পুড়ে যাওয়া মনির-হাসান ও একটি সেলিব্রেশন পার্টি!

638130282749856383867.png

১. বার্ণ ইউনিটে মনিরের পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া দেহটা পড়ে আছে। তিনদিন হাসপাতালের বেডে কাতরিয়ে আজ ভোরের আলো ফুটার আগেই মৃত্যুবরণ করে সে। ভোর রাতে হঠাৎ শুরু হয় ছটফটানি, হাত-পা ছোড়াছুড়ি। কিছুক্ষণ পর নিস্তেজ। স্বজনদের আর্তনাদ-চিৎকার। ছুটে এলেন চিকিৎসক। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানালেন, মনির আর নেই। কিছু দিন পরে সবাই ভুলে যাবে তাই মনিরের একটা পরিচয় দিয়ে রাখি। মনির কোন প্রাপ্ত বয়স্ক লোকের নাম নয়, মনির কোন বৃদ্ধ বা রোগে শোকে ভোগা লোকের নামও নয়। মনির ছিলো মাত্র কৈশোরে পা দেয়া একটা উচ্ছর কিশোর!

কিছুদিন পর ঠিক একইভাবে আরেকজন কিশোর পুড়ে কাবাব হয়ে মারা গেলো। তার নাম হাসান। তারও মনিরের মতো বয়স। সেও মাত্র কৈশোরে পা দেয়া!! দুটি কিশোর আগুনে পুড়ে মারা গেলো পুরো দেশের সামনে!

মনির বা হাসানের শরীর কালো হয়েও তার শরীরের কিছু অংশের চামড়া পুড়ে ভেতরের লাল মাংস বের হয়ে গিয়েছিলো। নিথর কালো লাশটায় সেই লাল রংটা গাঢ় হয়ে ফুটে আছে। সেখান থেকে হালকা পুজঁ বেরুচ্ছে। সেই পুজেঁর উপরে মাছি ভন ভন করছে। হাসপাতালে আগে এত মাছি ছিলো না, কিছুদিন আগে আগুনে পোড়া জীবিত দেহগুলো আসার পর থেকেই মাছিদের যেন ভোজ উৎসব লেগে যায়! ওদের দেহটা প্রাণহীন হলে কি হবে? মাছিগুলোর জন্য এখনো সেখানে রয়েছে টাটকা রক্ত, পুতিঁ গন্ধময় পুজঁ আর রসালো লালা। আগুনে পোড়া একটা দেহকে তারা আরামসে খাচ্ছে!

২. ঠিকই একই সময় তখন আরেকটি ভোজ উৎসব চলছে। দেশের একটা প্রধান রাজনৈতিক দলের চেয়ারপারসনের সেলিব্রেশন পার্টি। বড় বড় নেতাদের যদিও কোন উপলক্ষ থাকে পার্টি দেয়ার তবু এই পার্টি সেলিব্রেশনের অনেকগুলো উপলক্ষ্য আছে। তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে, সেই সেলিব্রেশন। মানুষজন ভয়ে রাস্তা ঘাটে বের হওয়া বন্ধ করে দিয়েছে সেই সেলিব্রেশন। তাদের ভাড়াটে কর্মীরা বেশ দক্ষ হাতে পেট্রোল বোমা বানিয়ে তার চাইতেও দক্ষতায় শিকারের ‍দিকে ছুড়েঁ দিচ্ছে, সেই সেলিব্রেশন। সর্বোপরী, আগামী বছরের নির্বাচনে তার দল ক্ষমতায় আসছে সেই আনন্দের সেলিব্রেশন।

পার্টিতে নেত্রীর পছন্দের খাবার পরিবেশন করা হয়েছে। আস্ত মারখোরের রোষ্ট। যারা জানেন না তাদের জ্ঞাতার্থে বলছি, মারখোর হচ্ছে রামছাগল গোত্রীয় একটি প্রাণী। দেখতে এদেশের ব্লাক বেঙ্গল জাতের ছাগলের মতই, কিন্তু আকারে তার চাইতেও অনেক বিশাল। দৃষ্টিনন্দন শিং আর লম্বা দাড়িঁ মারখোরের প্রধান বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য। উল্লেখ্য, মারখোর পাকিস্থানের জাতীয় পশু। ম্যাডামের জন্য পাকিস্থান থেকে নৌপথে একটি মারখোর উপহার হিসাবে এসেছে কিছুদিন আগে।

ম্যাডাম মারখোরের সুস্বাদু রোষ্টে কামড় বসাচ্ছেন একটু পর পর। এই বয়সেও ম্যাডামের দাতেঁর শক্তি অতুলীয়। কামড় দেবার পর চোখ বন্ধ করে মারখোরের মাংস চিবুচ্ছেন। তারপাশে বসে আছে বাংলাদেশের একমাত্র বিদেশী রাজনৈতিক দলের একজন নেতা। সেও মারখোরের কাবাব চিবুচ্ছে আয়েশ করে। এই দলটির শাখা পাকিস্থান, ভারত ও বাংলাদেশে কিন্তু আশ্চযের বিষয়, গত অর্ধ দশক রাজনীতি করেও কোনদেশেই এই দলটা একবারের জন্যও ক্ষমতায় যেতে পারেনি। বর্তমানে এই দলের সব নেতাই কারাগারে। এর ভেতরে একজন মৃত্যুর প্রহর গুনছে। কারন তার ফাসিঁর রায় হয়ে গেছে।

ম্যাডামের গুলশানের বাসভবনে মারখোরটাকে এনে জবাই করে চামড়া ছিলানোর পর টানা দুই দিন মেরিনেট করে রাখা হয়েছিলো মহিষের দুধ, ঘি আর বিশ তিরিশ রকমের মশলা দিয়ে। তারপর ঢাকার সবচাইতে দামী সেফকে খবর দিয়ে আনা হয়েছে। সেটাকে শিকের ভেতর ঢুকিয়ে প্রায় সারাদিন ধরে একটু একটু করে পুড়িয়ে কাবাব বানানো হয়েছে। কাবাবের মাংসের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, উপরে পোড়া পোড়া একটা চামড়ার টেক্সার থাকবে। লাল মাংস আর পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া মাংসের মিশ্রন। কিন্তু ভেতরটা থাকবে টকটেক লাল, নরম আর রসালো। মারখোরের আস্ত কাবাবটা সে রকমই হয়েছে।

বড় একটা মেলামাইনেরর প্লেটের উপর রাখা মারখোরের দেহটা মনির বা হাসানের দেহের মতই কালো হয়ে পুড়ে গেছে। শরীর কালো হয়েও তার শরীরের কিছু অংশের চামড়া পুড়ে ভেতরের লাল মাংস বের হয়ে গিয়েছিলো। নিথর কালো শরীরটায় সেই লাল রংটা গাঢ় হয়ে ফুটে আছে। সেখান থেকে হালকা রস বেরুচ্ছে। সেই রসের উপরে ম্যাডাম আর ঐ দাঁড়িওয়ালা নেতার লোভাতুর চোখ জোড়া ভন ভন করছে। হাতে ধরা কাবারের টুকরোটা শেষ হলেই তারা ওখান থেকে আরেকটু অংশ কামড়িয়ে ছিঁড়ে নেবে।

পুড়ে কাবাব হয়ে যাওয়া মাংসগুলো খেতে খুব মজা! এই মজা শুধু মাছিরাই নেয় না, নেতারাও নেয়। বরং মাছিদের চাইতে তারা ভালো নিতে জানে।

গল্পটি লেখার পরে “এটা একটি কাল্পনিক ঘটনা” বলতে পারলে খুব ভালো লাগতো। কিন্তু ঘটনাগুলো কাল্পনিক নয়, এটাই এক বিশাল দীর্ঘশ্বাস!

ছবিঃ প্রতিকী

 

স্বপ্নদুয়ারে রেজিষ্ট্রেশন না করেও আপনার ফেসবুক আইডি দিয়েই মন্তব্য করা যাবে। নীচের টিক চিহ্নটি উঠিয়ে কমেন্ট করলে এই পোষ্ট বা আপনার মন্তব্যটি ফেসবুকের কোথাও প্রকাশিত হবে না।

টি মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *