Aside

সেখানেই তো তুমি..হ্যাঁ..তুমি….!

shopnoduarblog_1225999867_1-DSC09056

ইউনিভার্সিটির সেকেন্ড সেমিস্টারে একটা ইন্ডিয়ান মেয়ের সাথে পরিচয় হয়। স্যুরন। দেখতে কালো, কিন্তু খুবই মিষ্টি; মায়াকাড়া চেহারা। সব সময় এই মেয়েটি হেসে হেসে কথা বলত। খুব দুঃখের কথাও সে হেসে হেসে বলত। একটা পাই শপে পার্ট টাইম জব করত। ছাত্রী হিসেবে মুটামুটি ছিল। ২য় সেমিষ্টারে আমাদের ক্লাস বদলে গেলো, সাবজেক্ট বদলে গেলো। তাই নতুন ক্লাসে এসে নতুন নতুন ছেলেমেয়ে দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। পুরো ক্লাসে তখন আমিসহ তিনজন বাংলাদেশী। একজন মহিলামত মেয়ে (মানে বয়স মেয়েদের মতো কিন্তু দেখতে মহিলাদের মতো বয়স্ক) আরেকটা ছেলে, নাম আতাহার। মহিলামত মেয়েটা কয়েক সপ্তাহ পর পর ক্লাসে আসতো। অষ্ট্রেলিয়ার ছাত্র ভিসার শর্ত হচ্ছে, ক্লাসে ৮০% উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। নাহলে ভিসা বাতিল হয়ে যাবে। মহিলামত মেয়েটির ৮০% অনুপস্থিতিতেও ভিসা বাতিল হয় না কারন তার স্বামী অষ্ট্রেলিয়ান সিটিজেন। তাই তার ক্লাস করারও গরজ নাই।

আর আতাহার খুবই গোবেচারা টাইপ ছেলে। সে বাংলাদেশের এক অজগ্রাম থেকে সরাসরি অষ্ট্রেলিয়ায় চলে এসেছে। দরিদ্র বাবা নিজের সব সহায় সম্পত্তি বিক্রি করে একমাত্র ছেলেকে বিদেশে লেখাপড়া করতে পাঠিয়েছেন। ছেলে বিদেশ বিভূইঁয়ে না পারে চলতে, না পারে ঠিকমতো কারো সাথে কথা বলতে। বেচারা সবসময়ই নার্ভাস থাকতো। আমি নিজেও যেহেতু গোবেচারা টাইপ মানুষ, সেহেতু আতাহারের সাথে আমার ভাব হয়ে গেলো। আমাদের সাথের সাদা চামড়ার ছেলেমেয়েগুলোকে দেখি, তারা ক্লাস শেষ করে নাইট আউটে যায়, লং ড্রাইভে যায়। আর সপ্তাহান্তে বারে যায়, পার্টিতে যায়। আমরা দুজন ক্লাসে আসি, মাথা নিচু করে লেকচার শুনি, চুপচাপ ক্লাস শেষে করে কাজে যাই নয়তো বাড়ি ফিরে যাই।

মাসখানেক পর হঠাৎ একদিন শুনি আতাহার বিজনেস কলেজে ভর্তি হবে, কারন ভার্সিটির আকাশচুম্বি সেমিষ্টার ফি সে আর টানতে পারছে না। ইমগ্রেশন থেকে অনেক ঝামেলা করে ভিসা বদলিয়ে সে অনার্স থেকে ডিপ্লোমায় ভর্তি হয়ে গেলো। অথচ আমি জানতাম কাজটা করা যায় না।

আতাহার চলে যাবার একদম একা হয়ে গেলাম আমি। প্রচন্ড মন খারাপ করে ক্লাসে আসতাম, প্রচন্ড মন খারাপ করে ক্লাস শেষ করতাম। ছেলেপেলেরা একা একা ক্লাসে ঢুকতো কিন্তু দল বেধেঁ ক্লাস থেকে বের হতো। আমি ঢুকতাম একা একা, বেরও হতাম একা একা। আমি উপলদ্ধি করলাম, ভার্সিটি লাইফে পুরোপুরি বন্ধুবিহীন অবস্থায় থাকার মতো অভিশপ্ত জিনিস ছাত্রজীবনে আর হয় না।

এ সময় কিভাবে কিভাবে যেন একদিন স্যুরনের সাথে পরিচয় হয়ে গেলো। ছোটবেলা থেকেই আমি বেশ মুখচোরা ছিলাম, মেয়েদের সাথে গুছিয়ে কথা বলতে পারতাম না। স্বাচ্ছন্দ্যে মিশতে পারতাম না। এই কারনে স্যুরন নিজে থেকেই আমার সাথে গল্প করার চেষ্টা করতো। আমার কাছ থেকে নোট নিতো, ওর এসাইমেন্ট আমাকে দিয়ে করাতো, বিনিময়ে ওর চাচার ইন্ডিয়ান রেষ্টুরেন্টে ভরপেট লাঞ্চ এবং ডিনার করাতো। স্যুরন কবিতা পছন্দ করতো। ওর জন্মদিনে আমি একটা কবিতা লিখে উপহার দিই। বেশ খুশী হয়েছিলো। সেও আমার জন্মদিনে আমাকে একটা কবিতা লিখে সেটার রিপ্লাই দেয়। ভীষন স্মার্ট মেয়ে ছিলো স্যুরন। আমাকে ও কেন জানি কল্প্রলয় বলে ডাকত! ওর সব কিছুই ছিলো কল্পনার একটা থিমে সাজানো। ওর ল্যাপটপের ওয়েলকাম স্ক্রীনে ওর নাম ছিলো কল্পলোক। আমার নামটাও হয়ত সেভাবেই এসেছে। কল্পনা আর প্রলয়। কল্প্রলয়।

কবিতার শিরোনামের নীচে এমন করে নামটা লিখে দিয়েছিলো যে কেউ দেখে ভাববে কবিতাটা হয়ত আমারই লেখা। যাকে উদ্দেশ্য করে লেখা, তার নাম সে দিয়েছিলো লেখকের নামের জাগায়। আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। (এই পোষ্টে তার কবিতার ছবিটি সংযুক্ত করা হয়েছে।)

পরের সেমিষ্টারেই, একদমই হঠাৎ, স্যুরন ভয়াবহ একটা রোড এ্যাকসিডেন্টে মারা যায়। এক উইকএন্ডে ওর ইন্ডিয়ান বয়ফ্রেন্ড মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি বিপদ সীমার চাইতে অনেক বেশী গতিতে চালাচ্ছিল। হঠাৎ হাইওয়ের একটা ব্রীজের উপরে লোহার খাম্বার সাথে সংঘর্ষে ওদের গাড়িটি ছাতু হয়ে খাদের গভীরে পড়ে যায়। দুজনেই স্পটডেড। ক্লাসের সবাই গিয়েছিলাম ওদের ফিনিউরালে। সেদিন ছিলো ৭ ই নভেম্বর।

আজ ১৪ ই মে। স্যুরনের ২৮ তম জন্মদিন। বেচেঁ থাকলে আজ সে ২৮ বছরে পা দিতো। খুব মনে পড়ছে ওকে। পরম করুনাময় তার বিদেহী আত্নাকে শান্তি দিক। আমিন।

https://www.facebook.com/proloyhasan/posts/10152450161872220

 

স্বপ্নদুয়ারে রেজিষ্ট্রেশন না করেও আপনার ফেসবুক আইডি দিয়েই মন্তব্য করা যাবে। নীচের টিক চিহ্নটি উঠিয়ে কমেন্ট করলে এই পোষ্ট বা আপনার মন্তব্যটি ফেসবুকের কোথাও প্রকাশিত হবে না।

টি মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *