Status

সুলগ্নাদের বাবার গল্প

father and daughter silhouetted against dusk sky looking up at stars, United Kingdom, Scotland, Wester Ross

ধর্মে হিন্দু, জাতে ক্ষত্রিয় মেয়েটি দেখতে ছোটবেলায় গাট্টা গোট্টা ছিলো বেশ। দেখলাম সমুদ্রের বালিয়াড়ীতে ফ্রক পড়ে একটি মেয়ে ভ্রু কুঁচকে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে আছে। বেশ অনেক বছর আগে বলেই হয়তো ছবিটা ঝাপসা লাগছিলো খানিকটা।

মেয়েটির একমাত্র দাদা, সবে কলেজ পাস করেছে। মা শুভ্রাদেবী কোনদিনো তার সন্তানদেরকে তাদের নিজের হাতে খেতে দেননি। প্রচন্ড জ্বর নিয়ে্ও একমাত্র পুত্র আর একমাত্র কন্যাকে মুখে তুলে খাইয়ে দিয়েছেন, প্রতিদিন নিয়ম করে নিজের হাতে পা ঘষে স্নান করিয়ে দিয়েছেন। সেই নাড়ী ছেঁড়া ধন আদুরে ছেলেকে সে চোখের জল মুছে দূরদেশে পাঠিয়ে দিলেন আরো বড় পাস দেবার জন্য। কিন্তু বিধি বাম। বছর খানেকের মাথায় ছেলের মরনব্যাধি ধরা পড়ল। যে ছেলের কিনা ক্লাসে থাকার কথা, সে ছেলে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাতরায় আর মা তার দেশে বসে চোখের পানি ফেলে। মায়ের সাথে ছেলেটি যখন ফোনে কথা বলতো, তখন মাথামুন্ডু কিচ্ছু বুঝি না। বুঝবো কি করে, চট্টলার ভাষা তো বাংলা ভাষা মনে হয় না, আমি খাটিঁ বাংলাদেশী, সে ভাষা বাংলা হলে আমি বুঝবো না কেন?

মাসখানেকের ভেতর ছেলেটির বাবা এলেন, দিলীপসোম আংকেল। ছেলে তার বাবার মতই ৬ ফুট লম্বা হয়েছে। শুকিয়ে এখন আরো লম্বা হয়ে গেছে! বাবা তাঁর ছেলের মাথার কাছে সারাদিন বসে থাকেন আর হাসপাতালের গেস্টরূমে ফুপিঁয়ে ফুপিঁয়ে কাঁদেন বাচ্চাদের মত। আমি স্বান্তনা দেবার ভাষা খুজেঁ পাই না, ও কাজটাতে আমি ভীষনরকমের অপটু।

যে রাতে ছেলেটির ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়লো, তার বাবা-মাকে জানাবো কিনা, জানালে্ও কিভাবে, কোন মুখে জানাবো, ইত্যাদি ভয়ে সে দায়িত্ব চাপিয়ে দিলাম ফ্ল্যাটমেট এক সিনিয়র ভাই’র কাধেঁ। সে সুচারুরূপে দায়িত্ব পালন করলো। কিন্তু গোল বাধলঁ আংকেলের আবাসন সংকট নিয়ে। এর সমাধা্ও ঐ সিনিয়র ভাই করে ফেল্লেন। কিভাবে কিভাবে যেন বলে দেয়া হলো আমাদের অপারগতার কথা!

পরদিন ভাবলাম, আংকেলের জন্য দুপুরের খাবারটুকু নিয়ে যাই। কিচেনে গিয়ে দেখি কিচ্ছু নাই। হাঁড়ি পাতিল সব খালি। রান্না চড়াবার সময় নাই, ট্রেন ধরতে হবে। তড়িঘড়ি দু প্যাক নুডুলস সিদ্ধ করে বক্সে নিয়ে হাসপাতালে রওনা হলাম। গিয়ে দেখি একজন বিধ্বস্ত পিতা, তার মৃত্যুপথযাত্রী সন্তানকে হাসপাতালের খাবার মুখে তুলে খাইয়ে দিচ্ছেন।

অনেক রাতে, কাজ থেকে বাড়ী ফেরার পথে প্রায় অন্ধকার একটা গলিতে দেখলাম লম্বা একটা ছায়া ইতস্ততঃ ঘুরে বেড়াচ্ছে। পাত্তা দিলাম না, কত লোকই তো ঘুরে এইখানে। ছায়াটি হঠাৎ আমার কাছে এসে বল্ল – “বাবা, তুমি কি বাংলাদেশী? আমি পথ হারিয়ে ফেলেছি!”

চমকে উঠলাম! “আংকেল, আপনি?”

– ও আচ্ছা, তুমি? বাবা আমি তো বাসায় ফেরার পথ খুজেঁ পাচ্ছি না।”

– আংকেল আপনি আমার সাথে আসুন। “

আংকেল আর আমি সিডনীর রাস্তায় গভীর রাতে পাশাপাশি হাটঁছি।

– আংকেল, দুপুরে খেয়েছেন?

– হ্যাঁ বাবা।

– কি খেয়েছেন?

– ঐ যে, তুমি খাবার দিয়ে গেলে….

– ঐটুকুই? আর কিছু না?

– না তো….

– রাতে খেয়েছেন?

-বাসায় গিয়ে খাবো, আমার জন্য চিন্তা করো না,বাবা।

আংকেলের উচ্চমাত্রার ডায়াবেটিকস আছে। কদিন আগে আবার তারঁ হার্টের বাইপাস সার্জারি হয়েছে সিঙ্গাপুর থেকে। সারাদিন ছেলের সেবা করে অভুক্ত,ক্লান্ত আর অসুস্থ শরীরে হাসপাতাল থেকে বাড়ী ফিরছেন তিনি। মনে মনে ভাবছি, বিধাতা বয়স্ক এই লোকটার কপালে কত কষ্টই না লিখে রেখেছিলেন। ভাবছি আমার দুভার্গ্যর কথা্ও! পৃথিবীর প্রথম সারির একটি শহরের অত্যাধুনিক ফ্ল্যাটে থেকে্ও এই ক্লেদকীষ্ট বয়স্ক লোকটাকে তার বিপদের সময় মাথা গোজারঁ একটু টুকরো ঠাইঁ দিতে পারিনি! এত রান্না করি, অথচ এই লোকটার জন্য এক বাটি তরকারীর ব্যবস্থা করতে পারলাম না! কত অভাগা আমি!! নতুন জাগায় এসে বেচারা রাস্তা হারিয়ে ফেলেছে!! আমি না আসলে আরো কতক্ষন পথ খুজেঁ বেড়াত, কে জানে? বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো!

হঠাৎ গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়তে লাগলো, আংকেল তার ব্যাগ থেকে ছাতা বের করে আমার হাতে দিয়ে বল্লেন – “না্ও বাবা, এটা ধরো!”

আমি অবাক হয়ে বল্লাম – “আংকেল, আপনি…?”

-“আমি বুড়ো মানুষ, তোমরা বাচ্চা ছেলে, তার উপর আজ সকালে দেখলাম তুমি কাশছো, তোমার মনেহয় ঠান্ডার ধাত আছে, বৃস্টিতে ভিজলে ঠান্ডা লাগবে, অসুখ করবে, তোমার মা-বাবা কষ্ট পাবেন। সন্তানের অসুখ বিসুখ মা-বাবা কি করে সহ্য করেন বলো?”

আমি আংকেলের হাত থেকে ছাতা নিয়ে আমাদের মাথার উপর মেলে ধরলাম। গলার কাছে কি যেন আটকে আসছিলো! চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে গেল, মেয়েটির ছোটবেলার সেই ছবিটার চেয়ে্ও অনেক বেশী!! বৃষ্টির জন্যই কিনা কে জানে!

ধর্মে হিন্দু জাতে ক্ষত্রিয় মেয়েটি হচ্ছে সুলগ্না। আর গল্পে যে বাবার কথা বলেছি, তিনি ওর বাবা। সুলগ্নাকে নিয়ে আমি প্রায়ই লিখি। সুগল্না কোন কাল্পনিক চরিত্র নয়।

ছবি সৌজন্যে

স্বপ্নদুয়ারে রেজিষ্ট্রেশন না করেও আপনার ফেসবুক আইডি দিয়েই মন্তব্য করা যাবে। নীচের টিক চিহ্নটি উঠিয়ে কমেন্ট করলে এই পোষ্ট বা আপনার মন্তব্যটি ফেসবুকের কোথাও প্রকাশিত হবে না।

টি মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *