ভালবাসে। জলপট্টি শব্দটা খুব সুন্দর, শব্দটার মাঝেই যেন ভালবাসা লুকিয়ে আছে! একজন অসুস্থ মানুষ বিছানায় শুয়ে আছেন, তার ভালবাসার মানুষটা তাকে পরম মমতায় তার মাথায় জলপট্টি দিয়ে দিচ্ছেন, এর চাইতে রোমান্টিক দৃশ্য আর কি হতে পারে?
  খুব ছোটবেলায় আম্মুর পাশাপাশি আমাদের বাসার গৃহপরিচারিকাও আমার মাথায় জলপট্টি দিতো। তাকে আমি একটুও পছন্দ করতাম না, কারন তার অপরাধ ছিলো সে আমাকে মগভর্তি দুধ খাবার জন্য খুব জোরাজুরি করতো এবং মুখ খোলা রেখে টিভি দেখতো। অথচ সেই মেয়েটি যখন তার বাবার সাথে গ্রামের বাড়ি ফিরে গেলো, আমাকে আর আমার ছোটভাইকে জড়িয়ে ধরে সে কি কান্না!
http://www.dreamstime.com/royalty-free-stock-image-cartoon-sick-boy-head-thermometer-scarf-ice-bag-patient-sad-kid-his-mouth-indicating-high-temperature-orange-yellow-image42277636
একটা সময় ছিলো, কারো জ্বর হলে মাথায়  অটোমেটেড পদ্ধতিতে পানি দেয়া হতো। ছোট্ট একটা মাটির কলসের নীচে ফুটো করে সেটাতে পানি ভরে রোগীর কপাল বরাবর টাঙ্গিয়ে দেয়া হতো। তারপর সেখানে থেকে পানি টপ টপ করে পড়তো। কিছুক্ষন পর পর কেউ এসে কলসীতে ভরে দিয়ে যেতো শুধু। এইভাবে এখন আর মনে হয় না কাউকে মাথায় পানি দেয়া হয়।
দেশের বাইরে যাবার পর একটা ব্যাপার খুব ভালো করে বুঝলাম। প্রবাসে জ্বর হবার মতো দুর্ভাগ্য আর হয় না। নিজের দেশে জ্বর হলে বন্ধু বান্ধব ও আত্নীয়রা ফলমূল নিয়ে দেখতে আসে, বাবা-মা আর ছোট ভাই একটু পর পর এসে জিগেস করে, ”তোমার কোন খাবারটা খেতে ইচ্ছে করছে? বলো, এনে দেই।” মোট কথা, জ্বরের সময় রীতিমতো একটা উৎসব উৎসব ভাব থাকে। দেশের বাইরে জ্বর হলে এই সবের বালাই নাই। ২০০৭ সালের মাঝামাঝি আমার জীবনের সবচাইতে মারাত্নক জ্বর হয়েছিলো। জ্বরের মাত্রা এতটাই বেশী ছিলো যে, আমার দুজন ফ্ল্যাটমেটের কাউকেই নাকি চিনতে পারিনি। জ্বর মাপার পর দেখা গেলো ১০৫ ডিগ্রি! তারা ভেবেছিলো, থার্মোমিটার বুঝি ভুল রিড দিচ্ছে…
ভোরে তারা কাজে চলে যেতো। ক্লাস শেষ করে বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যেতো। এদিকে আমি আকাশ পাতাল জ্বর নিয়ে সারাদিন বাসায় একা বন্দী। আমার মনে আছে, আমি কিছুক্ষন পানি পানি বলে বিড় বিড় করতে করতে ঘুমিয়ে যেতাম। তারপর কিছুক্ষন পর আবার ঘুম ভেঙ্গে গেলে আবার কিছুক্ষন পানি পানি বলে বিড় বিড় করতে করতে আবার ঘুম। এইরকম চলতো কয়েক ঘন্টা। যখন প্রচন্ড তৃষ্ণায় আর বিড়বিড়ও করতে পারতাম না, তখন হাচড়েঁ পাচঁড়ে কোনমতে বিছানা থেকে ওঠে কিচেনে গিয়ে বেসিনের কল ছেড়েঁ এক গ্লাস পানি খেতাম। একদিন বিকেলে ডাক্তারের কাছে যাবো বলে বাসা থেকে বেরুলাম, এক তলাও নামিনি, ধুম করে সিড়িতেঁ পড়ে জ্ঞান হারালাম। জ্ঞান ফেরার পর জেনেছি, পাশের ফ্লাটের বসনিয়ান একটা দম্পতি আমাকে কোলে ধরে ঘরে পৌছেঁ দিয়েছে। পরে তারাই ডাক্তারের ব্যবস্থা করেছিলো। তাদের কাছে আমি আজো যারপরনাই কৃতজ্ঞ।
জ্বর ছিলো তিনদিন, এই তিনদিনে একজন মাত্র মানুষ আমার জন্যে একবাটি ভেড়ার মাংস ভূনা করে পাঠিয়েছিলেন। দেশে কাউকে জানাইনি জ্বরের কথা, পাছে টেনশন করে! এই কারনেই দেশের জ্বর বলতে গেলে আর্শিবাদ, আর বিদেশের জ্বর হচ্ছে সাক্ষাৎ অভিশাপ।
আপনার পরিচিত কারো জ্বর হলে তার প্রতি আন্তরিক হউন। সম্ভব হলে, তাকে দেখতে যান। তার পাশে বসে দুটো কথা বলুন, কপালে হাত দিয়ে জ্বরটা দেখুন। সে আপনাকে যতই অপছন্দ করুক না কেন, জ্বরের সময়কার ভালবাসা একজন মানুষ খুব আলাদা করে বুঝতে পারে। না চাইলেও এই আন্তরিকতার কথা সে দীর্ঘদিন মনে রাখে। মুখে সে আপনাকে যদি গালমন্দও করে তবে ধরে নিবেন, আপনার প্রতি এক ধরনের অব্যক্ত কৃতজ্ঞতায় তার হৃদয়ের একাংশ ভরে আছে!
http://www.dreamstime.com/stock-images-cartoon-sick-man-head-thermometer-scarf-ice-bag-patient-sad-his-mouth-indicating-high-temperature-green-red-his-image42104184

 

স্বপ্নদুয়ারে রেজিষ্ট্রেশন না করেও আপনার ফেসবুক আইডি দিয়েই মন্তব্য করা যাবে। নীচের টিক চিহ্নটি উঠিয়ে কমেন্ট করলে এই পোষ্ট বা আপনার মন্তব্যটি ফেসবুকের কোথাও প্রকাশিত হবে না।

টি মন্তব্য

2 thoughts on “জ্বরের ব্যবচ্ছেদ!

  1. ঘাসফুল says:

    আচ্ছা সুলগ্নার পড়নে কি ছিল??? সেটা খেয়াল করেছিলেন? আমার কেনো জানি মনে হচ্ছে খুব নীল পেড়ে সাদা রঙ্গের শাড়ী!

    • প্রলয় হাসান says:

      সুলগ্লার পরনে ছিলো সাদা রংয়ের শাড়ি। তবে পাড়ের রংটা মনে নেই। খুব সম্ভবত সাদাই (অথবা কালো) ছিলো। কারন অন্য কোন রং হলে মনে থাকতো সেটা। ধন্যবাদ। 🙂

Comments are closed.