নব দম্পতিদের প্রতি কিছু কথা

DSC_3116

আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েরা প্রেমকালীন সময় আর বিবাহ পরবর্তী সময়ের মাঝে একটা বিস্তর ফারাক দেখতে পায়। বেশীরভাগ ক্সেত্রেই দেখা যায়,  প্রেমের সময় ছেলেটা অনেক সাহসী হয়, কমবেশী প্রেমিকার মন পাবার চিন্তা, এছাড়া তেমন কোন টেনশন নাই, ফুচকা, ফাষ্টফুড, নাদুস নুদুস নান্দুস, রিকশায় ঘোরা, জাতীয় দিবসেও একসাথে সাজুগুজু করে ঘুরতে বের হওয়া, এদিক ওদিক টুকটাক ফ্লার্ট করা ইত্যাদিতে বিভোর থাকে।

কিন্তু বিয়ের পর এই দৃশ্য আমুল বদলে যায়। বাচ্চা ছেলে-মেয়ে দুটো যেন রাতারাতিই বড় হয়ে ওঠে। সাইকেল চালিয়ে প্রেমিকার বাসায় গিয়ে ফুল নিয়ে দাড়ানোঁ ছেলেটাকে ভাবতে হয় তার মা-বাবা-ভাই-বোনের যে জগতটা সে এতদিন দেখে এসেছে, সে জগতের সাথে তার সংসারের নতুন মানুষটা মিলিয়ে চলতে পারবে কিনা। না পারলে সেটা সামাল দেবার দায়িত্বও তার নিতে হয়। তার উপর রান্নাবান্না পোষাক আষাক এসব ছোটখাটো বিষয় তো আছেই।  কিছুদিন যাবার পর ছেলেটাকে ভাবতে হয় তার অনাগত সন্তানের কথা। সংসার বড় হলে ইনকামও বাড়াতে হবে। এবং সেই সাথে সন্তানকে পালা-পুষার দায়িত্ব। আমার কলেজ জীবনের সবচে কাছের বন্ধুটাকে দেখেছি, বাচ্চা নেবার আগেই সে একটা পার্ট টাইম জব নিলো। তারপর বাচ্চা নেয়া শুরু করলো। বাচ্চা হবার পর রাত ১০ টায় বাড়ি ফিরে প্রচন্ড ক্লান্ত শরীরেও সে তার শিশু সন্তানকে সময় দিতে বসতো। বন্ধুর দায়িত্ববোধ মুগ্ধ করার মতো।

বলা বাহুল্য, সব ছেলেরা এইরকম দায়িত্ববান নন। সব ছেলেরাই বাচ্চা নেবার আগে বাড়তি উপার্জনের পথ খুজেঁ নেবে বা সারাদিন পর এসে একটু আরাম করতে না বসে বাচ্চাকে সময় দিবে, এমনটা নয়। অথচ সব মেয়েরাই এই রকম দায়িত্ববান স্বামী আশা করেন। আবার এই আশা পূরন না হলে সেটা যে মেনে নিয়ে সংসার চালিয়ে যেতে হবে, নিজেদের ঐ সুখময় প্রেমের দিনগুলোর প্রেমটাকে টিকিয়ে রাখতে হয়, এটাও সব মেয়েরা বোঝে না। আবার সব মেয়েরা যে এটা বোঝে না, সেটা আবার সব ছেলেরা বোঝে না। এইটা ভীষন জটিল একটা ল্যুপ।

অপরদিকে মেয়েটার ক্ষেত্রে সমস্যাগুলো হয় আরো তীব্র। এই ব্যাপারগুলো খুব কাছ থেকে দেখেছিলাম বন্ধুর ছোট মামার বিয়ের পর। তাদের প্রেমের বিয়ে। প্রথমতঃ মামী ধনী বাবার আদুরে মেয়ে। সকাল ৯ টায় ঘুম থেকে ওঠে। ওঠেই দেখে ডাইনিং টেবিলে ব্রেকফাষ্ট রেডি। সেটা খেয়ে ইউনিতে যাওয়া তার রোজকার অভ্যাস। বিয়ের পর স্বভাবতই এই রুটিন বদলে গেলো। নানুর দরজা ধাক্কাধাক্কিতে সকাল ৭ টায় সে ঘুম থেকে ওঠে ঢুলতে ঢুলতে ওয়াশ রুমে যায় তারপর কিচেনে গিয়ে খাবার বানায়। কয়েক মাস পর এই নিয়ে মামার সাথে তুলকালাম। সে আর পারছে না এই রুটিনের ঘানি টানতে। সি ওয়ান্টস আ ব্রেক। এই দৃশ্য এখন মনে হয় প্রত্যেক পরিবারেই দেখতে পাওয়া যাবে।

 বেনী দুলিয়ে কলেজে যাওয়া কিশোরী মেয়েটার নিজের জগত পুরোই বদলে যায় গর্ভবতী হয়ে যাবার পর। কতটুকু বদলে যায়, পুরুষ হিসেবে সেটা হয়তো আমার পক্ষে ব্যাখা করা সম্ভব নয় তবে অনুমান করতে পারি সেই পরিবর্তনটা। একটা ছেলে বিয়ের পর তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যতটা না ম্যাচিউর হয়, একটা মেয়ে শুধুমাত্র গর্ভবতী হবার পর তার চাইতে অনেক বেশী ম্যাচিউর হয়ে পড়ে। আমার ধারনা, একজন নারীর সমগ্র জীবনে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ যে শারীরিক ও মনস্তাস্তিক পরিবর্তনটা আসে, সেটা মা হবার পর। এর সাথে আর কোনকিছুরই ঠিক তুলনা চলে না।

Wedding invitation ~ Happy marriage anniversary!! ~ ^O^

এতক্ষন বল্লাম আসলে ভূমিকা। এবার আসল কথা পাড়ি। ছেলেটা আর মেয়েটার এত এত সব দায়িত্ব, এত এত সব বদলে যাওয়া, যেসব দেখে তারা অভ্যস্ত নয় বা দেখার আশাও করেনি, সেটা যখন তারা দেখতে পায় এবং এর ভেতর দিয়ে যায়, তখন স্বামী-স্ত্রীর ভেতর সাধারনত নীচের তিনটা ব্যাপার ঘটেঃ

১) তারা তাদের সিচুয়েনশনগুলো এডোপ্ট করে ফেলে। মানে তারা তাদের জগতের সাথে সাথে নিজেরাও বদলে যায়। ছাড় দেয়া শেখে, হাসি মুখে মেনে নেয় কষ্ট বা সমস্যাগুলো। মোট কথা, সবকিছু মানিয়ে নেয়। সংসার মসৃনভাবে চলতে থাকে। এই ধরনের দস্পতিরা সবচাইতে বেশী স্মার্ট। তাদের মধ্যেকার প্রেমটাই সবচাইতে শক্তিশালি (কাজেই দুর্লভ), সংসারের ঝামেলাগুলো নয়।

২) তারা সিচুয়েনশনগুলো এডোপ্ট করে না। বা চাইলেও করতে পারে না। এটা মাথায় রাখতে হবে যে, দুনিয়াতে সবাই ’মেনে’ নেবার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়ে বিয়ে করে না। যেটা একটা বিরাট ভুল। এটার মাশুল হতে পারে ভয়াবহ।  আমি শুধু তালাকের কথা বলছি না। তালাক দিয়ে তো স্বামী-স্ত্রী দুজনেই বেচেঁ যায়। সুতরাং, তারা মাশুল দেয় না। মাশুলটা দেয় আসলে, তালাকের আগে তারা যদি কোন সন্তান পৃথিবীতে এনে থাকে তো সেই সন্তানটা।  এবং এই কারনেই, শুধুমাত্র ”সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে” যে সব মায়েরা বা বাবারা তাদের সংসারটাকে চালু রাখে, তাদেরকে আমি স্যালুট জানাই। হতে পারে তাদের দাম্পত্য জীবন আশানুরুপ সুখের না হলো, কিন্তু তাদের সন্তান তো একটা নিশ্চিত ভবিষৎত পেলো!

এই কারনেই আমি প্রতিটা প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়েকে বলি, আপনারা বছরে অন্ততঃ একটা দিন হলেও নিজের বাবা-মার কাছে গিয়ে বলেন, “তোমরা যে তোমাদের বিয়ের পর বিভিন্ন ধরনের ঝামেলার কারনে একে অপরকে ডিভোর্স দাওনি, এই জন্য আমি তোমাদের কাছে আমৃত্যু কৃতজ্ঞ।”

আর যদি সন্তান না থাকে তো, ছাড়াছাড়ি করে ফেলাটাই যদি সবচাইতে  ভালো সিদ্ধান্ত মনে হয় তবে পরবর্তীতে বিয়ে করলে আগের বিয়ের অভিজ্ঞতাগুলো কাজে লাগান। আগেরবার হয়তো ইম্যাচিউর ছিলেন, এবার আপনি অভিজ্ঞ ও ম্যাচিউর। তাই এবার ভুল আগের বারের চাইতে কম হবে।  একটাই মাত্র জীবন আমাদের। সংগীর ভুলগুলো মনে না রেখে; তাকে দোষারোপ না করে আগে বাড়ুন। দেখবেন, জীবনের কত্ত সৌন্দর্য্যই না আপনার দেখা বাকী রয়ে গেছে!

৩) প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে মানিয়ে চলার চেষ্টা করা। এক্ষেত্রে হয় ছেলেটা সংগ্রাম করে, নয়তো মেয়েটা। কখনই উভয়ই যৌথভাবে সংগ্রাম করে না। করলে তারা ১ নম্বর সিনারিওর দম্পতি হয়ে যেতে পারতো। ভালবাসার মধ্যে যার কমতি বেশী,  এবং/অথবা যে বেশী অপরিকপক্ক, জীবনবোধ যার ভোতাঁ, তার কারনেই অপর সংগীটির সংগ্রাম চালিয়ে রাখতে হয় নিজেদের মধ্যকার প্রেম-ভালবাসা-বিয়ে টিকিয়ে রাখতে। মজার ব্যাপার হলো, আমাদের মা-খালাদের যুগে এই ধরনে কাপল বেশী ছিলেন। আমার এক দুর সম্পর্কের দাদা পরপর তিন বিয়ে করেছিলেন। অবাক করা ব্যাপার, প্রতিবারই তিনি স্ত্রীদের মতামত নিয়েই করেছিলেন। এর মানে হলো, দাদীরা তাদের সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য এককভাবে দাদার সাথে সংগ্রাম করে গেছেন। এবং দাদা হয়তো সেটা কোনদিনও বুঝতে পারেন নি। আশার কথা, এই সব প্যাথেটিক চর্চার ইতি ঘটে গেছে  অনেক কাল আগেই।

নব দম্পতিদের বলছি, আপনারা উপরের কোন সিনারিওটা বেছে নিবেন, সেটা আপনাদের ব্যক্তিগত সিন্ধান্ত। তবে এটুকু বলি, সম্পর্কের ক্ষেত্রে আসলে ‘কমপ্রমাইজ’ কথাটাই ভুল। যদি  ‘কমপ্রমাইজ’ এর প্রশ্ন আসে, তবে তাকে আপনি কতটুুক ভালবাসেন সেই প্রশ্নটাও আসা উচিত। কারন আমি যাকে ভালবাসি, তার সবকিছুই আমার ভালো লাগার কথা। ভালবাসা এতটাই গভীর একটা ব্যাপার যে, ভালবাসার মানুষটা টয়লেট থেকে বের হয়ে আসার পর ফ্লাশ করতে ভুলে গেলে আমি হাসতে হাসতে নিজের হাতে ফ্লাশ করে দিবো। কমোডে তার নোংরা লেগে থাকলে নিজের হাতে সেটা পরিস্কার করবো। অসুস্থাবস্থায় বমি করে দিলে ভালবাসার মানুষটার বমি দু হাত পেতে নিতে আমি ১ সেকেন্ডও ভাববো না। এসব শুনতে অস্বস্তি  লাগতে পারে, কিন্তু সত্যিটা হলো, যদি ভালবাসার মানুষের টয়লেটের গন্ধের কারনে আপনার বমি আসে বা তার বমি স্পর্শ করতে আপনার রুচিতে বাধে, অথবা যদি মনে হয় এসব আপনাকে ‘কমপ্রোমাইজ’ করে সহ্য করতে হবে, তবে বুঝে নেবেন, আদতে সে আপনার ‘ভালোবাসার মানুষ’ই নন।

কিছুদিন আগে আমার পছন্দের একজন  মানুষ বলেছিলো, ভালোবাসার মানুষের জন্য ১০ তলা দালান থেকে লাফিয়ে পড়া যায়। সেখানে আপনি যদি এসব না করতে পারেন তো উচুঁ দালান থেকে লাফিয়ে পড়বেন কিভাবে? [তাই বলে সত্যি সত্যি কেউ লাফিয়ে পড়তে যাবেন না। তার এই কথার মানে হলো, যেখানে আমরা ভালবাসার মানুষের ছোট ছোট বিষয়গুলোই মেনে নিতে পারি না, সেখানে বড় বিষয়গলো কি করে মেনে নিবো?]

Now-That-Ive-Kissed-The-Ground-You-Walk-On...-Poster-Trail-of-Hersheys-Kisses-Valentines-Day-Id

আমার খুব প্রিয় একটা ফারসি শেরের বাংলা ভাবান্তর দিয়ে শেষ করছি। মজনুকে যখন লোকে দেখলো সে শহরের এ দেয়াল ও দেয়াল চুমু খাচ্ছে, তাকে কারন জিগেস করাতে সে বল্ল- ’শহরের প্রেমে আমি মোহিত নই, বরং সেখানে যে বাস করে (লায়লা) তার প্রেম আমাকে পাগল করে দিয়েছে।’

মজনু  আসলেই একটা আস্ত পাগল ছিলো।  লায়লার জন্য। সে পাগলামি কতটা তীব্র হতে পারে, সেটা আমাদের মতো ডিজুস জেনারেশন কোনদিন হয়তো উপলদ্ধিও করতে পারবে না, তেমন পাগলামি করা তো অনেক পরের কথা।

এরপর একদিন লোকে দেখলো, মজনু একটা নেড়ি কুকুরের পা ধরে চুমু খাচ্ছে। লোকে কারন জিগেস করাতে সে উত্তর দিলো – ”আরে তোমরা তো জানো না, এই কুকুরটা লায়লার বাসার গলি দিয়ে যাতায়াত করে।”

এসব শুনলে পাগলের প্রলাপ মনে হতে পারে, সবাই হয়তো হেসেই উড়িয়ে দিবে। বাহ্যিক ‍রুপটা ভিন্ন হতে পারে; বহিঃপ্রকাশটা আলাদা হতে পারে কিন্তু কসম করে বলছি, এটাই সত্যিকারের প্রেম। আর যখন এই প্রেমটা থাকবে দুজনের মাঝে, জগতের সবচাইতে কঠিন সমস্যাটাও দুজনকে আলাদা করতে পারবে না। 🙂

https://www.flickr.com/photos/saoud-photo/4225143714/in/photolist-7rmY2q-i8v7hP-dDDqXY-5JKqD8-4bEmyN-iiFxHD-91ieUF-7s4zbJ-aZ69qX-aVQvWa-aTHniK-aVjf6r-aNEZTr-5MbGbw-aRiqF4-aNUPBX-aUPbfv-dxYdHJ-aWjd1H-bA5gSa-5GRgmY-aX8c9H-dUFcH2-dxzaWt-hZf9ij-iNPVPo-b2yUsc-aTb8u6-i8fcNC-5JbsSD-aWbnHx-7soW7U-8XyVdZ-7pTTGF-7t11i8-ay8AbE-4bhP8s-aPfgbp-7Au2bR-iLWj9J-dAvyFy-7jJ2CU-aNQbqn-aGnRvT-91iBUP-p1ZG4x-8YxQqZ-8Y8DGX-4bpksi-aRQmJv

 প্রথম ছবিটার স্বত্বঃ প্রলয় হাসান।  বাকী দুটোর স্বত্ব দেখা যাবে ছবির উপরে ক্লিক করে।

স্বপ্নদুয়ারে রেজিষ্ট্রেশন না করেও আপনার ফেসবুক আইডি দিয়েই মন্তব্য করা যাবে। নীচের টিক চিহ্নটি উঠিয়ে কমেন্ট করলে এই পোষ্ট বা আপনার মন্তব্যটি ফেসবুকের কোথাও প্রকাশিত হবে না।

টি মন্তব্য