পাকিস্তানের সংক্ষিপ্ত রাজনৈতিক ব্যবচ্ছেদঃ আদ্যোপান্ত ব্যর্থতার ইতিহাস

pakistan-2

১. জন্মের পর থেকেই পাকিস্থান অদ্যবধি একটা পুরাই ‘ফাকড আপ কান্ট্রি’। কয়েকবছর আগে পাকিস্থান পৃথিবীর ‘মোস্ট ট্রাবল প্রন কান্ট্রি’ [সবচেয়ে সমস্যা কবলিত দেশ] হিসাবে নাম লিখেয়েছিলো। গত ৭ দশক ধরে অভ্যন্তরীন অশুভ রাজনীতি আর অবিবেচক রাজনীতিকদের সীমাহীন নিবুর্দ্ধিতা আর লোভ দেশটাকে একেবারে ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে পৌছেঁ দিয়েছে। দেশ ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ব্রিটিশ ভারতবর্ষ ভাগ হবার থেকেই দেশটি মুটামুটি দৌড়ের উপর আছে। এরপর যারা যতগুলো রাজনৈতিক বিরোধে গিয়েছে, মূর্খামি আর আবলামির কারনে তার একটাতেও তাদের কোন বিজয় হয়নি।

ক. পাকিস্থানের প্রথম দৌড় শুরু হয় কাশ্মিরকে নিয়ে। ধর্ম আর জাতিগত তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত আর পাকিস্থান আলাদা হয়ে যাবার পর গোল বাধেঁ দুই দেশের মাঝখানে অবস্থিত কাশ্মিরের দখলদারিত্ব নিয়ে। ‘ইনট্রুমেন্ট অব এ্যাকসেশন’ চুক্তির আওতায় জম্মু, লাদাখ এবং কাশ্মির দাবী করে ভারত। সেটা অনেকটাই ন্যায় সংগত ছিলো। কারন তৎকালিন কাশ্মিরী নেতা ‘মহারাজা হরি সিং’ চেয়েছিলেন কাশ্মির ভারতের অন্তভুক্ত হোক। কিন্তু পাকিস্থান তাদের দাবীর পক্ষে এক আজব যুক্তি তুলে ধরে। তারা বলে, কাশ্মিরের পাবলিক যেহেতু মুসলমান, সেহেতু মুসলমান রাষ্ট্র হিসাবে কাশ্মির হচ্ছে পাকিস্থানের প্রাপ্য! যেহেতু এই তত্ত্বের ভিত্তিতেই ভারত-পাকিস্থান ভাগ হয়েছে, সেহেতু এটা আবারো প্রয়োগ করা যায়! মামা বাড়ীর আবদার!! পবিত্র ধর্মকে এভাবে বার বার পাকিস্থান তার দলীয় ও রাজনৈতিক স্বার্থে ইচ্ছেমতো ব্যবহার করেছে। হাজার হাজার মানুষ মরেছে এই ভারত-পাকিস্থানের কাশ্মির ইস্যুতে। আজ অবধি এইটার যথাযথ কোন মিমাংসা হই নাই। কোন বিজয় হলো না।

খ. পাকিস্থানের ২য় দফা দৌড় শুরু হয় তৎকালিন পূর্ব পাকিস্থান তথা আমাদের দেশটাকে নিয়ে। ভাগ হবার কয়েকবছর পরই তাদের খাই খাই মনোভাব চাগা দিয়ে ওঠে। তারা একই সাথে কাশ্মির ইস্যু নিয়ে ভারত আর সবগুলো জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূণ ইস্যু নিয়ে পূর্বপাকিস্থানের সাথে রাজনৈতিক বিরোধ চালিয়ে যেতে লাগলো। উর্দুভাষা জোর করে আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চাইলো। শুরু হয় ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলন। পাকিস্থান বাধ্য হয় বাংলা ভাষাকে প্রাদেশিক ভাষা হিসেবে মেনে নিতে। এবারও কোন বিজয় হলো না।

গ. পাকিস্থানকে ৩য়বারও দৌড়ের উপর রাখি আমরা, বাংলাদেশীরা। ভাষা আন্দোলনের ১৯ বছর পর নিবার্চনে হেরে গিয়ে পাকিস্থান যখন দেখল গনতান্ত্রিক পথে তাদের আর কোন পথ নাই এদেশকে শাসন করার তখন কাপুরুষের মতো রাতের অন্ধকারে রাস্তায় রাস্তায় কুকুরের মতো মিলিটারি লেলিয়ে দেয়া হলো। শুরু হলো আমাদের মুক্তযুদ্ধ। ৯ মাস পর পাকিস্থানী মিলিটারি ফোর্স আত্নসমর্পন করে আবার কুকুরের মতই লেজ গুটিয়ে পালালো। এবার বিজয় তো হলই না উল্টা সারা বিশ্বের সামনে চুনকালি পড়ে গেলো তাদের মুখে। ৭১ এর যুদ্ধে হারা হচ্ছে পাকিদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিপর্যয়। পাকিস্থান তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে এত বড় দৌড়ানী আর কখনো খায়নি। তবে তাদের যে অবস্থা, এরকম বা এরচে বড় দৌড়ানী তাদের কপালে আরো আছে। প্রক্রিয়া অলরেডি শুরু হয়ে গেছে। এখন গ্যালারিতে বসে বেলুচিন্তানের দিকে তাকিয়ে আমরা শুধু মজা দেখবো।

ঘ. এরপর ৪র্থ বার দৌড়ের মুখে পড়ে আশির দশকে সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের সময়। আমেরিকার সাথে বন্ধুত্বের খাতিরে তারা এই যুদ্ধে সোভিয়েতের উপর ঝাপিঁয়ে পড়ে আফগান আর নিজেদের রক্ষা করে। কিন্তু ৯০ দশকে এসে সে বন্ধুত্বে ভাটা পড়ে পাকিস্থানের নিউক্লিয়ার গবেষনার কারনে। তবে সে যাত্রা অল্পতে বেচেঁ যায় পাকিস্থান কিন্তু তাদের জন্য আরো বড় দৌড়টি অপেক্ষা করছিলো আরো পরে। আর সেটা হচ্ছে, আফগান আর পাকিস্থানের জংগীদের হাতে দেৌড়ানি খাওয়া।

ঙ. ৫ম বারের মতো দৌড়ানী খেলো উভয় সংকটে পড়ে। যে আম্রিকা লাদেনকে ইউজ করেছিলো রাশানদের বিরুদ্ধে, সেই লাদেনই খোদ আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করে বসলো। এদিকে লাদেন ছিলেন সৌদি নাগরিক, আর সৌদির সাথে পাকিস্থানের গলায় গলায় ভাব। তাই আমেরিকার তাড়া খেয়ে লাদেন আস্তানা গাড়লো আফগান-পাকিস্থান সীমান্তে, পাহাড়ের উপত্যকায়। লুকিয়ে থাকার জন্য পারফেক্ট জায়গা। লাদেনের আল কায়েদা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করলো স্থানীয় জংগী সংগঠন তালেবানদের। তাতে এসে যোগ দিলো পাকিস্থানের জংগী সংগঠনগুলোও। আল কায়েদার লাদেন আর আমেরিকার মধ্যে শুরু হলো যুদ্ধ। আর এদিকে পাকিস্থান পড়লো মাঝখানে। কারন লাদেন আর আমেরিকা, উভয় পক্ষই তার বন্ধু। লাদেনকে সাপোর্ট করলে আমেরিকা নাখোশ হয়ে টাকা পয়সা দেয়া বন্ধ করে দেবে, আন্তজার্তিকভাবে তারা একঘরে হয়ে পড়বে আর আমেরিকাকে সাপোর্ট করলে আল কায়েদাসহ আফগান আর পাকি জংগি গ্রুপগুলো পাকিস্থানকে ছিড়ে খুড়ে খাবে। পাকিস্থান কোন দিকে যাবে? পাকিস্থানের তখন শ্যাম রাখি না কুল রাখি অবস্থা! শেষ পর্যন্ত গত এক দশকে আমরা পাকিস্থান-আমেরিকা-জংগীবাহিনী নিয়ে একের পর এক নিত্য নতুন নাটক হতে দেখলাম। অবস্থা এমন হলো যে, উভয় পক্ষের সাথে বন্ধুত্ব বজায় রাখতে চাইলো পাকিস্থান। কিন্তু ফল হলো উল্টো। উভয় পক্ষকেই পাকিস্থান তাদের শত্রু বানিয়ে ফেল্ল। তারা নিয়মিত জংগীদের দ্বারা খুন হতে লাগলো, অপরদিকে আমেরিকা আর ন্যাটোর সাথেও সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটলো। বেশী খেতে চাইলে কি হয়, পাকিস্থান তার জলজ্যান্ত উদারহন।

চ. গত কয়েক বছর ধরে নিজেদের একটা প্রদেশ নিয়েই [বেলূচিন্তান] পাকিস্থান ষষ্ঠ অথবা সপ্তমবারের মতো দৌড়ের উপর আছে। ৭১ এ আমরা যেমস করে আলাদা রাষ্ট্রের অধিকার চেয়েছিলাম, স্বাধীনতবা চেয়েছিলাম; বেলুচরা এখন ঠিক একই জিনিসটাই পাকিস্থানের কাছ থেকে চাচ্ছে। তারা আর পাকিস্থানের সাথে থাকতে রাজী নয়। তারা এখন নিজেদের আলাদা রাষ্ট্র চায়। কারন তারা বুঝে গেছে যে, পাকিস্থানের সাথে আর যাই হোক, এক মানচিত্রে বসবাস করা সম্ভব নয়।

৩. পাকিস্থানের সীমান্ত রয়েছে ৫টি বড় বড় দেশের সাথে। এর একদিকে ভারত, একদিকে ইরান, একদিকে আফগানিস্থান, একদিন চীন, একদিনে ওমান। একসাথে এতগুলা দেশের সাথে দুনিয়ার আর কোন দেশের সীমান্ত আছে কিনা আল্লাহই জানে! তাই পাকিস্তান জিওগ্রাফিক্যালি খুবই দুর্বল। তাদেরকে এক সাথে ৫টি দেশের সাথে সরাসরি কুটনৈতিক সম্পর্কের ব্যাপারে মাথা ঘামাতে হয়। এইটা কি বিশাল একটা পেইন, তারে এইটা হাড়ে হাড়ে বুঝতেছে গত ৭০ বছর ধরে! তার উপর, এই ইউনিক জিওগ্রাফিক্যাল পজিশনের কারনে আমেরিকার শকুন দৃষ্টি পাকিস্তানের উপর গত ৭০ বছর ধরেই পড়ে আছে। পাকিস্থানকে সাপোর্ট করার আর কোন মেজর কারন যে আমেরিকার নাই, এই ব্যাপারে দুনিয়ার সব বিশেষজ্ঞই একমত।

৪. বেলুচিস্থান পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ। আজ তারা পাকিস্থান থেকে আলাদা হয়ে যাবার জন্য বিক্ষোভ করছে। আমি কায়মনোবাক্যে কামনা করি, এমন একদিন খুব বেশী দূরে নয়, যেদিন পাকিস্থানের বাকী তিনটি বড় প্রদেশও একটা আরেকটা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পুরো দেশটা ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যাবে। প্রথমে বেলুচিস্থান, তারপর পাঞ্জাব, তারপর সিন্ধু আর খায়বার-পাখতুন। ইসলামাবাদ হবে দ্য বুক অব এলাই মুভির প্লটের মতো একটা বিধ্বস্থ, পরিত্যাক্ত ও ভূতুড়ে নগরী। ইনশাল্লাহ এই দিন খুব শীঘ্রই আসছে।

স্বপ্নদুয়ারে রেজিষ্ট্রেশন না করেও আপনার ফেসবুক আইডি দিয়েই মন্তব্য করা যাবে। নীচের টিক চিহ্নটি উঠিয়ে কমেন্ট করলে এই পোষ্ট বা আপনার মন্তব্যটি ফেসবুকের কোথাও প্রকাশিত হবে না।

টি মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *