রূপকথাঃ রাজার সাধের গাধা আর আন্দালিব ভাড়ঁ

77fd4b5acdae0c46dc41dffe959860ae

একদা ছিলো এক রাজা। তাহার হাতীশালে হাতী, ঘোড়াশালে ঘোড়া, ভেড়াশালে ভেড়া, ছাগশালে ছাগল আর গাধাশালে গাধা। তো গাধাশালের শত শত গাধার মাঝে রাজার একটা অতীব প্রিয় গাধা ছিলো। সে গাধা খুবই প্রফুল্ল মেজাজের গাধা। সব সময় সে হাসি খুশী থাকে। তাই রাজা শিকারে গেলে রাজবহরে অবশ্যই সে গাধা থাকে। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহ ধরিয়া তাহার কি যে হইয়াছে কিছুতেই বোধগম্য হইতেছে না। গাধা আর আগের মতো হাসিখুশী থাকেনা। সর্বদা মন খারাপ করিয়া বসিয়া থাকে। ইহা দেখিয়া রাজাও খানা পিনা ছাড়িয়া দিলেন। তাহার প্রিয় গাধা হাসে না, ইহার চাইতে মর্মন্তুদ ঘটনা আর কি হইতে পারে?

কত ডাক্তার, কবিরাজ আর বদ্যি ডাকিয়া আনা হইলো। তাহারা গাধার নাড়ী পরীক্ষা করিয়া টিপিয়া টুপিয়াও কোন রোগ ধরিতে পারিলেন না। রাজা হাল ছাড়িয়া দিলেন। আরো বিমর্ষ হইয়া গেলেন।

এমতবস্তায় মন্ত্রী মহাশয় একখানা পরামর্শ দিলেন। রাজ্য হইতে সকল ভাড়ঁদিগকে ডাকিয়া আনা হউক। তাহারা উক্ত গাধার সামনে ভাড়াঁমো করিবে, নর্দন কুর্দন করিবে। তাহার রাজ্যে সব পৃথিবীসেরা ভাড়ঁ। গাধা না হাসিয়া কোথায় যাইবে? মন্ত্রীর বুদ্ধি রাজার অতিশয় পছন্দ হইলো। রাজার পাইক পেয়াদা তৎক্ষনাৎ রাজ্যময় ঘোষনা করিয়া দিলেন, যে ভাড়ঁ তাহার ঘোড়াকে হাসাইতে পারিবে, তাহাকে লক্ষাধিক স্বর্ণমুদ্রা প্রদাণ করা হইবে।

পরদিন প্রাতঃ হইতেই রাজ দরবারে রাজ্যের যাবতীয় ভাড়েঁর আনাগোনা লাগিয়া গেলো। রাজ দরবারে উপস্তিত সকলেই ভাড়ঁগণের ভাড়াঁমো দেখেন আর হাই তুলেন। কিন্তু দিনের পর দিন যাইতে লাগিলো, কেহই রাজার প্রিয় গাধাকে হাসাইতে পারে না। রাজা অত্যধিক বিরক্ত হইলেন। ঘোষনা করিলেন, আগামীকল্যের ভিতরে গাধা না হাসিলে ভাড়ঁগণের গর্দান যাইবে।

ভাড়ঁগন এতদিন পয়সার লোভে কাজ করিয়া গিয়াছিলো, এইবার জীবনের মায়ায় তাহারা স্বউদ্যোগে গাধাকে হাসাইবার ব্যবস্থা নিলো। পাশের রাজ্য হইতে গোপনে এক ভাড়ঁকে ভাড়া করিয়া আনা হইলো। এই ভাড়ঁ তাহার রাজ্যের সেরা ভাড়ঁ। কিন্তু সুখের কথা, তাহারে অতি স্বল্প দামেই ভাড়াঁ করিতে পারা যায়। ভাড়েঁর নামখানাও বড়ই সুন্দর। আন্দালিব রহমান পার্থ।

তো পরদিন প্রাতেঃ রাজ্যের সকল ভাড়ঁ উহাকে সাথে নিয়া রাজ দরবারে আগমন করিলেন। সবার সম্মুখভাগে পাশের রাজ্যের ভাড়ঁখানা অগ্রে অগ্রে চলিতে লাগিলো। রাজার গাধাখানা তখন বিরসবদনে ঘাস চিবাইতেছিলো। পাশের রাজ্যভাড়ঁ পার্থের দিকে এক নজর তাকাইয়া আবার বিরসবদনে ঘাস চিবানোতে মনোনিবেশন করিলো।

পাশের রাজ্যের সেরা ভাড়ঁ আন্দালিব রহমান পার্থ রাজদরবারের ডায়াসে উঠিয়াই উচ্চস্বরে বলিয়া উঠিলোঃ “’জামাত মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কোন কথা বললে, আমিই হব প্রথম ব্যক্তি যে প্রথমে তার প্রতিবাদ করবে” – ভাড়েঁর কথা শেষ হইয়াছে কি হয় নাই, রাজার প্রিয় গাধা ঘাস চিবানো বন্ধ করিয়া লাফাইয়া উঠিলো। বড় বড় চোখ করিয়া কিয়ৎক্ষন পার্থ ভাড়েঁর দিকে তাকাইয়া পরক্ষনেই দন্ত বিকশিত করিয়া প্রবল হাসিতে ফাটিয়া পড়িলো। কি তাজ্জব!!

রাজা খুশী হইয়া গেলেন। রাজ দরবারে সকলের মুখে হাসি ফুটিলো। রাজা ঘোষনা করিলেন, পার্থ ভাড়ঁকে লক্ষাধিক স্বর্ণমুদ্রা দেয়া হউক। অর্থমন্ত্রী মহোদয় বিভিন্ন প্রটোকল মানিয়া সেই টাকা আনিতে আনিতে দুপুর গড়াইয়া ফেলিলো। হাজার হোক, এতগুলা টাকা। কিন্তু সমস্যা হইলো, রাজার প্রিয় গাধাখানার মুখ হইতে হাসি আগেকার ন্যায় উধাও। সে আবার মুখ ভার করিয়া বসিয়া আছে।

রাজা দুপুরের খানা বাদ দিয়া আবার জরুরী সভা ডাকিলেন। সিদ্ধান্ত হইলো, প্রিয় গাধাকে না হাসাইয়া পার্থভাড়ঁ রাজ দরবার হইতে একচুলও নড়িতে পারিবে না। নড়িলে গর্দান যাইবে। পার্থভাড়ঁ অতীব সাহসী ভাড়ঁ। সে রাজার সিন্ধান্তে ভয় না পাইয়া বলিলো, আমি শেষ চেষ্টা করিয়া দেখিতেছি। ইহার পর না হাসিলে আমার আর কিছূ করার নাই। কিন্তু এই কথাটা আমি গাধার কানে কানে বলিতে চাই। রাজা বলিলেন, বেশ তো। কিন্তু পার্থভাড়ঁ গাধার দিকে এগুতেই পারে না। এক অজানা কারনে পার্থকে দেখিবা মাত্রই গাধা তাহার দিকে তাড়িয়া ফুড়িয়া আসিতে চাহে। পার্থভাড়ঁ বলিলো, ”রাজা মশাই, গোস্তাকি মাফ। আপনার গাধাখানা বড়ই বেয়ারা। আপনি ইহাকে শক্ত করিয়া ধরিয়া রাখিবার ব্যবস্থা না করিলে আমি আমার কার্যসমাধা করিতে পারিবো না। এই বয়সে গাধার হাতে প্রাণদান করিবো নাকি?” রাজা বলিলেন, ঠিকিই বলিয়াছো। রাজার গাধাশালের লোকজন গাধাকে ধরিয়া রাখিলো, আর পার্থভাড়ঁ অগ্রসর হইলো। কিন্তু কি কান্ড, গাধাকে কিছুতেই ধরিয়া রাখা যায় না। তাহার শিং নাই, তবু সে পার্থভাড়ঁকে গুতাঁ মারিবেই মারিবে।

cartoon-dumb-ass

মন্ত্রীমহাশয় এ বিপদ থেকে রক্ষা করিলেন। তিনি বলিলেন, হোয়াই ডন্ট উই ডু এ থিং? রাজা বিরক্ত হইয়া বলিলেনঃ ”উফ মন্ত্রী, তোমাকে নিয়া আর পারিলাম না। আমার সাধের গাধাকে বাগ মানাইতে পারিতেছি না, হাসাইতে পারিতেছি না আর তুমি ইংরাজী ‍ুদাইতেছো? কোন বুদ্ধি থাকিলে বলো।” মন্ত্রী বলিলো, উহাই তো বলিতে চাহিতেছি রাজামশাই। পার্থভাড়কেঁ গাধার ছাল পরাইয়া আপনার গাধার কাছে পাঠনো হউক। গাধা বুঝিবে না উহা আদতে মানুষ নাকি গাধা। রাজা গম্ভীর হইয়া বলিলেন, হুমম। কিন্তু পার্থভাড়ঁ কি ছাল পরিতে রাজী হইবে? মন্ত্রী বলিলেনঃ ”অবশ্যই হইবে। আমি শুনিয়াছি, টাকা পাইলে সে শুয়োরকেও বাপ বলিয়া ডাকিতে পারে। আর ইহা তো নস্যি!” রাজা খুশী হইয়া বলিলেন, বাহ।

যেই কথা সেই কাজ। রাজ দেখিলেন মন্ত্রীর কথাই ঠিক। পার্থভাড়ঁ অত্যন্ত আনন্দের সহিত গাধার ছাল পরিধান করিলো। তাহার পর রাজার সাধের গাধার পাশে গিয়া কোনমতে কানে কানে ফিসফিস করিয়া কি যেন বলিলো। ইহার পর উপস্তিত সকলেই যেন এক ভোজবাজি দেখিলো। গাধা চিহি চিহি করিয়া হাসিতে হাসিতে রীতিমতো গড়াগড়ি খাইতে লাগিলো। রাজা ও মন্ত্রী অতিশয় খুশী হইলেন। আর এ যাত্রা প্রাণে বাচিঁয়া যাওয়াতে উপস্তিত সকল ভাড়ঁ হাফ ছাড়িয়া বাচিঁলো।

রাজা ঘোষণা করিলেন, ”পার্থভাড়ঁকে দুইলক্ষ স্বর্ণমুদ্রা দেয়া হউক। আর আমার রাজ দরবারের প্রধান ভাড়ঁ হিসাবে তাহাকে নিযুক্ত করা হউক।” সেইসাথে রাজা পার্থভাড়কেঁ একশত অতিকায় মারখোর ছাগল উপহার দিলেন। এতসব উপহার পাইয়া পার্থভাড়ঁ মূর্ছা যায় আর কি!

সবশেষে যাইবার কালে, রাজদরবারের সাবেক প্রধান ভাড়ঁ সদ্য নিযুক্ত পার্থভাড়ঁকে শুধাইলো – “আপনি কানে কানে গাধার কর্ণে কি বলিয়াছিলেন উহা জানিতে মন চাহিতেছে।” পার্থভাড়ঁ সরলমুখে বলিলো, আমি শুধু বলিয়াছিলাম – ”পাকিস্তান নিরাপত্তার ভয়ে বাংলাদেশে আসিয়া খেলিতে চাহিতেছে না। তাহাতে যে এই ফল হইবে বুঝি নাই।” পার্থভাড়ঁ তাহার কথা শেষ হইবার আগেই দেখিলো উপস্তিত সকল ভাড়ঁও গড়াগড়ি দিয়া হসিতে হাসিতেছে। তাহার কথা শুনিয়া গাধাই হাসে, সুতরাং ভাড়রাঁও যে হাসিবে উহাতে আর আশ্চর্য কি?

 

 

স্বপ্নদুয়ারে রেজিষ্ট্রেশন না করেও আপনার ফেসবুক আইডি দিয়েই মন্তব্য করা যাবে। নীচের টিক চিহ্নটি উঠিয়ে কমেন্ট করলে এই পোষ্ট বা আপনার মন্তব্যটি ফেসবুকের কোথাও প্রকাশিত হবে না।

টি মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *