সিডর, আইলা আর মহাসেনরা চিরতরে ঠাইঁ নিক ইতিহাসের পাতায়

ঝড়১৯৯১ সালে চট্টগ্রাম ও স্বন্দীপের বুকে প্রলয়ঙ্কারী এক ঝড় বয়ে যায়, আমি জানি না সে ঝড়ের কি নাম রাখা হয়েছিলো। তবে এটুকু জানি, সে ঝড়ের সময় যারা শিশু ছিলো, আজ তারা যুবক। কিন্তু সেই ঝড়ের ভয়াল স্মৃতি এখনও নিশ্চয়ই তাদের তাড়া করে ফেরে। আমার ধারনা, প্রতিবছরই গ্রাষ্মের এই সময়টাতে তারা ছোটবেলার ঝড়ের স্মৃতিচারণ করেন। এমন একজনের কাছে থেকে তার ছেলেবেলার মর্মান্তিক সব ঘটনা শুনলাম।

৯১ সালে বেচারা তখন মাত্র ক্লাস টু তে পড়ে, টিনের মাচায় উঠে সে পরিবারের সাথে আত্নরক্ষা করেছে। বাকীটা তার জবানীতে – ”ওই ভয়াল রাতের শেষে যখন সকাল হল সবার চিৎকার-চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙল আমার। তখন বাইরে এসে কিছুই বিশ্বাস হচ্ছিল না! দেখলাম, আমাদের ঘরের দুই তৃতীয়াংশই ধ্বংস হয়ে গেছে। বাড়ির আশে পাশের গাছপালার ৭০-৮০% ভাঙ্গা নয়তো উপড়ানো। ৫টা পুকুরের একটাও ভাল নেই। সবগুলোতে সমুদ্রের নোনা পানি। ক্ষেতের কোন ফসল নেই সব পানির নীচে। আমার মনে আছে তারপরের ৭-৮ দিন সবাই ফসলের ক্ষেতের, সমুদ্রের আর পুকুর থেকে বের হয়ে আসা মাছ মেরে খাইছে। ড্রামে রাখা চাল – শুকনা খাবার আর মাছ। কোন সবজি ছিল না অনেক দিন পর্যন্ত। বেশীর ভাগ গরু ছাগলই হয় হারিয়ে গিয়েছিলো নয়তো মৃত পড়ে থাকতে দেখেছি উঠানের উপর। আমাদের দুধের গরুটা কোন এক স্কুলের মাঠে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল!

সন্দ্বীপের কত মানুষ ওই ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণ দিয়েছে খেয়াল নাই তবে, প্রথম দিনই আমরা বাড়ির বড় উঠোনের কোন গাছের ঝোপেঁ একটা মেয়ের লাশ পেয়েছিলাম। কোন ঠিকানা খুঁজে না পেয়ে আমার দাদার পাশের তাকে কবর দেই।” [সূত্র: এখানে]

আরেকটু কোট করি একটা মফস্বল নিউজপেপার থেকে – “ সাম্প্রতিক ইতিহাসে সিডরের ধ্বংসজজ্ঞ ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। সিডরের সময় যারা দক্ষিণের বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, ঝালকাঠী জেলায় অবস্থান করেছিলেন তারা আজো ঘূর্ণিঝড়ের সতর্ক বার্তা পেলে আতকে ওঠেন। মঠবাড়িয়া প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি আবদুস সালাম আজাদী বলেন, সিডর আর আইলার ধ্বংসজজ্ঞ নিজের চোখে না দেখলে বর্ণনা করে কিছুই বোঝানো যাবে না। আর সিডরে বাতাসের যে গতিবেগ ছিল আমার ৫০ বছরের জীবনে তেমন বাতাসের গতি আর দেখিনি। সাংবাদিক শাহ আলম জানান, সিডরে এ অঞ্চলের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল গত ছয় বছরেও তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। এবার যদি সিডর বা আইলার মতো কিছু হয় তাহলে কৃষকেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ ছাড়া যারা মাছের চাষ করেন তাদেরও অনেক ক্ষতি হবে।

সিডরের পরে একটি পুকুরেও মাছ ছিল না। কোনো গাছে পাতা ছিল না। বড় বড় গাছ সমূলে উঠে গিয়েছিল। যে কয়টা গাছ অবশিষ্ট ছিলো সে কয়টা গাছের প্রায় প্রতিটিতে হয় মানুষের লাশ ঝুলে ছিলো নয়তো গবাদি পশুর!”

আমার জন্ম হয়েছে ঢাকার আজিমপুরে। আমার জন্মের আগের রাতে সেখানে প্রচন্ড ঝড় হয়েছিলো, তাই আম্মু নাম রেখেছিলেন প্রলয় অথচ আমি জীবনে কখনই ঝড়ের তান্ডবকে প্রত্যক্ষ করিনি। কিন্তু যখন ছবি দেখি, যখন পত্রিকা পড়ি তখন শিউরে ওঠি। কিন্তু এই লোকটার স্মৃতিচারন ও উপরিউক্ত কোটেশন যেন আমাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো ঝড়ের আফটার ম্যাথ কতটা ভয়ংকর হতে পারে।

১৯৯১ সালে সে ঝড়ে প্রায় দেড় লাখ লোক মারা গিয়েছিলো। এই অংকটা রীতিমতো আতঁকে ওঠার মতো। বিশেষ করে প্রথম বিশ্বের কাছে। কারন সেখানে হারিকেন ক্যাটরিনায় মারা গিয়েছিলো প্রায় শ খানেক লোক। সেখানে দেড় লাখ লোক মারা গেছে মানে তো একটা এপিডেমিক টাইপ ঘটনা। মহামারীতেও এত লোক মারা যায় না।

এরপর ২০০৭ এ সিডর ও ২০০৯ এ আইলা। মারা গেলো যথাক্রমে প্রায় আড়াই হাজার ও প্রায় দুইহাজার লোক। (তথ্যবিভ্রাট না ঘটে থাকলে)। সুখের বিষয়, যতই দিন যাচ্ছে, ঝড়ের সাথে আমরা ততই যুঝতে শিখছি। সেটা প্রযুক্তি দিয়ে হোক আর আমাদের মনোবল আর সচেতনতা দিয়ে হোক। তবে এ বছর মহাসেনের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রস্তুতি থাকায় স্মরন কালের ইতিহাসের সবচেয়ে কমসংখ্যক প্রাণকে আমাদের খোয়াতে হয়েছে ঝড়ে। মাত্র ২৩ জন। মহাসেন পুরোপুরি আঘাত হানতে পারেনি, এটাও অবশ্য অন্যতম প্রধান কারন।

তবু আমরা আশা করবো, এ বছর যতটুকু জনসচেতনতা আমরা দেখেছি, এর চেয়ে বেশী না পারি অন্ততঃ এর সমানটুকু যেন প্রতিবছরই দেখা যায়। এর চাইতে কম যেন কিছুতেই না হয়। মনে রাখতে হবে, এই সচেতনতার কল্যানেই আমরা মৃতের সংখ্যা ২২ বছরে দেড় লাখ থেকে ২৩ জনে নামিয়ে আনতে পেরেছি। বাংলাদেশের জন্য এটা অবশ্যই একটা বিরাট সাফল্য। খুব শীঘ্রই একটা দিন আসবে, যে দিন ঝড়ে আমরা আর একজনকেও হারাবো না। এমনকি একটা গবাদী পশুকেও না। এমন দিন আসবে, কৃষককে আর সহায় সম্বলহীন হতে হবে না ফসলসহ ফসলের মাঠ হারিয়ে; দরিদ্রকে আর নিঃস্ব হতে হবে না ঘরবাড়ি ভিটে মাটি হারিয়ে।

১৯৯১, সিডর, আইলা, মহাসেনকে যেন আগামী প্রজন্মেকে দেখতে হয় শুধু বইয়ের পাতায় আর কম্পিউটারের স্ক্রীনে পড়ে। আমরা তাদের কাছে গল্প করবো – ”দাদু ভাই, কোন এক কালে এই অঞ্চল দিয়ে প্রলয়ঙ্কারী ঝড় বয়ে যেতো..!” ওরা অবাক বিস্ময়ে, রূপকথার গল্পের অবিশ্বাস নিয়ে আমাদের গল্প শুনবে। খুব শীঘ্রই আসবে এই দিন।

ছবি কৃতজ্ঞতাঃ

 

স্বপ্নদুয়ারে রেজিষ্ট্রেশন না করেও আপনার ফেসবুক আইডি দিয়েই মন্তব্য করা যাবে। নীচের টিক চিহ্নটি উঠিয়ে কমেন্ট করলে এই পোষ্ট বা আপনার মন্তব্যটি ফেসবুকের কোথাও প্রকাশিত হবে না।

টি মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *