মোহগ্রস্থ প্রেম বনাম ঐহিত্যবাহী প্রেম

    মোহগ্রস্ত বা ইলিউশনাস প্রেম এবং ঐহিত্যবাহী বা ট্রেডিশনাল প্রেমের মধ্যে পার্থক্য কি?

4944639337_3c41cfdc68_b
মোহগ্রস্ত বা ইলিউশনাসপ্রেমঃ

মোহগ্রস্ত বা ইলিউশনাস প্রেম হলো অনেকটা পুতুপুতু শ্রেনীর প্রেম। শুরু হয় ভাললাগা দিয়ে। পছন্দ করা দিয়ে। তারপর সেটা রূপ নেয় প্রেমে। প্রথম থেকেই এ প্রেমের আকর্ষন হয় দুর্বার।

মোহগ্রস্ত প্রেমের জন্য পার্টনারের ব্যাপারে তেমন কিছুই জানতে হয় না, এমনকি তার চেহারা-ছবি দেখাও আবশ্যক নয়। হঠাৎ বৃষ্টি সিনেমার পত্র মিতালী টাইপ প্রেমের মতো পরস্পরকে না দেখেই প্রেমে হাবুডুবু খাওয়া সম্ভব। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে পার্টনারকে মিস করা শুরু হয়। রাত যত গভীর হতে থাকে, মিস করা তত বাড়তে থাকে। সারাদিনে যার কথা মনেও পড়ে না, তার সাথেই কথা বলতে না পারলে মরে যেতে ইচ্ছে করে। এদের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হয় চিঠি, হাল আমলে ফেসবুক বা ইমেইল এবং খুব অল্প সময়ের ভেতর সেটা মোবাইল নম্বর আদান-প্রদানে গিয়ে ঠেকে। এরপর আর দেখতে হয় না। প্রেম তর তর করে এগিয়ে চলে। এ প্রেমের একটা বড় সুবিধা হলো, দুজনের প্রতি দুজনের কমিটমেন্ট এবং/অথবা প্রত্যাশা তুলনামূলকভাবে কম থাকে।

মোহগ্রস্ত প্রেমের সবচাইতে আকর্ষনীয় অংশ হচ্ছে ইথারে ইথারে ইথার রাতে প্রেম। মানে সারা রাত ধরে ফোনে কথা বলা বা চ্যাট করা। অনেক প্রবাসী পুরুষ সারারাত স্কাইপেও কথা বলেন কলিং কার্ডের খরচা বাচাঁতে। এই ইথার রাত একটা কিশোর-কিশোরী বা তরুণ তরুনীর জন্য ভয়াবহ হয়ে দাড়াঁতে পারে। ঘনিষ্ঠতার এক পর্যায়ে রোমান্টিক কথা থেকে তারা ‘দূরালাপনযৌনতায়’ গিয়ে পৌছাঁয়।

মেয়েদের ক্ষেত্রে মোহগ্রস্ত প্রেম শুরু হয় ছেলেদের সাহিত্য বা শিল্পচর্চায় মুগ্ধ হয়ে। (একটা কবিতা পড়েই কবির প্রেমে পড়ে গিয়েছেন, একটা শিল্প কর্ম দেখেই শিল্পীর প্রেমে দেওয়ানা হয়েছেন, এমন অসংখ্য মেয়ে খুজেঁ পাওয়া যাবে)। আর ছেলেদের ক্ষেত্রে এ প্রেম শুরু হয় মেয়েদের ললিতকলা চর্চায় মুগ্ধ হয়ে। (শুধুমাত্র অসাধারন গায়কীর গুনে গায়িকার প্রেমে পড়েছেন, এমন ছেলে বিস্তর। যদিও এ যুগে এদের সংখ্যা কিছুটা কম, তবে আমাদের বাব-চাচাদের আমলে এই ধরনের ছেলের সংখ্যা ছিলো অগুনতি। বিশ্বাস না হলে নিজেদের বংশে একটু খোজঁ নিয়ে দেখুন)। মোহগ্রস্ত প্রেমের এক পর্যায়ে সংগী এবং সংগীনি পরস্পরের ব্যাপারে মনে মনে ইচ্ছেমতো কল্পনা করে নেন। যেমন: ছেলেটা দেখতে কেমন, কতটা হ্যান্ডসাম, লম্বায় কতটা, কি জামা পড়ে ইত্যাদি বা মেয়েটার চোখগুলো কেমন, চুল লম্বা কিনা, ফরসা কিনা ইত্যাদি। মজার ব্যাপার নিজের চোখে না দেখা পর্যন্ত নিজের অপছন্দের জায়গাটুকুতে কারো কোন আপত্তি থাকে না। সামনাসামনি দেখার পরই সমস্যার শুরু হয়।

আরেকটু সহজ করে বলি। ধরুন, কোনরূপ চেহারা ছবি না দেখেই আপনার একটা মেয়েকে ভাল লেগে গেলো। এদিকে আপনার সারা জীবনের শখ ফরসা মেয়ে বিয়ে করবেন। কিন্তু ভাল লাগা মেয়েটি ফোনে বলেছে যে সে শ্যামলা। আপনি বলেছেন, সমস্যা নেই। কিন্তু সম্পর্কের এক পর্যায়ে মেয়েটাকে সামনা সামনি দেখলেন, তখনই আপনার মন খারাপ হওয়া শুরু করলো। একটা সময় শুধুমাত্র এ কারনে আপনি ব্রেকাপ করে দিলেন। আমার বেশ কয়েকজন বন্ধুর ক্ষেত্রে এমনটা ঘটেছে। তবে উল্টাটাই নাকি বেশী হয় শুনেছি। মানে মেয়েরাই এ পর্যায়ে এসে সবচাইতে বেশী বেকেঁ বসে।

মোহগ্রস্ত প্রেমের সবচাইতে কঠিন পর্যায় হচ্ছে এই সামনা সামনি দেখা হওয়া পর্ব। এ পর্বে যারা উত্তীর্ণ হতে পারেন, তাদের সম্পর্কই শেষতক টিকে যায়। টিকে গিয়ে পরিনত হয় ট্রাডিশনাল প্রেমে। বাকীদের ব্রেকাপ হয়ে যায়। একটা মোহগ্রস্থ প্রেম গড়ে ৩ থেকে ৮ মাস টেকে।

পাঠক, উপরে যেসব সিম্পটম উল্লেখ করা হলো, সেগুলো আপনার প্রেমের সাথে মিলে গেলে ধরে নিবেন আপনার প্রেম মোহগ্রস্ত প্রেম। সুতরাং, বেহুদা ট্রাডিশনাল প্রেমের হ্যালুসিনেশনে ভুগবেন না।

ঐহিত্যবাহী বা ট্রাডিশনাল প্রেমঃ

এ প্রেম মোহগ্রস্ত প্রেমের উল্টো। যদিও এ প্রেমও শুরু হয় ভাললাগা দিয়ে। পছন্দ করা দিয়ে। তারপর সেটা রূপ নেয় প্রেমে। তবে প্রথম থেকেই এ প্রেমের আকর্ষন অতটা দুর্নিবার থাকে না। থাকে সাদামাটা। পরস্পরের চেহারা-ছবি দেখা অত্যাবশ্যক। ট্রাডিশনাল প্রেমিক প্রমিকারা ষাধারনত সারাদিনই দুজন দুজনকে মিস করে। তাদের যোগযোগের মাধ্যম বেশীরভাগ সময়ই সরাসরি কথা থেকে মোবাইলে গিয়ে ঠেকে। আর নিয়মিত ডেটিং তো আছেই। ট্রাডিশনাল প্রেমের সবচাইতে আকর্ষনীয় অংশই হচ্ছেই এই ডেটিং। এ বিষয়ে আর বিস্তারিত বল্লাম না। এ প্রেমের সবচে বড় সুবিধা হলো , বিভিন্ন ওকেশানে দামী দামী গিফট পাওয়া যায়। গার্লফ্রেন্ড/বয়ফ্রেন্ড নিয়ে বন্ধুদের সামনে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ানো যায়। সুবিধামতো বাসায়ই নিয়ে আসা যায়।

ছেলেদের ক্ষেত্রে ট্রাডিশনাল প্রেম শুরু হয় মেয়েদের বাহিক্য সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে। আর মেয়েদের ক্ষেত্রে শুরু হয়, ছেলেদের বাহিক্য সৌন্দর্য্য এবং/অথবা ব্যক্তিত্ব এবং/অথবা ক্যারিয়ার এবং/অথবা মেয়ে পটানোর ক্ষমতায় মুগ্ধ হয়ে।

ট্রাডিশনাল প্রেমের সবচাইতে কঠিন পর্ব হচ্ছে “ওপেন রিলেশনশীপ” আটকানো। অর্থাৎ, রিলেশনশীপের ভেতর থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার যাতে না ঢুকে পড়ে, সেটা নিশ্চিত করা। প্রায়শই দেখা যায়, একটা ছেলে বা মেয়ে একইসাথে একাধিক ছেলে বা মেয়ের সাথে প্রেম চালিয়ে যাচ্ছে। যেগুলো বেশীরভাগই মোহগ্রস্ত বা ইলিউশনাস প্রেম। অনেক সময় দেখা যায়, প্রথম থেকে ওপেন রিলেশনশীপের কমিটমেন্ট থাকলেও পরবর্তীতে যে কোন একজন (হয় গার্লফ্রেন্ড নয়তো বয়ফ্রেন্ড) সেটা আর মেনে নিতে পারে না। নিজেদের ভেতর ৩য় ব্যক্তির অনুপ্রবেশ সহ্য করতে পারে না। এবং হালের বেশীরভাগ ট্রাডিশনাল প্রেম এই ওপেন রিলেশনশীপের কারনে মুখ থুবড়ে পড়ে, ব্রেকাপ হয়ে যায়। যারা এ পর্বে উত্তীর্ণ হয়, পারিবারিক ঝামেলা না থাকলে তাদের বেশীরভাগেরই সম্পর্ক বিয়েতে গড়ায়। পাঠক, লক্ষন মিলে গেলে ধরে নেবেন আপনি ট্রাডিশনাল প্রেমাক্রান্ত।

[পুরোটাই আমার ব্যক্তিগত মতামত। কোন কারনে কারো আতেঁ ঘা লাগলে অগ্রিম দু:খপ্রকাশ করে রাখলাম।]

ছবি কৃতজ্ঞতাঃ

 

স্বপ্নদুয়ারে রেজিষ্ট্রেশন না করেও আপনার ফেসবুক আইডি দিয়েই মন্তব্য করা যাবে। নীচের টিক চিহ্নটি উঠিয়ে কমেন্ট করলে এই পোষ্ট বা আপনার মন্তব্যটি ফেসবুকের কোথাও প্রকাশিত হবে না।

টি মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *