মায়ের ভাষাকে আমাদের মতো আর কে পারবে এমন করে ভালবাসতে?

DSC_9144_0

দেশের বাইরে যাবার পর প্রথম দিকে দীর্ঘ একটা সময় আমি বেশ বৈরী সময় পার করেছি। সে সময় দেশের জন্য অসম্ভব খারাপ লাগতো! যথারীতি দেশকে প্রচন্ড মিস করতাম। সবচেয়ে বেশী মিস করতাম বৃষ্টির পরের ভেজা মাটির সোদাঁ গন্ধ আর আমার ছোটভাই আকিহাকে। বৃষ্টি এমনিতে আমার অসম্ভব প্রিয়, এমনকি পূর্ণিমার রাতের জোছনার চাইতেও অনেক বেশী প্রিয়, আর বৃষ্টির পরের সোদাঁ গন্ধটার জন্য যেন আমার আজন্ম হাহাকার। আকাশে মেঘ দেখলে মনটা খুশীতে পাগল হয়ে যায়। আম্মুর কাছে শুনেছি, ছোটবেলা থেকে কোন একটা কারনে আমি নাকি আকাশে মেঘ দেখলেই প্রচন্ড খুশী হয়ে যেতাম। সেই প্রবনতাটা এখনও আছে। সিডনীর মেঘ দেখেও খুশী হই, তবে সে খুশীটা কেমন যেন ন্যাতানো খুশী। সেখানে বৃষ্টি হবার পরও ভেজা মাটিতে সোদাঁ গন্ধ হয়। কিন্তু সে গন্ধটা ঠিক যেন আমার দেশের মাটির মতো এত আপন মনে হয় না….!

আবাসন সংকটের কারনে আমার ঠাইঁ হয়েছিলো মফস্বল এলাকার এক জোড়া অষ্ট্রেলিয়ান বুড়ো দম্পত্তির কাঠের ডুপ্লেক্স বাড়ীতে। নীচ তলায় তারা থাকতেন। উপর তলায় আমি আর দুয়েকটা এশিয়ান। বাংগালী তো দূরের কথা, ধারে কাছে কোন জনমানুষই ছিলো না তেমন। প্রায় তিন বছর আমি মন খুলে বাংলাতে কথা বলতে পারিনি। কাজ, ট্রেন, বাসা, ক্লাস – কোথাও বাংলা বলার জো ছিলো না। রাতে প্রচন্ড ক্লান্ত থাকা সত্ত্বেও দেশে ফোন দিয়ে আব্বু-আম্মুর সাথে কথা বলতাম। খুব যে বাবা-মা ন্যাওটা ছিলাম তা নয়, ফোন দিতাম বাংলা বলার লোভে।

বাংলা প্রায় ভুলতে বসছিলাম, মুখ খুললেই ইংরেজী, নিজের অজান্তে…শেষের দিকে ‘প্রায়’ এমন অবস্থা হলো আমি ইংরেজী থেকে বাংলা করে বলতাম, একদিন আব্বুর সাথে ফোনে কথা বলতে গেলে অনিচ্ছাকৃতভাবে এসে গেলো, আব্বু রাগ করলেন, বললেন – ‘আমার সাথে তুই ইংরেজী দেখাস? বেয়াদপ!’ আমি চমকে উঠলাম, যেন সম্বিৎ ফিরে পেলাম। তাই তো! আমার কি হচ্ছে এসব? সেদিন রাতেই নেট থেকে বাংলা ওয়েব সাইট খুজেঁ বের করে জোরে জোরে আবৃত্তি করলাম। সে সময় ইন্টারনেটে বাংলা সাইট বলতে ছিলো হাতে গোনা দুয়েকটা। তার উপর তখন ফন্ট সমস্যা ছিলো, মনিটরে ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলা অক্ষর দেখে চোখে প্রায় পানি আসার জোগাড় আমার! গুগলে বাংলা ব্লগ লিখে সার্চ দিয়ে পেলাম সামু ব্লগ। সেই থেকে শুরু। প্রচুর বাংলা বানান ভুল হতো (এখনো হয়)। স্বপ্নকে একটা দীর্ঘ সময় ‘সপ্ন’ লিখেছি। পরে আবার নিজেই নিজেকে শুধরেছি।

সামুর কাছে এই একটা জাগায় আমি কৃতজ্ঞ। সে হারানো প্রলয় হাসানকে পুরনো প্রলয় হাসানের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে।
প্রায় ৫০ কিমি ড্রাইভ করে কলকাতার বাঙ্গালীদের চালু করা একটা স্কুলে যাওয়া শুরু করলাম ছুটির দিনে। বাচ্চারা পড়তো, আমি পোর্চ থেকে শুনতাম তারা ছড়া কাটছে। রবী ঠাকুরের ছড়া, কামিনী রায়ের ছড়া, সুকুমার রায়ের ছড়া। আমার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তো, নিজের অসহায়েত্বের কারনে। চোখে পানি আসতো নিজের অধঃপতনের কথা মনে করে। এই আমি একসময় কবিতা লিখে আজিজের বন্ধুদের বাহবা কুড়িয়েছি, সে আমি তখন বাংলা শিশুতোষ ছড়া শুনে আনমোনা হয়ে যেতাম। আমার চিৎকার করে বাংলা বলতে ইচ্ছে করতো। বাংলায় খিস্তি দিতে ইচ্ছে করতো। সেই তিনটা বছর ছিলো দম বন্ধ হওয়া, আমার দেশের বৃষ্টি নেই, আমার দেশের মাটির স্যাতস্যাঁতে ঘ্রান নেই। রাতে ঝাল ঝাল করে ধনে পাতা আর শুটকির ভর্তা খেতে পারিনা। খেতে হতো বিস্বাদ স্মোকড লেদার জ্যাকেট মাছ আর লবন দিয়ে সেদ্ধ করা সবজি। মনে করলে এখনও বমি আসে।

এর ক’ বছর পর সিডনীতে প্রথম একুশে ফেব্রুয়ারী আনুষ্ঠানিকভাবে উদযাপন শুরু করা হয়। যে সব বাংগালীরা পকেটের ডলার আর নিজের মূল্যবান সময় দিয়ে এ্যাশফিল্ড সিটি কাউন্সিল থেকে অনুষ্ঠান করার অনুমতি নেবার হ্যাপা সামলেছেন, তাদের কাছে অষ্ট্রেলিয়ার আপামর বাংগালীদের কৃতজ্ঞের কোন শেষ নেই। আওয়ামীলীগ অষ্ট্রেলিয়ার শাখা এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলো। আমি ইউনির ক্লাস বাদ দিয়ে ছুটে গেলাম। গিয়ে দেখি আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো গানটা সাউন্ডবক্সে বাজছে। ঘাসের উপর সুন্দর ছোট একটা মনুমেন্ট। আবারো চোখ ভিজে গেলো আমার!

দেশের জন্য, মাটির জন্য, ক্ষমতার জন্য অনেক দেশই প্রাণ দিয়েছে, কিন্তু পৃথিবীর একমাত্র জাতি আমরা যে জাতি তার মায়ের ভাষার জন্য শরীরে প্রাণ অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছে। আর আমি সেই জাতির একজন হয়ে বাংলাকে প্রায় ভুলতে বসেছিলাম, নিজেকে ধিক্কার দিতেও ঘৃনা হচ্ছিলো। প্রতিজ্ঞা করলাম, আবার লেখা শুরু করবো, অনলাইনে, এবং শতভাগ বাংলায়। প্রচন্ড বাধ্য না হলে ইংরেজীতে একটা অক্ষরও না। জেদ করে দু বছর ধরে গড়া আমার ইংরেজী ব্লগটা মুছে ফেল্লাম ব্লগস্পট থেকে। অনুবাদ নয়, নতুন করে বাংলায় লিখতে শুরু করলাম সামুতে।

মনে আছে, তার কিছুদিন পর এক আইরিশ বসের সামনে আমার বাংগালী কলিগের সাথে বাংলায় কথা বলেছিলাম বলে সে রাগ করে গালি দিয়েছিলো, [বেচারা বাংলা বুঝে না, তাই তার সামনে বাংলা বললে মনে করতো আমরা বুঝি ওকে উদ্দেশ্য করে আজে বাজে কিছু বলছি] সেদিনই রাগ করে ওর মুখের উপর এফ ওয়ার্ড বলে কাজে ইস্তফা দিয়েছিলাম। এক ফোর্টনাইটের বেতনও আনতে যাইনি রাগ করে। অথচ সে সময় টাকার কি টানাটানি… হাজার হাজার ডলারের সেমিষ্টার ফি ঘাড়ের উপর ঝুলছিলো যেটার পুরোটাই আমার উপার্জিত অর্থের উপর নির্ভরশীল ছিলো…চাকরী ছাড়ার পর একদিন ওই আইরিশ শালাকে বাংলায় গালাগাল করে আসছি ইচ্ছামতো, বাংলাতে খিস্তি ঝাড়ার সাধ মিটিয়েছি মনের সুখে!!

মায়ের ভাষাকে আমাদের মতো আর কে পারবে এমন করে ভালবাসতে?

ছবিস্বত্বঃ লেখক

স্বপ্নদুয়ারে রেজিষ্ট্রেশন না করেও আপনার ফেসবুক আইডি দিয়েই মন্তব্য করা যাবে। নীচের টিক চিহ্নটি উঠিয়ে কমেন্ট করলে এই পোষ্ট বা আপনার মন্তব্যটি ফেসবুকের কোথাও প্রকাশিত হবে না।

টি মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *