মেয়েদের গায়ে হাত তোলা সবচেয়ে নীচ কাপুরুষের কাজ

অনেক ছোটবেলায় আম্মুর কাছ থেকে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ লেসন পেয়েছিলাম।

যখন প্রাইমারিতে পড়ি, তখন আমাদের বাসায় প্রায় আমার মতো বয়সীই একজন গৃহপরিচারিকা ছিলেন। তার একটা রুটিন কাজ ছিলো, আমাকে প্রতিদিন বিকেলে মগ ভর্তি করে গরুর দুধ দেয়া। সংগত কারনেই কাজটা আমি ভীষন অপছন্দ করতাম। কারন প্রতিদিন নিয়ম করে মগ ভর্তি দুধ খাওয়া সেসময় আমার কাছে রীতিমতো এক ধরনের ফিজিক্যাল টর্চার মনে হতো। দু চুমুক খাবার পরই বমি বমি ভাব হতো। বেশ কিছুদিন এই টর্চার সহ্য করে একদিন চেষ্টা করলাম মেয়েটার সাথে একটা সন্ধি করতে। ওকে বল্লাম যে, আম্মুর অগোচরে মগ ভর্তি দুধটাকে দু ভাগ করে ফেলতে। এক ভাগ ও খাবে, আরেকভাগ আমি খাবো। তাহলে আমার উপর চাপ কমবে।

প্রথমে ছোটভাইর কথা মাথায় এসেছিলো যে বাকী অর্ধেক ওকে দেবো, কিন্তু ওকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি। ছোটবেলায় ওর চরম ব্ল্যাক মেইলিং এর স্বভাব ছিলো, মানে আমার দুর্বলতাগুলো খুজেঁ খুজেঁ বের করে সেগুলো আমার বিরুদ্ধে প্রয়োগ করে আমাকে দিয়ে ওর কাজগুলো ইচ্ছেমতো করিয়ে নিতো। তাই পারতপক্ষে ওর কাছ থেকে আমি সব সময় নিরাপদ দুরত্ব বজায় রাখতাম। বুঝেছিলাম যে, দুধের প্ল্যানের কথা ওকে কোনভাবেই বলে দেয়া যাবে না।

কিন্তু সেই মেয়েটাও বেকেঁ বসলো। তাকে কিছুতেই আমার প্রস্তাবে রাজী করাতে পারলাম না। সে কিছুতেই দুধ খাবে না। আমাকেই পুরোটা খেতে হবে। অনেক্ষন বোঝানোর পর শেষে হাল ছেড়ে দিয়ে রাগে দু:খে ওকে দুম দাম করে কয়েকটা কিল-ঘুষি মেরে বসলাম। ও চিৎকার করে পালিয়ে বাচঁলো।

রাতে আম্মু পড়ার টেবিলে আমার সামনে বসে শাসন করার ভংগিতে বল্লেন – “ওকে মেরেছো কেন?”

আমি চুপ করে রইলাম। বুঝলাম যে মেয়েটা আম্মুর কাছে নালিশ করেছে। ভাবলাম আজকে একটা মারও মাটিতে পড়বে না। কিন্তু আম্মু দুয়েক মিনিট বোকা ঝকা করে শান্ত স্বরে বল্লেন – ” একটা কথা সব সময় মনে রাখবে। মেয়েদের গায়ে হাত তোলা সবচেয়ে খারাপ কাপুরুষের কাজ।” একটু থেমে আবার বল্লেন, “শুধু কাপুরুষ না, সবচেয়ে খারাপ কাপুরুষের কাজ। তাই এরপর আবার যদি ওর গায়ে তুমি হাত তুলো, তুমি নিজেকে ভাববে যে, তুমি শুধু কাপুরুষ না, সবচেয়ে খারাপ একজন কাপুরুষ। মনে থাকবে?”

আমি মাথা নেড়েছিলাম। আম্মুকে জানিয়েছিলাম, মনে থাকবে। সেদিন নিশ্চিত মারের হাত থেকে বাচাঁর কারনে খুব খুশী হয়েছিলাম কিন্তু রাতে শোবার পর আম্মুর কথাগুলো আবার মাথায় আসলো। আম্মু আমাকে কখনই মারতেন না, শুধু যতবার পড়ার সময়ে অসুস্থতার অজুহাতে বিছানায় কম্বলের নীচে শুয়ে টর্চলাইট জালিয়ে গল্পের বই পড়েছি, ততবারই মার খেয়েছি। [দীর্ঘদিন ধরে লুকিয়ে অল্প আলোতে বই পড়ার কারনে ক্লাস টুতেই আমাকে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন চশমার দারস্থ হতে হয়েছিলো।] এছাড়া আর কখনো নয়। তবু সেদিন মনে হচ্ছিলো আম্মু আমাকে একটা হলেও চড় থাপ্পড় মারবেন। কিন্তু সে কেন আমাকে না মেরে শুধু কয়েকটা কথা বলে ছেড়ে দিলো? কারন তিনি বুঝেছিলেন, আমাকে প্রহারের চাইতে এই কথাগুলো বেশী কার্যকর হবে। আমার অহমে আঘাত দিয়ে আমাকে খুব প্রয়োজনীয় একটা শিক্ষা দিয়ে দিলেন।

পরবর্তী সময়ে আম্মুর কথাগুলো আমার মাথায় পাকাপাকিভাবে গেথেঁ গিয়েছিলো। এরপর আমি যতবারই দেখেছি বা শুনেছি যে কোন লোক তার বউকে পিটিয়েছে, বা কোন ছেলে কোন মেয়েকে মেরেছে, আমার বদ্ধমূল ধারনা হয়ে যেতো, ঐ লোকটি বা ছেলেটি একটা কাপুরুষ। শুধু কাপুরুষ না, সবচেয়ে খারাপ একজন কাপুরুষ।

আমার ভেতর যা কিছু ভাল আছে, তার সিংহভাগ আমার আম্মুর অবদান। বই পড়ার প্রচন্ড ঝোকঁ থেকে শুরু করে লেখালেখি করা, ছবি আকাঁ বা চিন্তা-ভাবনা – এ সবকিছুই পেয়েছি আম্মুর জিন থেকে। ছোটবেলা থেকেই আম্মুর ভেতর পরিমিতিবোধ, শিষ্ঠতা ও বুদ্ধিদীপ্ত আচরন দেখেছিলাম। মুন্সিগঞ্জের একটি অভিজাত এবং রক্ষনশীল পরিবারের সন্তান হয়েও আম্মু বাদ রাখেননি ললিতকলার কোন শাখা প্রশাখা পদচারনা করতে। একটি ধার্মিক পরিবারের মেয়ে হয়েও শিখিয়েছিলেন কিভাবে ধর্মীয় অনুশাসন মেনেও মুক্তমনা হওয়া যায়, নিজের বিবেকের কাছে মাথা উচুঁ করে দাড়াঁনো যায়। ধার্মিক হওয়া আর ধর্মান্ধ হওয়া যে এক জিনিস নয়, খুব ছোটবেলাতেই এই শিক্ষা তারঁ কাছ থেকে পেয়েছিলাম। আমার ধারনা, আমি যে শিক্ষাগুলো আম্মুর কাছ থেকে পেয়েছি, সেগুলো যদি আমার ছেলে-পেলেদের দিয়ে যেতে পারি, তাহলে সেটাই ওদের চলার পথের পাথেয় হিসাবে যথেষ্ঠ হবার কথা।

অনেক ছোটবেলায় আম্মুর কাছ থেকে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ লেসন পেয়েছিলাম।যখন প্রাইমারিতে পড়ি, তখন আমাদের বাসায় প্রায় আমার মত…

Posted by Proloy Hasan on Friday, September 25, 2015

(ছবিঃ প্রতিকী)

 

স্বপ্নদুয়ারে রেজিষ্ট্রেশন না করেও আপনার ফেসবুক আইডি দিয়েই মন্তব্য করা যাবে। নীচের টিক চিহ্নটি উঠিয়ে কমেন্ট করলে এই পোষ্ট বা আপনার মন্তব্যটি ফেসবুকের কোথাও প্রকাশিত হবে না।

টি মন্তব্য