সুলগ্না, তোমাকে চিঠি

letter-2

সুলগ্না,

কাল বিকেলে অবন্তীদের ছাদে তোমাকে দেখলাম একটি বাচ্চা ছেলেকে কোলে নিয়ে সিড়িঁর গোড়ায় বসে আছো। আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল, ছেলেটির নাম রাতুল। অমন তুলতুলে গালের ছেলেটির নাম রাতুল না হয়েই যায় না! আর রাজশাহী সিল্কের শাড়ীতে তোমাকে এত্ত চমৎকার মানিয়েছিলো!‍

আমি যে প্রতিদিন হিমেলদের বাসার ছাদ থেকে তোমাকে দেখি, তুমি কি সেটা এখনো বুঝতে পারনি? আমি ক্রিকেট খেলায় কোনদিন্ও ভাল ছিলাম না, তবু কেন রোজ বিকেলে হিমেলদের সাথে খেলতে আসি, বোঝ ?

জানো, মাঝে মাঝে আমার খুব ইচ্ছে হয়, তোমাকে নিয়ে আশুলিয়ার বেড়িবাঁধের উপর বসে গিটার বাজাতে! পাশে গোলাপ ফুলের বিস্তৃত বাগান…সেই গোলাপ বাগান! মনে আছে তোমার? সেবার তোমার কুড়িতম জন্মদিনে, মুষলধারে বৃষ্টির ভেতর আমি সাইকেল চালিয়ে সেখানে গিয়ে তোমার জন্য কুড়িটা গোলাপ এনেছিলাম, ফেরার পথে কাটাঁর খোচাঁ খেয়ে আর ভিজে কাই হয়ে বিধ্বস্ত আমি তোমাকে ফুলগুলো দিলাম, আমার হাতটা বেশ কাপছিলোঁ, মনে আছে সুলগ্না?

খুব ছন্নছাড়া হতে ইচ্ছে করে, সুলগ্না! আকাশে মেঘ দেখলে এক ফোটা বৃষ্টির জন্য হা ভাতের মত সেদিকে চেয়ে থাকি যেন কোনদিন বৃষ্টি দেখিনি। এক ফোটা শীতল শিশির দেখলে খুব ইচ্ছে করে ছুয়েঁ দিতে। ছুয়ে দিতে ইচ্ছে হয়, আরো অনেক, অনেক বৃষ্টি কণা। কিন্তু যখন মেঘ সরে যায়, তখন খোলা নীলচে আকাশ দেখলেই ইচ্ছে হয়, পাখির মত ডানা মেলে দিগন্তে উড়ে যেতে। সত্যি বলছি সুলগ্না, বিশ্বাস করো! সত্যি সত্যি আমার পাখি হয়ে উড়তে ইচ্ছে করে। এক বর্ণ্ও মিথ্যে বলছি না আমি!

শোনো, আমি পাখি হতে পারলে তোমাক্ওে সাথে নেয়া যেতে পারে। কিন্তু তুমি পেছন থেকে আমাকে ঠোকরাবে না! আমি একদিন রাতে স্বপ্ন দেখি, আমি পাখি হয়ে আকাশে উড়ছি আর তুমি আমাকে পেছন থেকে আমার লেজটা ঠোকরাচ্ছ!! তুমি তো মহাপাজি!! স্বপ্নে আমার লেজ দেখেছি বলে হাসবে না বলে দিলাম! ওটা পাখির লেজ, অন্যকিছুর নয়, পাখির লেজের সাত খুন মাফ! হুঁ!!

মাঝে মাঝে খুব বাউন্ডুলে হতে ইচ্ছে করে, সুলগ্না। ইট-কাঠ-পাথরের এই দানব শহর আমাকে আর কাছে টানে না। আমার ঘরের চারটা দেয়াল আমার দম বন্ধ করে দেয়। মাঝরাতে প্রায়ই আমি ছাদের দিকে তাকিয়ে হাসঁ-ফাসঁ করি এক টুকরো মেঘ, নীলচে আকাশ আর সন্ধ্যা তারা-শুক তারা দেখার আশায়। এ্যাই, তোমাকে না আমি বলেছিলাম, এক পূর্ণিমা রাতে তোমাকে আমি আকাশের তারা চেনাবো! সেদিন বল্লাম আসতে, আসলেই না আর তুমি! আর আমি মশার কামড় খেয়ে সারা! বল্লে, বাবার চোখকে ফাকিঁ দিয়ে আসতে পারোনি, তোমার বাবার বুঝি চীলের চোখ?

সুলগ্না, আমি ছন্নছাড়া হতে পারিনি, বাউন্ডুলে হবার সাধটা্ মনের ভেতরে চাপা দিয়ে রেখেছি, আমরা ছা পোষা মানুষ। হাত পা শেকলে বাধা বাধা লাগে! চারটি মানুষ নিয়ে আমাদের সংসার। নিজের হাত খরচ চাইতে যে লজ্জাটুকু লাগে, সেটার হাত থেকে বাচঁতে টিউশানিটা নিয়েছিলাম। মাঝে মাঝে মনে হয় এটাই আমার একমাত্র পিছুটান। তাই মনে হয় টিউশানিটা ছেড়ে দিই। কিন্তু আমার মন যেন বলে – কাজটা করিস না বাপ! অনেক কষ্টে টিউশানিটা যোগাড় করেছিস!”

একদিন জেগে জেগে স্বপ্ন দেখছিলাম, তুমি-আমি রবিনসন ক্রুসোর মত এক দ্বীপে হারিয়ে গিয়েছি। পৃথিবী আমাদের দুজনকে আর কোনদিন খুজেঁ পায়নি। দ্বীপে তুমি আমি সংসার পেতে ফেলেছি। প্রতি রাতে আমি আমার কোলে শুইয়ে দিয়ে তোমাকে শুকতারা-সন্ধ্যাতারা চেনাবো। ভাবতো একবার, কি দারুন হবে ব্যাপারটা, তাই না?

সুলগ্না, তোমার নামের সার্থকতা প্রমান করে কোন সুলগনে আমার কাছে ফিরে আসবে? পথ চেয়ে চেয়ে আমি বহু আগেই ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত। এক জীবনে একটা মানুষ কতটা স্বপ্ন দেখতে পারে? এক জীবনে একটা মানুষ আকাশের কতটা কাছাকাছি যেতে পারে? আমি জানি আমার কখনো মেঘ ছোয়াঁ হবে না…আকাশের চাতালে ডানা মেলা হবে না…নির্জন দ্বীপে তোমাকে তারাদের নাম বলা্ও হবে না, তুমি তোমাকে পেতে খুব ইচ্ছে করে সুলগ্না। কিন্তু আমি জানি, তোমাকে্ও আর কখনো পা্ওয়া হবে না আমার।

(ক্লাস টেনে পড়ার সময় লিখেছিলাম চিঠিটা, প্রায় পুরোটাই মগজে গেঁথে ছিলো, এতগুলো বছরেও খুব একটা কিছু ভুলিনি । প্রথম প্রকাশ: ২৭ জুন ২০১১, ৭:৪০ অপরাহ্ন)

 

 

স্বপ্নদুয়ারে রেজিষ্ট্রেশন না করেও আপনার ফেসবুক আইডি দিয়েই মন্তব্য করা যাবে। নীচের টিক চিহ্নটি উঠিয়ে কমেন্ট করলে এই পোষ্ট বা আপনার মন্তব্যটি ফেসবুকের কোথাও প্রকাশিত হবে না।

টি মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *