Status

ভোজনরসিক বাঙ্গালির ভূরিভোজন!

DSC_5305

বাঙ্গালীর উৎসবের অভাব নাই। সেই উৎসব উপলক্ষ্যে ভূড়ি ভোজেরও কোন শেষ নাই। বাঙ্গালীর প্রায় সকল উৎসবে ভোজের আয়োজন দেখলে মনে হবে, উৎসবটা এখানে গৌন। ভোজনটাই মূখ্য। যদিও ‘ভোজ’ থেকে ‘ভোজন’ এসেছে, কিন্তু আক্ষরিক অর্থ বিচার করলে দুটোতে কোন মিল পাওয়া যায় না। ভোজন মানে খাওয়া। সেটা পোলাও কোর্মা হতে পারে, হতে পারে এক গ্লাস পানীয়ও। অপরদিকে ভোজ মানে হচ্ছে খাবার দাবারের এলাহী কারবার! সেখানে পোলাও কর্মা এবং পানীয়ের কোন অভাব থাকে না। তাই সঙ্গতকারনেই, ভোজ ও ভোজন আমাদের সংস্কৃতির দুটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ধর্মীয় উৎসবে খাওয়া, সাংস্কৃতিক উৎসবে খাওয়া, সামাজিক উৎসবে খাওয়া। কোন উৎসবেই খাবার অনুপস্থিত নয়। তবে সামাজিক উৎসবে ভোজের আয়োজনটা অন্য সমস্ত উৎসবকে যেন ছাড়িয়ে যায়। ছোটবেলা থেকেই দেখছি, বর-কণের চাইতেও বিয়ে বাড়ীর প্রধান আকর্ষন হচ্ছে ভোজন। বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়ে বর বা কণেকে না দেখেই ফিরে আসতে দেখেছি অনেককে, কিন্তু না খেয়ে ফিরে আসা? কাভি নেহি।

ছোট বেলা থেকেই দেখছি, বিয়ের দাওয়াতে গিয়ে লোকজনের কবজি ডুবিয়ে খাওয়া। ঝোলে-তেলে হাত-মুখ মেখে গাপুস গুপুস খাওয়া! দেশজ বিয়ের দাওয়াত পারতপক্ষে এড়িয়ে চলি, বলা বাহুল্য খাবারের অসুস্থ সংস্কারের কারনেই। গরমে ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে ঘি-তেল চর্বি সর্বস্ব পোলাও-রেজালা-জর্দা খাবার কোন মানে আমার কাছে নেই। গ্রীষ্মকালে ব্যাপারটা তো আরো ভয়ংকর হয়ে ওঠে। এ বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয়।

DSC_5313

একবার উচ্চপদস্থ একজন সরকারী কর্মকর্তার বিয়ের দাওয়াতে অংশ নিতে গিয়ে দেখি, একজন বিশাল দেহী গোফঁওয়ালা-ভূড়িওয়ালা লোক যথারীতি পোলাওয়ে কবজি ডুবিয়ে হাপুস হুপুস খাচ্ছেন। তার পরনের সাদা পাঞ্জাবীতে রেজালার ঝোল গেলে জাগায় জাগায় হলুদ ছোপ পড়ে গেছে। তার সারা শরীর ঘামে ভেজা, মাথার চুল থেকে ঘাম বেয়ে বেয়ে কপালে আসছে, এবং কপাল থেকে ঘাম তার প্লেটে পড়ছে টপ টপ করে। রেজালা নিতে গিয়ে সে ঘামের ছিটেঁফোটাঁ রেজালার বাটিতেও পড়ছে। কিন্তু সেদিকে তার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। সে খেয়েই চলেছে। তার পাশে তার স্ত্রী প্রায় একইভাবে খেয়ে যাচ্ছেন। পার্থক্য শুধু এতটুকু, মহিলাটি কিছুক্ষন পর পর পাশে বসা তার ছোট বাচ্চাটির নাকের ঝোল বাম হাত দিয়ে পরিস্কার করে দিচ্ছে, পরক্ষনেই সেই হাত শাড়ীর আচঁলে খানিকটা মুছেই রেজালার ঝোল নেবার জন্য বাড়িয়ে দিচ্ছে!! এইসব দৃশ্য দেখার পর স্বভাবতই আমার আর খাবার রুচি হলো না। অভুক্ত আমি টেবিল থেকে সটান উঠে আসলাম। সেদিনের পর থেকে আমি বিয়ের দাওয়াত, বিশেষ করে গ্রীষ্মকালের বিয়ের দাওয়াতগুলোকে প্রাণপন চেষ্টা করি এড়িয়ে চলতে।

যা বলছিলাম, বিয়ে বাড়ীর খাবারটা না খেলে যেন বিয়েতে দেয়া উপহারটা ঠিক পোষায় না। এক দম্পতিকে বলতে শুনেছিলাম – “এত টাকার উপহার দিলাম, যাচ্ছি মাত্র দুজন? কাজের মেয়েটাকেও সাথে নিচ্ছি না কেন?” উপহারের টাকা উসুল(!) করার লোকের অভাব ছিলো বলে শেষ মেষ কাজের মেয়েটাকেও দাওয়াত খেতে সংগে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো।

আরেকটা ব্যাপার, আমাদের দেশে ‘দাওয়াত’ এবং ‘খাওয়া’ এই দুটো শব্দ অতপ্রতভাবে জড়িত। তাইতো আমরা বলি, ‘দাওয়াত খেয়ে’ আসলাম। দাওয়াত যে সব সময় খাবার বস্তু নয়, আমার ধারনা এটা ছোটবেলা থেকেই আমাদের সন্তানদের শিখিয়ে দিতে হবে। নাহলে বিব্রত হতে হবে জনসমক্ষে। কি রকম? তাহলে আসুন ছোট্ট একটা গল্প বলি।

পুরান ঢাকার একটি বালক ছেলে রাজনীতিবিদ বাবার সাথে স্থানীয় এক মিটিংএ যাচ্ছে। দাওয়াত দেয়া হয়েছিলো শুধু বাবাকে কিন্তু বাবা শখ করে ছেলেকেও নিয়ে যাচ্ছেন। বেশ ভাল। পথিমধ্যে ছেলে বাবাকে শুধালো
– “আব্বা, আমরা যাই কই?”
– “সলিমুল্লারা মিটিং করতাচে, দাবাত দিচে। হেইহানে যাইতাচি।”

ছেলে খুব খুশী হলো। কারন সে খেতে খুব ভালবাসে । আর ছোটবেলা থেকেই সে জানে “দাবাত” মানেই হচ্ছে বিস্তর খানাপিনা।

তো মিটিং এ গিয়ে ছেলে চারদিকে তাকিয়ে দেখে কোথাও বড় বড় ডেকচি নেই। বিরানির গন্ধে চারদিক মো মো করছে না। সে খানিকটা অবাক হয়।

মিটিং চলছে আর পিচ্চি উসখুস করছে। এক সময় মিটিং শেষ হলো। যে যার মতো বাসায় চলে যেতে লাগলো। ছেলেকে নিয়ে যখন বাবাও রওনা দিতে যাবে, তখনই ছেলে বেকেঁ বসলো।

-“কই যাও আব্বা? খাইবা না?”
– কিয়ের খাওন? – বাবা তো অবাক!
– দাবাতে আইচো, আর খাইবা না? এইটা কেমুন কতা?
– “ও আইচ্ছা, এই দাবাতে তো খাওন নাইক্যা।” – বাবা এইবার বুঝে।
– না আব্বা, ইতরামি কইরো না। খাওন কই? খাওন দেও।

এরপর বাবা যতই বোঝায়, ছেলে বোঝে না। তার খাবার চাই-ই। চারপাশে লোক জমে গেছে ততক্ষনে। বাবা বলে, তরে হোটলে লইয়া খাওয়ামু চল। ছেলে তাতেও রাজী হয় না। তার “দাবাতের খাওন”-ই চাই। শেষে বাধ্য হয়ে পাশের গলির এক বিয়ে বাড়িতে গিয়ে ক্যাশ টাকা উপহার দিয়ে বাবা তার ছেলেকে “দাবাত” খাওয়ালো। এই হলো অবস্থা। উল্লেখ্য, এটা একটা বাস্তব ঘটনা। কল্প কাহিনী নয়।

DSC_5330

অনেকে খাবারের দোষটুকুও যথারীতি ধর্মের ঘাড়ে চাপাতে পাড়েন। তাদেরকে বলছি, অন্য ধর্মের কথা জানি না, কিন্তু ইসলাম ধর্মমতে সামাজিক উৎসবে খাবারের ব্যবস্থা কি?

১. ঈদের নামাজের আগে হালকা মিষ্টিমুখ রিকোমেন্ডেড। সেটা হতে পারে সেমাই, হতে পারে একটা মিষ্টি খেজুর। এই খাওয়াটা ফরয নয় মানে খেতেই হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। এই রীতি প্রধানতঃ রোজার ঈদের জন্য। ৩০ দিন রোজার পর ঈদের দিনে আমি যে রোজা রাখিনি এটা তার বাহ্যিক বহিঃপ্রকাশ কারন ঈদের দিনে রোজা রাখা যায় না।

২. আকিকার অনুষ্ঠানে সন্তানের বাবার সাধ্যমতো খরচা। সে যদি গরু বা খাসি না দিয়ে দুটো মুরগী দিয়েও করতে পারে, তাহলে তাই সই। একেবারে সার্মথ্য না থাকলে সেটুকুও দিতে হবে না। কিন্তু কেউ যদি মনে করে, আকীকাতে ভূড়িভোজ করা অবশ্য কর্তব্য, দরকার হলে সুদে ঋন নিয়ে খাসীর রেজালা দিয়ে আকীকা করতে হবে, তবে সে অবশ্যই ধর্মান্ধ।

৩. বিয়েতে খাবারের আয়োজনও তাই। সামর্থ্যের বাইরে এক ফোটাও নয়। আবার সামর্থ্য আছে বলেই যে ১৪ গ্রামের লোক দাওয়াত করে হেভি খানাপিনার ব্যাবস্থা করলাম, সেটাও ইসলামে নন-রিকোমেন্ডেড। বেশীরভাগ সাহাবীরা তাদেরঁ বিয়েতে আমন্ত্রিত অতিথিদের আপ্যায়ন করেছেন স্রেফ খেজুর দিয়ে। যাদেরঁ সার্মথ্য ছিলো, তারা হয়তো দিয়েছেন খেজুরের সাথে এক পেয়ালা ছাগদুধ। আমাদের মতো কবজি ডুবিয়ে খাবারের কোন ব্যবস্থা সেখানে কষ্মিনকালেও ছিলো না।

৪. আর সুন্নতে খাৎনাও যে ভূরিজোজের একটা উপলক্ষ্য হতে পারে, সেটা ইসলাম মনে হয় ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্টেই এসে প্রথম দেখেছে!

বাইরের দেশেও দেখেছি, সামাজিক উৎসবে প্রচুর খাবারের ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু ঐ ‘ব্যবস্থা থাকা’ পর্যন্তই। এর বেশী কখনো সেটাকে পাত্তা দেয়া হয় না। বর কনের বেশী তো নয়ই। আর ব্যবস্থা বলতে ভূরি ভোজের ব্যবস্থা নয়। হালকা নাস্তা, বড়জোর ফার্স্টফুড বা রিচ বেভারেজ থাকে ওয়েডিং পার্টিতে। আর একটা অতিকায় কেক। আর হ্যাঁ, থাকে মদের নহর। গ্লাসে নয়, জগ ভর্তি করে মদ খাওয়া হয়। ব্যস, এই! যে যার মতো করে একটু একটু করে নিজের হাতে প্লেটে নিয়ে খায়। কবজি ডুবিয়ে খাওয়ার কোন সুযোগ সেখানে থাকে না। তাই উপমহাদেশীয় প্রবাসীরা, দেশের বাইরে প্রথম যেদিন সাদা চামড়াদের বিয়ের দাওয়াতে যান, সেদিন ছোটখাট একটা ধাক্কা খান। এমনকি খাবার দাবারের অপ্রতুলকার কারনে অনেককেই দেখেছি, বিয়ের দাওয়াতকে সোজা ‘না’ করে দিতে!

DSC_5324

আর ওদের বিয়েতে আরেকটা ব্যাপার যেটা আমার অসম্ভব ভালো লেগেছে, আমাদের মতো ১৪ গোষ্ঠিকে বিয়েতে দাওয়াত করা হয় না। বিয়েতে প্রধান অতিথি থাকেন বর-কণে স্বয়ং, বড়জোড় তাদের বাবা-মা এবং ভাই-বোন। বাকীরা সব বর কনের বন্ধু-বান্ধবী। আর থাকেন একজন সেলিব্রেন্ট মানে বিয়ে পড়াবার কাজী। যারা সৌখিন তারা একজন পেশাদার ফটোগ্রাফার বা মিউজিশিয়ান ভাড়া করেন। ব্যস, এর বাইরে আর কেউ নন। খালা, মামা, ফুপা ফুপি, চাচা-চাচী, চাচতো ননাস, চাচতো দেবর – এই সবের কোনই বালাই নাই। যার ফলে তাদের বিয়েতে দাওয়াত সংক্রান্ত মনোমালিন্য বা দেনা পাওনা সংক্রান্ত বিবাদ কখনই হয় না।
অপরদিকে আমাদের গ্রামের বাড়ীতে একবার বিয়ের এক কনে তার বর পক্ষের এক মুরুব্বিকে পা ছুঁয়ে সালাম না করার অপরাধে আস্ত বিয়েটাই ভাংগবার উপক্রম হয়েছিলো!

বিয়েতে বেহুদা লোকজনকে দাওয়াত দেয়া আর কবজি ডুবিয়ে দাওয়াত খাবার অপসংস্কৃতির হাত থেকে আমাদের নিস্কৃতি মিলবে কবে?

[একটু আগে একটা বিয়ের দাওয়াত থেকে আসলাম। অনেক বছর পর দেশে আমার প্রথম বিয়ের দাওয়াত খাওয়া। ভেবেছিলাম, চিরাচরিত দৃশ্যটা কিছুটা হলেও পাল্টিয়েছে। কিন্তু গুড়ে বালি। তাই বাসায় এসেই এই স্ট্যাটাসটা দিয়ে মনের সুপ্ত ক্ষোভটা ঝাড়লাম!]

পোষ্টের ছবিগুলোর কপিরাইট আমার। 

https://www.facebook.com/proloyhasan/posts/10151280278962220

স্বপ্নদুয়ারে রেজিষ্ট্রেশন না করেও আপনার ফেসবুক আইডি দিয়েই মন্তব্য করা যাবে। নীচের টিক চিহ্নটি উঠিয়ে কমেন্ট করলে এই পোষ্ট বা আপনার মন্তব্যটি ফেসবুকের কোথাও প্রকাশিত হবে না।

টি মন্তব্য