মানুষের ভীড়ে, রাজপথের ভীড়ে কেউ পথ হারায় না…

IMG_0013_0-700x525

ইতিহাস ৭১:

ক. ২৫ শে মার্চ রাতে যখন গনহত্যা শুরু হয়, তখন বংগবন্ধু পাকিস্থানে কারাগারে। সেই রাতেই তাজউদ্দিন আহমেদ একটা কঠিন সিদ্ধান্ত খুব দ্রুত নিয়ে নিলেন – পরিবারের আগে তাকেঁ দেশের দায়িত্ব নিতে হবে। পরদিন ভোরেই স্ত্রীর কাছে একটা চিরকুট লিখে বেরিয়ে গেলেন। -“আমি চলে গেলাম। বলে যেতে পারিনি বলে ক্ষমা করে দিও। তুমি ছেলেমেয়েদের নিয়ে সাড়ে সাতকোটি মানুষের ভীড়ে মিশে যেও। জানি না আবার কবে দেখা হবে। হয়তো মুক্তির পর।“

খ. প্রিয়তম স্বামী,
সালাম নিয়ো এবং ভালোবাসা। জাহান ভাই এর হাতে একটা চিঠি পাঠিয়েছ। চিঠিটা পড়ে বেশ কিছু দিন পর ছিঁড়ে ফেলেছি রাজাকারদের ভয়ে। কারন রাজাকাররা ২৪ ঘন্টা আমাদের বাড়ি পাহারা দিচ্ছে- তোমাকে ধরার জন্য। তোমার দ্বিতীয় সন্তানের বয়স যখন ৬ দিন, তখন তোমার চিঠিটা পাই। তুমি লিখেছিলে আমি বেঁচে থাকি তোমার গর্ব তোমার স্বামী। বাংলাদেশকে ছিনিয়ে আনব। আমি ছুটোছুটি করতে থাকি। প্রচন্ড কষ্ট বোঝাতে পারব না। আমি যেদিন তোমাদের বাড়ি থেকে আমার বাবার বাড়ি আসি, সেদিন ছিল ১৪ই জুলাই। সেদিন তুমি বাড়িতে ছিলে না। বুঝেছিলাম তুমি অস্থির আছ এবং বেশ কয়েক মাস ধরে লুকিয়ে থাকছ এবং অস্থিরতার মধ্যে থাকছ। কিন্তুু আমাকে কিছু বলো না। বুঝতে পারতাম তুমি যুদ্ধে যাওয়ার জন্য তৈরী হচ্ছ। আমার বাবার বাড়িতে আসার কয়দিন পর বাবুর জন্ম হলো, ২১শে জুলাই। আশা করেছিলাম তুমি আসবে। তার বদলে এল চিঠি। আগামীকাল আমি শ্বশুরবাড়ি অর্থাৎ তোমাদের বাড়ি যাব। রাজাকারদের অত্যাচারে। জাহান ভাই এর মাধ্যমে খবর পেতাম। তুমি বেঁচে আছ। ওখানে খবর পাব কীভাবে? তাই লিখছি।

তোমার আড়াই বছরের বড় ছেলে সব সময় পতাকা হাতে নিয়ে জয় বাংলা বলতে থাকে আর রাজাকাররা ধমক দেয়। আব্বা ছেলের মুখ চেপে ধরে, ছেলে ছটফট করতে থাকে আর বলে, নানু, আমাকে ছেড়ে দাও এবং বলে বাংলাদেশের জয় হোক। রাজাকাররা আব্বাকে বলে, তোমার জামাই তোমার বাড়িতে আসে, তোমাকে ধরিয়ে দিব। তোমার বাড়ি পুড়িয়ে দিব। এই সমস্ত কারনে আব্বাকে পাঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আল্লাহর কাছে দোয়া করি, দেশ স্বাধীন করে ফিরে এসো সুস্থ দেহে।

ইতি
তোমার কদবানু আলেয়া [মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রাজ্জাকের স্ত্রী]
সোনাতলা, ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭১

গ. আমার লক্ষী,

তোমাকে ঘুমের ভেতর রেখেই চলে গেলাম। যাবার আগে তোমার মুখের দিকে অনেক্ষন তাকিয়ে ছিলাম। তুমি আমাকে কোনদিন ক্ষমা করতে পারবে কিনা জানি না, তবে যুদ্ধ শেষে দেশ জয় করে ফিরে আসার পর তোমাকে না জানিয়ে যাবার জন্য তোমার কাছে কড়জোরে ক্ষমা ভিক্ষা চাইবো। আর যদি না আসতে পারি, তাহলে লক্ষীটি আমার, ক্ষমা করে দিও।

— ইতি তোমার স্বামী আসাদ।

৯ নভেম্বর ১৯৭১
[শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আসাদ। এই চিঠি পাঠানোর প্রায় একমাস পর, বিজয়ের দুয়েকদিন আগে রংপুরে এক গেরিলা যুদ্ধে তিনি শহীদ হন।]

ইতিহাস ’১৩:

সারা রাত বাসে জার্নি করে উত্তরবঙ্গের এক গ্রাম থেকে শাহবাগে এসেছেন একজোড়া সদ্য বিবাহিতা দম্পতি। ভীড়ের মধ্যে দাড়িয়ে স্লোগান দিচ্ছে গলার রগ ফুলিয়ে কিন্তু চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। হঠাৎ স্বামী খেয়াল করলেন তার পাশে তার স্ত্রী নাই। ভীড়ের মধ্যে কখন হারিয়ে গেলো বুঝতে পারছেন না। ফোন দিতে গিয়ে দেখলেন ব্যালেন্স নাই। পাশে দাড়ানোঁ আমার কাছে জানতে চাইলেন –
– ভাই, আশেপাশে ফ্লেক্সির দোকান আছে?
– ঠিক আশে পাশে না, একটু দূরে আছে। এই ভীড় ঠেলে সেখানে যাওয়া সহজ হবে না।
– ভাই, একটা আর্জেন্ট ফোন করবো। আপনার মোবাইলটা দেন না।
– আপনি নাম্বার বলেন। আমি লাইন লাগায়া দিই।
লোকটা নাম্বার বল্ল। রিং হলো অনেকক্ষন। কেউ ধরে না। ইতিমধ্যে সে জানালো ঘটনা কি হয়েছে। আমি আবার ফোন দিলাম, একই অবস্থা। মনে হয় মাইকের গগনবিদারী আওয়াজে তার স্ত্রী রিংটোন বা ভ্রায়াব্রেশন কিছুই টের পাচ্ছে না। আমি বল্লাম,
– আপনি এখনি মিডিয়া সেন্টারে যান। সেখানে ঘটনা জানান। তারা দরকার হলে মাইকে এনাউন্স করবে।
– মিডিয়া সেন্টার কোনদিকে?
আমি হাত তুলে দেখিয়ে দিলাম। একটু পর বল্লাম,
– আপনার বউয়েরও তো কল দেবার কথা আপনাকে, দিচ্ছে না কেন?
– ভাই আর বইলেন না আমি এই সিমটা কালকে রাত্রেই নিছি, ওর মোবাইলে সেভ করতে ভুইলা গেছি। এই কারনে ও ফোন দিতে পারতেছে না।
– ভাল ঝামেলায় পড়ছেন। আপনি এখনি মিডিয়া সেন্টারে যান আর উনাকে একটা ম্যাসেজ পাঠায়া রাখেন।
– হ ভাল বুদ্ধি দিসেন। একটা ম্যাসেজ করি।

লোকটা আমার হাত থেকে ফোন নিয়ে ম্যাসেজ টাইপ করতেছে আর আমি তীক্ষ্ন চোখে তাকে অবজার্ভ করতেছি। টাউট বাটপার নাতো আবার? ফোন নিয়া ভাগবো নাতো? কিন্তু এই ভীড়ের ভেতর লুকাইতে পারে কিন্ত দেৌড়াইয়া ভাগা সম্ভব না। অথবা আমাকে ফাসাঁইতে পারে, তার বউ না দেখা গেলে শিবির বা র‍্যাবকে ম্যাসেজ পাঠাইতেছে, তেমন কিছু সন্দেহ হলে এই লোককে ধরে জাগামতো নিয়ে সাইজ করার প্ল্যান করছিলাম, ততক্ষনে তার ম্যাসেজ লেখা শেষ। একটা ধন্যবাদ দিয়ে বল্ল দেখি সে কল ব্যাক করে কিনা। তার স্ত্রী প্রায় সাথে সাথেই কল ব্যাক করলো। সে তার স্ত্রীকে আনতে চলে গেলেন। আমি সেন্ট আইটেম থেকে ম্যাসেজটা পড়লাম নিরাপত্তার খাতিরে। দেখলাম সে লিখেছে – “বউ, পথ হারায়া গেলে ভয় পাইতে হয় না। মানুষের ভীড়ে মিশা যাও। মানুষের ভীড়ে, রাজপথের ভীড়ে কেউ পথ হারায় না।“

আমার সন্দেহ তখনো যায়নি। আমি লোকটার পিছু নিলাম। মিনিট পাচেঁক খুজাখুজির পর সে তার স্ত্রীকে খুজেঁ পেলো আমিও হাফ ছেড়ে বাচঁলাম! যাক ঘটনা তাইলে সত্য, এইটা টাউট না। আমি আবার আগের জাগায় ফিরে গিয়ে স্লোগান দিতে দিতে লোকটার ম্যাসেজটার কথা ভাবতে লাগলাম। বিপদের সময় এইরকম কথা লিখতে পারে কয়জন মানুষ? ‘একাত্তরের চিঠি’ বইতে পড়েছিলাম এমন কিছু চিঠি।

আমি সামনে তাকালাম, যেদিকে চোখ যায় শুধু মানুষ! কত লোক এখানে, কত ভীড়। কিন্তু এখন পর্যন্ত কেউ হারায়নি এখানে। হারালেও সেটা ক্ষনিকের। কারন রাজপথের ভীড়ে যে কেউ পথ হারায় না…!!

ছবির কপিরাইট: প্রলয় হাসান 

স্বপ্নদুয়ারে রেজিষ্ট্রেশন না করেও আপনার ফেসবুক আইডি দিয়েই মন্তব্য করা যাবে। নীচের টিক চিহ্নটি উঠিয়ে কমেন্ট করলে এই পোষ্ট বা আপনার মন্তব্যটি ফেসবুকের কোথাও প্রকাশিত হবে না।

টি মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *