বাস্তব জীবনের গল্পগুলো যদি সত্যিই এমন করে শেষ করা যেতো

blue_button_original_abstract_painting_enlarged

১. মেয়েটা ভীষনরকমের কালো বলে মুখ লুকায়। ফেসবুকে ছবি দেয় না। দুটো ছবি, সেগুলোও প্রাইভেসী দেয়া। সে ছাড়া আর কেউ দেখতে পায় না। মানুষজন মাঝে মাঝে ফেক প্রোফাইল বলে খোচাঁ দিলে সে কয়েক সেকেন্ডের জন্য প্রাইভেসী অফ করে। তারপর আবার প্রাইভেসি…

২. ছেলেটা খুবই মেধাবী। তারচাইতেও অনেক বেশী আবেগী। অসম্ভব বিনয়ী আর আবেগী ছেলেটা তার আবেগের সবটা ঢেলে দেয় তার লেখায়। তার লেখার পরতে পরতে আবেগ। শুরু আর শেষে আবেগ। ছেলেটা তার কাছের মানুষদের বিপদে সবার আগে ছুটে আসে। কিন্তু সুখের দিনে তাকে পাওয়া যায় না। বিপদে পাশে কেউ থাকে না, কিন্তু সুখের দিনে সাথে থাকার লোকের অভাব হয় না। ছেলেটা তাই মানুষের সুখের দিনে এসে বেহুদা ভীড় বাড়ায় না…

৩. মেয়েটা কবিতা পড়তে পছন্দ করে খুব। নাহ ভুল বলা হলো। সে আসলে তার প্রিয় মানুষটির কবিতাই পড়ে। আর কারো কবিতা সে পড়ে না। পড়তে চায়ও না। তার ধারনা, তার মানুষটা পৃথিবীর সবচাইতে সুন্দর কবিতা লেখে। ইনবক্সে একটা লোক তাকে বোঝায়, অন্যদের কবিতা না পড়লে কি করে বুঝবে যে সে সবচাইতে ভালো লেখে? মেয়েটার রাগ ওঠে লোকটার প্রতি। লোকটা বেশী বুঝে! ও সত্যিই তো অনেক অনেক ভালো লেখে। এটা জানার জন্য অন্যদের কবিতা কেন তার পড়তে হবে?

৪. লোকটার বিয়ের প্রথম বছরটা যেন সাইঁ করে উড়ে চলে গেলো। বাসর রাতে সারারাত দুজনে ছাদের উপর পাঁটি বিছিয়ে জোছনা দেখে ভোরের দিকে ঘুমুতে যাওয়া, বিকেলে রিকশা করে ঘুরতে বের হওয়া আর সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে বারান্দায় বসে এক কাপ চা দুটি পিরিচে ঢেলে দুজনে ভাগাভাগি করে খাওয়া …এখন এসব শুধুই দীর্ঘশ্বাস। সময়েআর ব্যস্ততা অনেক দূরে সরিয়ে নিয়েছে তাদের পরস্পরকে। বিয়ের প্রথমদিনগুলোর স্মৃতি প্রায়ই জাবর কাটে লোকটা সিগন্যালের জ্যামে বসে বসে।

৫. মেয়েটা সব সময়ই চাইতো একটা ছেলেকে সে তার একান্ত বন্ধুর মতো করে কাছে পাবে যে কোনদিন তাকে প্রপোজ করে বসবে না বোকার মতো। কিন্তু এ পর্যন্ত যাকেই সে বন্ধু ভেবেছে, শেষতক সে-ই তাকে প্রপোজ করে বসেছে। মেয়েটা কষ্টে ভেঙ্গে পড়ে। হোষ্টেলের সবগুলো মেয়ের কি দারুন সব ছেলে বন্ধু থাকে, শুধুই বন্ধু। প্রেমিক নয়। কিন্তু তার হলো না কেন? মেয়েটা প্রতি রাতে মন খারাপ করে ঘুমুতে যায়।

৬. ছেলেটা স্বপ্নে দেখে, মেয়েটিকে নিয়ে সে একদিন বিকেলে বসুন্ধরা যাবে। একদম পেছনের দিকে। যেখানে সুনসান নিরবতা। তারপর দুজন কোন একটা নির্মানাধীন বাড়ীর বুক সমান উচুঁ দেয়ালে চড়ে সূর্যাস্ত দেখবে। কোন কথা নয়, শুধূ চুপচাপ দুজনে পাশাপাশি বসে পশ্চিমে সূর্যের হেলে পড়া দেখবে। কিন্তু মেয়েটা তার ফোন ধরে না, এসএমএসের উত্তর দেয় না, ফেসবুক ম্যাসেজের রিপ্লাই দেয় না, মেইলের রিপ্লাইও দেয় না। ছেলেটা তবু নিয়ম করে প্রতিদিন তার ইমেইল, ফোন আর ফেসবুকের ইনবক্স চেক করে।

৭. কোন এক আনন্দঘন মূহুর্তে ছেলেটা মেয়েটার কাছে প্রতিজ্ঞা করে, তাকে সে কখনো ছেড়ে যাবে না। কিছুদিন পর হঠাৎ করেই ছেলেটার ফেসবুকে মেয়ের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। মেয়েটা টিকারে দেখতে পায় নিত্য নতুন মেয়েদের সে এ্যাড করছে। মেয়েটা প্রচন্ড কষ্টে মুষড়ে পড়ে। আর আতংকে থাকে, ও পারবে তো ওর প্রতিজ্ঞা রাখতে? মেয়েটা এসএমএস করে, ছেলেটা এখন আর আগের মতো সাথে সাথে রিপ্লাই দেয় না।


গল্পগুলোর শেষটা যদি এভাবে হতো…

১. ভীষনরকমের কালো আর মোটা মেয়েকেও কারো কারো কাছে অপূর্ব রূপবতী মেয়ে বলে ভ্রম হয়। কোন অসুন্দর মেয়েই চিরকাল অসুন্দর থাকে না, হঠাৎ কোন একটা র‌্যান্ডম সাজে তাকে মানিয়ে যায়। বিকেলের শেষ সোনাঝরা রোদের আলোয় মেয়েটা ছবি তোলে। ফেসবুকে দেয়। প্রাইভেসি অফ করে পাবলিক করে দেয়। সে সিদ্ধান্ত নেয়, ছবিতে আর কখনো সে প্রাইভেসি দিবে না।

২. সারা রাত হাসপাতালের ডিউটি করে এসে ভোরে আবেগী ছেলেটা ল্যাপটোপ কোলে নিয়ে বসে। কোন প্রেয়সীর সাথে কথা না, তার স্ট্যাটাসের লাইকগুলো হাজার পেরিয়েছে কিনা সেটা দেখা না, আজ সারাদিনে কয়জন ফলোয়ার বাড়লো বা কয়টা মেয়ে ম্যাসেজ দিয়েছে তাও না, সে ঘুম ঘুম চোখে ফেসবুক খোলে জাকিরের ছবি পোষ্ট করতে। জাকির চা বিক্রি করে। জাকিরের একটা ছবি আজকে সে লুকিয়ে তুলেছে মোবাইল দিয়ে। জাকিরের জন্য তার সে ভালবাসা সে কাউকে জানতে দেয় না। জাকিরকেও না।

৩. ছেলেটার সাথে মেয়েটার বেশ মনোমালিন্য চলছে। সম্পর্কটা বুঝি আর টেকানো যাচ্ছে না। কারন সে বুঝতে পেরেছে, ঢাকার সব সুন্দরী মেয়েরা কবিতা পছন্দ করে। তারা তার মানুষটাকে ছেকেঁ ধরেছে। তাই মানুষটার এখন আর সময় নেই তাকে সময় দেবার। মেয়েটা অভ্যাসবশে ছেলেটার প্রোফাইলে যায় কিন্তু ছেলেটার লেখা কবিতাগুলো তাকে আর টানে না আগের মতো। মেয়েটা ঐ লোকটার চ্যাটে দেয়া কিছু লিংকে যায়। কিছু কবিতার লিংক। সেগুলো পড়ে মেয়েটা হতভম্ব হয়ে যায়। এতদিন এই অমূল্য খনি সে হেলায় ফেলে রেখেছে, অন্যরা যে তার প্রেমিকের চাইতেও শতগুন ভালো কবিতা লেখছে, সে এটা এতদিন জানতই না!

৪. লোকটা প্রচন্ড ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরলো। ফিরেই সে বেডরুমে গিয়ে দেখে তার স্ত্রী ঘুমুচ্ছে। সে হাতমুখ ধুয়ে কড়া লিকার দিয়ে এক কাপ চা বানিয়ে বারান্দায় রেখে এলো। এরপর স্ত্রীকে সে আলতো করে ডেকে তুললো। প্রবল বাধা সত্বেও স্ত্রীকে কোলে করে নিয়ে গেলো বারান্দায়। তারপর কাপ থেকে দুটি পিরিচে করে চা ঢেলে একটি সে নিলো আরেকটি স্ত্রীকে দিলো। এরপর জিজ্ঞেস করলো -”এই শুক্রবারে তোমাকে নিয়ে ঘুরতে যাবো বিকেলে। রেডি হয়ে থেকো তুমি। আমরা সারা বিকেল রিকশায় করে ঘুরবো।” তার স্ত্রী অবাক চোখে তার স্বামীর দিকে চেয়ে আছে। এই সন্ধ্যাটার কথা সে গত কয়েকবছরে অনেকবার কল্পনা করেছে।

৫. মেয়েটা অবাক হয়ে দেখে তার ইনবক্সে একটা ছেলে ম্যাসেজ করেছে। “তুমি অনেক অনেক ভালো একটা মেয়ে। আমি সব সময়ই চাইতাম একটা অসম্ভব সুন্দর একটা মেয়ের সাথে বন্ধুত্ব হোক।
তুমি বল্লে না, তোমার একটা ছেলে বন্ধু নেই। আমি তোমার ছেলে বন্ধু হই? তোমাকে কখনো প্রপোজ করবো না, প্রমিজ।” মেয়েটা ছেলেটার প্রোফাইলে যায়। গিয়ে সে প্রচন্ড অবাক হয়। কারন এই ছেলেটাকেই সে মনে মনে কত শত বার তার ছেলে বন্ধু হবার স্বপ্নে দেখেছে। প্রেমিক না, শুধুই ছেলে বন্ধু।

৬. একদিন ভোরে ছেলেটার মোবাইলে কল। – “কাল বিকেল ৫ টায় ক্লাস শেষ করে ইউনোভার্সিটির পেছনের গেটে দাড়িয়েঁ থাকবো। সেখান থেকে আমরা বসুন্ধরার একেবারে পেছনে যাবে। আমরা একসাথে সূর্যাস্ত দেখবো। আমি তোমার জন্য ঘড়ি ধরে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করবো। এর ভেতর না আসলে আমি বাসায় চলে যাবো। আর আমি কিন্তু সোয়া ৬টার বেশী ১ সেকেন্ডও থাকতে পারবো না। মনে থাকে যেন।” ছেলেটা কোনমতে বলে, আচ্ছা। মেয়েটা ফোন কেটে দেয়। ছেলেটা পুরোই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। সে ভাবে সে বুঝি ভোর রাতে স্বপ্নে দেখছে। ভোর রাতের স্বপ্ন সত্যি হয়। কিন্তু স্বপ্ন নয়, মেয়েটা সত্যি সত্যিই ছেলেটাকে ফোন দিয়ে এ কথাগুলো বলেছিলো।

৭. এক দুপুরে ছেলেটার হঠাৎ এসএমএস। “আমি জানি ফেসবুকে আমার মেয়ে বন্ধু দেখে তুমি খুব কষ্ট পাও। কিন্তু তোমার কাছে করা আমার প্রতিজ্ঞার কথা ভুলিনি। খুব আনন্দের সময়ে করা প্রতিজ্ঞার কথা আনন্দ শেষ হয়ে গেলেও আমি ভুলতে পারি না। তোমার ভয় নেই, আমি তোমাকে ছেড়ে কখনো যাবো না। কোনদিনও না…” – মেয়েটি পুরোটা পড়তে পারে না। কারন তার চোখ বার বার ঝাপসা হয়ে আসে….

বাস্তব জীবনের গল্পগুলো যদি সত্যিই এমন করে শেষ করা যেতো…..

 

স্বপ্নদুয়ারে রেজিষ্ট্রেশন না করেও আপনার ফেসবুক আইডি দিয়েই মন্তব্য করা যাবে। নীচের টিক চিহ্নটি উঠিয়ে কমেন্ট করলে এই পোষ্ট বা আপনার মন্তব্যটি ফেসবুকের কোথাও প্রকাশিত হবে না।

টি মন্তব্য