পৃথিবীর সবচাইতে অসুন্দর প্রতিযোগীতার নাম “সুন্দরী প্রতিযোগীতা”!

beauty_contest02বেশ কিছু নির্বাচিত নারীকে শারীরিক, মানসিক, আর্থিক, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রকাশ্যে হেয়, অপদস্ত, হাসির পাত্র ও সস্তা বানাবার আয়োজন করা হয় এবং সেই আয়োজনের একটা সুন্দর, গ্রহনযোগ্য ও ব্যবসায়িক নাম হচ্ছে ‘বিউটি কনটেষ্ট’ বা সুন্দরী প্রতিযোগীতা।  আমার ধারনা, সুন্দরী প্রতিযোগীতা হচ্ছে পৃথিবীর সবচাইতে অসুন্দর ও কদাকার প্রতিযোগীতা। কিশোর বয়স থেকেই জেনে এসেছি যে, সুন্দরী প্রতিযোগীতা আদতে একটা দেশের নারীদের জন্য বিরাট লজ্জা ও অবমাননার ব্যাপার। আমি জগতের তাবত সুন্দরী প্রতিযোগীতার ঘোরতর বিরুদ্ধে। তা সেটা লাক্স চ্যানেল আই হোক আর মিস ওয়াল্ড ইভেন্টই হোক।

মেয়েদের এটা বোঝা খুব প্রয়োজন যে, শারিরীক রুপ বা বাহ্যিক সৌন্দর্য্য যেহেতু তেমন কোন প্রকার চেস্টা বা পরিশ্রম ছাড়াই অর্জন করা যায়, সেহেতু সেটা নিয়ে প্রতিযোগীতায় অবর্তীন হওয়ায় গৌরবের কিছু নেই, বরং সেটা নিজেকে অপমান করারই নামান্তর। প্রতিযোগীতা হতে পারে- যেটা কষ্ট করে, সাধনা করে অর্জন করতে হয় সেটার। শরীর স্রষ্টার দান। সেখানে মানুষের হাত নেই। সুতরাং, সেটা নিয়ে প্রতিযোগীতা করে সেরা হয়ে অহংকার করা বাতুলতা মাত্র। অপরদিকে মেধা, মনন, সৃজনশীলতা ও দক্ষতা এসব সরাসরি স্রষ্টার দান নয়, মানুষকে এসব অর্জন করতে হয় প্রচন্ড অধ্যবসায় দিয়ে। 

কাজেই, মেয়েরা যদি গনিত অলিম্পিয়াড বা পেসার হান্টের মতো এ জাতীয় কোন প্রতিযোগীয় যোগ দেন, তবে আমরা অবশ্যই সাধুবাদ জানাবো। কারন সেটা আমাদের মেয়েদের প্রকৃত সন্মান ও গৌরব দান করবে।

সুন্দরী প্রতিযোগীতার গূঢ় তাৎপর্যটা ঠিক কোথায়? সেখানে সেরা হয়ে লাভটাই কি? আমি অনেক মেয়েকে দেখেছি যারা এইসব তথাকথিত সুন্দরী প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহন করার পর থেকেই একাধিক পড়াশোনা করা বলতে গেলে ছেড়ে দিয়েছে। কারন তারা মডেলিংয়ে ক্যারিয়ার গড়ার ধান্ধায় ছিলো।  অথচ দিন শেষে সেরা হয় মাত্র ৩ জন। বাকী অংশগ্রহনকারীদের ভাগ্যে শেষ পর্যন্ত কি জুটে তা তাদের পরিবার ছাড়া আর কেউ জানে না। আর যারাও বা সেরা হয়, তারা গিয়ে ভেড়ে বিজ্ঞাপন আর নাটকে এবং সবশেষে মুভিতে।  বলাবাহুল্য, ততদিনে ঐ মেয়েটার নিজের বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। যারা এসব ব্যাপারে একটু হলেও ধারনা রাখেন, তারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন আমি এ কথার দ্বারা কি বোঝাতে  চাচ্ছি।

সুন্দরী প্রতিযোগীতায় খুবই সীমিত পরিসরে তার চাইতেও সীমিত সময়ের জন্য উপস্থিত সুন্দরীদের বুদ্ধিশক্তি পরীক্ষা করা হয়। তবে ব্যাপারটা স্রেফ  আইওয়াশ বলেই প্রতীয়মান হয়, এবং বেশীরভাগ সময়ই এটা রীতিমতো উপহাস ও ব্যঙ্গ বিদ্রুপের অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে।

 প্রতি বছর এই প্রতিযোগীতার মধ্য দিয়ে নিত্য নতুন মডেল আসার ফলে পুরনোরা খুব দ্রুত হারিযে যায়। এক বছর কুসুম সিকদার তো পরের বছর মীম। এই হলো লাক্স চ্যানেল আইর অন্তর্নিহিত গোমঢ়। [মুসলিম সমাজে মুসলিমদের কাছ থেকে ফেভার পাবার জন্যই কি বিদ্যা সিনহা সাহা তার সনাতন  ধর্মীয়  নামের সাথে মুসলমান নামের মুখোশ এটেঁ মডেলিং জগতে পা দিয়েছিলো কিনা কে জানে? হুমায়ূন আহমেদের জীবনী পড়ে জানতে পেরেছি, এই মীমকে “আমার আছে জল” মুভিতে কাচাঁ অভিনয় করার কারনে তারঁ হাতে কি পরিমান ধমক খেতে হয়েছে।]

Seema Biswas judges Trans-gender beauty contest V-vare Indian Super Queen semi finals at Royal Palms, Goregaon East

সুন্দরী প্রতিযোগীতা মেয়েদের বিক্রীত ও বিকৃত – উভয়ই করে দেয়। নিঃসন্দেহে এই প্রতিযোগীতা করপোরেট আধিপত্য বিস্তারের একটা পাশ্চাত্য এবং অব্যর্থ উপায়। নারীরা এর দ্বারা সাময়িক খ্যাতি ও স্বল্প পরিমান অর্থ ঠিকই পাচ্ছে, কিন্তু লোভী পুরুষের জন্য স্বেচ্ছায় বিকিয়ে দিচ্ছে নিজের মূল্যবান শরীর এবং প্রকৃত সৌন্দর্য তথা ব্যক্তিত্ব। যে জিনিস নারীর অমূল্য সম্পদ, সে জিনিসই তারা বিকিয়ে দিচ্ছে নামমাত্র মূল্যে। আমার ভীষন আফসোস হয় যে, মেয়েরা এসব কখনই বোঝে না, বুঝতে চায় না অথবা বুঝেও না বোঝার ভান করে, কারন খুব সম্ভবত, সহজে শরীর দেখিয়ে জনপ্রিয় হবার যে লোভ, সেটা তারা কিছুতেই সংবরন করতে পারে না। তাই আপনার আশে পাশে সব সময়ই কিছু না কিছু মেয়ে পাবেন, যাদের ধ্যান জ্ঞানই হচ্ছে যে কোন উপায়ে মডেল হওয়া। উঠতি মডেলদের নিয়ে রসালো-মুখরোচক গুজব শুনতে পাওয়া যায় (যেমনঃ মডেল হতে হলে পরিচালকের বিছানায় যেতে হয়) যদিও কিছুদিন আগে একটা টিভি চ্যানেলের তদন্ত প্রতিবেদনে প্রমানিত হয়েছে যে, সে সব গুজবের প্রায় পুরোটাই সত্যি। অবাক করা ব্যাপার হলো, এরপরও আমাদের দেশের তরুনী ও কিশোরী মেয়েদের মডেল হবার ইচ্ছায় কোন ভাটা পড়ে না।

তবে আমি খুবই মজা পাই যে, তসলিমা নাসরিনের মতো সো কলড নারী বাদীদের এসবের বিরুদ্ধে কখনই কিছু বলতে শুনি না। দুনিয়ার হেন কোন নারীবাদী বিষয় নাই যা নিয়ে সে ত্যানা প্যাচাঁয় নাই। অথচ সুন্দরী প্রতিযোগীতার মতো এত বড় ঘৃণ্য একটা ইস্যু নিয়ে তিনি সর্বদাই নিরব থেকেছেন। আমি কখনই ভাবি না যে, তিনি এর পেছনের ব্যাপারটা বোঝেন না বরং এটা ভাবি যে এ ব্যাপারে তিনি সেচ্ছায়ই নিরব থাকেন। অবশ্য একজন হিট সিকার নারী আরেকজন ফেইম সিকিং মেয়েকে সেটা থেকে প্রতিরোধ করতে চাইবে  না এটাই তো স্বাভাবিক।

গনিত অলিম্পিয়াড অথবা গ্রামীন ফোন পেসার হান্টের মতো প্রয়োজনীয়, সৃজনশীল ও উদ্যোমী প্রতিযোগিতা আমাদের দেশে শুধু নয় যে কোন দেশের জন্যই খুবই দরকার। একটা দেশের ভবিৎষত প্রজন্ম কেমন হবে তা এই সব প্রতিযোগীতার ফলাফল দিয়েই আচঁ করা যায়। আমরা চাই সুন্দরী প্রতিযোগীতার মাধ্যমে নারীদের অবমাননা না করে, ও তাদের ভবিৎষত-সাবলীল জীবনটাকে নষ্ট না করে পেসার বা স্পিনার হান্টের মতো উদ্যোমী ও ঋদ্ধ প্রতিযোগতিার আয়োজন বেশী বেশী করা হোক। তাতে করে সারা দেশ থেকে মেধাবী খেলোয়াড় ও শিক্ষাথীদের সহজেই খুজেঁ বের করা যাবে; তারা আমাদের দেশের জন্য অর্থ ও গৌরব উভয়ই বয়ে আনবে।

winning_beauty_contest02

আর করপোরেট বেনিয়াদের দুঃশ্চিন্তারও কারন নাই যে তারা এটা থেকে পর্যাপ্ত পরিমান ব্যবসা করতে পারবে কিনা। কারন যতদূর জানি গ্রামীন ফোন পেসার হান্ট প্রতিযোগীতা থেকে কম পয়সা কামায়নি। সুতরাং, বেনিয়া এবং জনগন উভয় পক্ষই কিন্তু এ ধরনের প্রতিযোগীতা থেকে বিপুল পরিমান লাভবান হতে পারে।

এখন দেখা প্রয়োজন যে, সুন্দরী প্রতিযোগীর পেছনে কি কি নিয়ামক কাজ করে। এর পেছনে যদি শুধু অর্থ আর ফেম কাজ করতো, তাহলে পেসার হান্ট ধরনের প্রতিযোগীতা দিয়েও তা পূরণ করা সম্ভব ছিলো, কিন্তু যদি অর্থ আর ফেমের সাথে সাথে স্পন্সর, পরিচালক ও মিডিয়া-মোঘলদের জৈবিক কামনা বাসনাও যুক্ত হয়, তবে মনে হয় না পেসার হান্ট বা গনিত অলিম্পিয়াড জাতীয় প্রতিযোগীতা সেটার সম্পূরক হতে পারে।

সুন্দরী প্রতিযোগীতার আয়োজকরা নিশ্চয়ই মেয়েদের জোর করে ধরে আনে না, মেয়েরাই বরং সেচ্ছায় তাদের ফাদেঁ পা দেয়। সুতরাং আমাদের মেয়েদেরকেই সবার আগে সচেতন হতে হবে এবং এ ব্যাপারে ব্যাপকহারে সামাজিক সচেতনতা তৈরী করতে হবে। মেয়েরা যদি আসা বন্ধ করে দেয় বা আসতে রাজী না হয়, তবে এ ধরনের অসুস্থ চর্চা এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে। সুতরাং, এ কথাও সত্য যে, মেয়েরা যদি সচেতন না হয় তবে কিছুইতেই এ অসুস্থ ও সর্বনাশী সংস্কৃতি বন্ধ করা সম্ভব হবে না।

https://www.facebook.com/proloyhasan/posts/10152742288902220

স্বপ্নদুয়ারে রেজিষ্ট্রেশন না করেও আপনার ফেসবুক আইডি দিয়েই মন্তব্য করা যাবে। নীচের টিক চিহ্নটি উঠিয়ে কমেন্ট করলে এই পোষ্ট বা আপনার মন্তব্যটি ফেসবুকের কোথাও প্রকাশিত হবে না।

টি মন্তব্য