নতুন নেতৃত্বঃ বর্তমান প্রেক্ষাপট, বাস্তবতা, খানিকটা বিশ্লেষন আর কিছু প্রশ্ন

1411274110

অনেকে অনেকে রকমভাবে বিস্তর কথা বলে এটার উত্তর দিতে পারেন, কিন্তু আমি এক কথায় বলবো, প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশের রাজনীতির অশুভ লুপটা বন্ধ করার জন্য নতুন নেতৃত্ব প্রয়োজন। এরশাদ আমলের দীর্ঘ একদশকের শাসনের পর মানুষ গনতন্ত্রের জন্য হাঁসফাসঁ করেছিলো, তখন আওয়ামীলিগ-বিএনপি কোন দল জেতে সেটা নিয়ে মাথাব্যথার চাইতে গনমানুষের মূল দাবী ছিলো এরশাদের পতন করা এবং জাতীয় নির্বাচন করে গনতান্ত্রিক পদ্ধতিতে যে কোন একটা দল ক্ষমতায় গিয়ে কোনমতে একটা গনতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থার পত্তন করা। তারপর ৯১ এর নিবার্চনে বিএনপি ক্ষমতায় আসলো আর সেই যে লুপের শুরু হলো, (আওয়ামীলিগ-বিএনপি-আবার আওয়ামীলিগ-আবার বিএনপি) তা এখনো চলছে!আমরা চাই ভাসানী-ফজলুল হক অথবা সোহরাওয়ার্দী বা বঙ্গবন্ধুর মতো অবিসংবাদিত নেতা। যিনি দল বা ব্যাক্তি বা পরিবারের স্বার্থ ভুলে দেশের জন্য কাজ করবেন। জনগনের চাহিদা পূরণ করবেন। যার কর্মপন্থা এবং ভাষন হবে প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত, শিক্ষনীয় এবং অনুকরনীয়।

যেমনঃ বঙ্গবন্ধুর ছিলো অসামান্য সাংগঠনিক গুন, প্রভাবান্বিত করার গুন। তিনি জানতেন মানুষকে দিয়ে কিভাবে অধিকার আদায় করিয়ে নিতে হয়, কিভাবে একটা জাতিকে পরিচালিত করতে হয়। এইগুন একজন নেতার মাঝে থাকা অত্যাবশ্যক। হিটলার যতই খারাপ হোক না কেন তার প্রভাবিত করার এমন ক্ষমতা ছিলো যে তার ভাষন শুনে নাকি জার্মান সেনাদের হাতের মুঠি আপনাতেই শক্ত হয়ে উঠতো! এমন “প্রভাবশালী” নেতা আমাদের দরকার, খালি অর্থ আর ক্ষমতার প্রভাবশালী নয়।

সমস্যা হলো, স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতি ঠিক গনতান্ত্রিক রাজনীতি ছিলো না। ছিলো মূলতঃ স্বৈরতন্ত্র ও পরিবার তন্ত্রের রাজনীতি। জিয়া ও এরশাদের সুদীর্ঘ এক নায়ক শাসনতন্ত্রের পর শুরু হলো গনতন্ত্রের নামে পরিবারতন্ত্র। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর গনমানুষের দাবীতে গড়ে ওঠা আওয়ামীলিগের হাল ধরলেন তারঁ কন্যা শেখ হাসিনা। কেন তৎকালীন আওয়ামীলিগে আর কেউ যোগ্য ছিলো না? অপরদিকে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর সেনাছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা বিএনপির হাল ধরলেন তারঁ স্ত্রী খালেদা জিয়া। কেন তৎকালীন বিএনপিতে আর কেউ যোগ্য ছিলো না? আর একথা বলে দেয়া লাগে না যে, খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বড় ছেলে তারেক জিয়াই হবে বিএনপির চেয়ারপারসন। আবার সেই পরিবারতন্ত্র। আর হাসিনাসন্তান জয়-পুতুল প্রত্যক্ষভাবে না হোক, পরোক্ষভাবে ঠিকই মাতার রাজনীতির সুবিধা ভোগ করছেন। হাসিনার মৃত্যুর পরোও হয়তো দেখা যাবে পরিবাতন্ত্রের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে আওয়ামীলিগ।

পরিবারতন্ত্রে মাধ্যমে উপকৃত হয় পরিবার আর ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশ আর গনতন্ত্র। বঙ্গবন্ধুপুত্র শেখ কামাল-শেখ জামালের অরাজকতা, খালেদাপুত্র তারেক-কোকোর সীমাহীন লুটতরাজ এসব পরিবারতন্ত্রের প্রশয়ের ফল। এর প্রভাব পড়ে দেশের প্রসাশনেও, সরকারের সব রন্ধ্রে দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির দুর্নীতি মহামারীকারে ছড়িয়ে পড়ে।

তাছাড়া, আমাদের সংবিধানেও নাকি রয়েছে, সংসদে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবিত কোন বিলে সরকার দলীয় সংসদদের কোন বিপক্ষ মত দেয়া যাবে না। এই যদি হয় গনতন্ত্রের অবস্থা, তাহলে স্বৈরতন্ত্রের সাথে তার তফাত কতটুকু? আর এখান থেকে নতুন নেতৃত্বই বা কি করে গজিয়ে উঠবে?

সুতরাং, গনতন্ত্রের নামে গত কুড়ি-বাইশ বছর ধরে দেশের রাজনীতিতে যে পরিবারতন্ত্র ও এর ঘূর্ণিতন্ত্র (লুপিং) চলছে, সেটা থেকে বেরিয়ে আসার জন্যই নতুন নেতৃত্বের সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন।

কিন্তু আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে যে, অর্ধশতাধিক রাজনৈতিক দলের এই দেশে একজন সঠিক নেতৃত্ব খুজেঁ পাওয়া চাট্টিখানা কথা নয়।

দেশের বিভিন্ন স্তরের জনগেনর রাজনৈতিক দৃষ্টিভংগি একেকরকম। মোটা দাগে ব্যাপারটা মুটামুটি এরকম, যারা মুক্তিযুদ্ধকে কাছ থেকে দেখেছে বা হৃদয় দিয়ে অনুভব করে, তারা চলে যাবে আওয়ামীলিগের দিকে। যারা জাতীয়তবাদী ভাবধারায় বিশ্বাসী এবং সামরিকগোত্রীয়, তারা চলে যাবে বিএনপির দিকে। পাকিস্থান ভাগ হয়েছে বলে এখনো যারা আফসোস করে, আবার পাকিস্থানের একত্রীকরণ আশা করে এবং ইসলামী শাসন চায়, তারা যাবে জামাতের দিকে। কার্লমার্কস ও লেলিনপড়া সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী উঠতি তরুনরা ঝুকবেঁ সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট (শুনেছি এরাই নাকি দেশে একমাত্র প্রকৃত ছাত্ররাজনীতির চর্চা করছে) টাইপ বাম রাজনীতির দিকে। আর নিম্নবিত্ত, খেটে খাওয়া মানুষেরা চলে যাবে কৃষক-শ্রমিক লীগ টাইপ তৃনমূল কোন রাজনৈতিক সংগঠেনের দিকে। এছাড়া পারিবারিক-রাজনৈতিক ঐহিত্যগত প্রভাব তো রয়েছেই। (যেমন: আমার বাবা-দাদা-বাবার চাচা করেন আওয়ামীলিগ, মেঝো, সেঝো আর ছোট চাচা করেন বিএনপি, এইরকম বহুদলীয় পরিবার বাংলাদেশে প্রচুর রয়েছে),! এর উপর রয়েছে উচ্চ ও উচ্চমধ্যবিত্ত সুবিধাবাদী গোষ্ঠি। সরকার হোক, বিরোধীদল হোক, আন্দোলন হোক বা উৎসব হোক, যাই হোক না কেন এরা নিজেদের লাভের গুড়টুকু ঠিকই কড়ায় গন্ডায় বুঝে নেয়।

এই যে জনগনের পছন্দের এত প্রসস্ত সুযোগ, এটাই নেতৃত্বকে সামনে আসার অন্যতম প্রধান অন্তরায় কারন সবাই-ই চাইবে যার যার দল থেকে নেতা নির্বাচন করতে।

সুতরাং, প্রশ্ন হচ্ছে, নতুন নেতৃত্ব কোনদিক থেকে গড়ে উঠবে? ডানপন্থীদের মাঝ থেকে নাকি বাম?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, নতুন নেতৃত্ব যে ক্ষমতায় যাবার পর ক্ষমতার অপব্যবহার করবে না তার গ্যারান্টি কি? মানুষ কিসের ভিত্তিতে নতুন নেতৃত্ব বিচার করবে? কিসের নিক্তিতে যোগ্য নেতাকে মেপে দেশের দায়িত্ব তুলে দেবে? নতুন নেতৃত্ব নিয়ে সবাই যে এত এত কথা বলে যাচ্ছে, এত আলোচনা হচ্ছে, তারা নিজেরাই বা কতটুকু যোগ্য এবং বিশ্বস্ত? এই যে প্রলয় হাসান বড় বড় কথা বলছে, সেও যে ক্ষমতার স্বাদ পেলে আমূল বদলে যাবে না, লোকের কাছে তার কি গ্যারান্টি আছে?

কতটুকু বিশ্বস্ততার মানদন্ডে একটা জাতি ভাসানী-মুজিবদের মতো নেতা পায়? কতটুকু ভাগ্যবান হলে একটা জাতি মাহাথির-ম্যান্ডেলার মত নেতা পায়? এতটা ভাগ্য কি আমাদের নতুন প্রজন্ম ধারন করে? নাকি আমরা অভাগা জাতি? ইনফ্যাক্ট, একটা জাতি কতটুকু অভাগা হলে স্বাধীনতার ৪০ বছর পরেও নেতৃত্বসংকটে ভোগে?

নতুন নেতৃত্ব যে লিবিয়ার নেতা গাদ্দাফির মত প্রথম কয়েকবছর দেশের উন্নতি করে তারপর ভোল পাল্টে ফেলবে না, সেটা কে হলফ করে বলবে? গাদ্দাফীকে নামাতে লেগেছে ৪ দশকেরো বেশী সময়, আমাদের নেতৃত্ব তেমন হলে তাকে নামাকে কত দশক যুদ্ধ করা লাগবে?

আমাদের এমন একজন নেতা দরকার, যে কোন জেলা নয়, থানা নয়, ওয়ার্ড নয়, নেতৃত্ব দিতে পারবে সমগ্র জাতির। ভাসানী-মুজিব-ফজলুল-সোহরাওয়ার্দী-মাহাথির-ম্যান্ডেলা-ফিদেল কাস্ত্রোর মত।

একজন নেতা একটা দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে উঠে আসেন। যোগ্যতার পরিচয় দেন। একটা জাতির জন্য কোন নেতা সঠিক, এটা বুঝতেই তো এক-দেড় যুগ লেগে যাবার কথা। এতটা সময় পারি দেবার মতো অবস্থা কি আমাদের এখন রয়েছে? নেতৃত্বগুন চর্চা করে নেতা বানাবার মত দীর্ঘ প্রক্রিয়া পারি দেবার মত যথেষ্ঠ সময় কি আছে আমাদের?

তাছাড়া, নতুন নেতৃত্ব ক্ষমতায় গিয়ে যে গনতন্ত্রের চর্চা করবে, সে চর্চার জন্য অনুকূল পরিবেশ কি আমাদের ক্ষমতাসীন নেতারা রেখে যাচ্ছে? পরিবেশ তো দূরের কথা, নতুনদের জন্য তারা কোন দৃষ্টান্তও রেখে যেতে পারেনি, পারছেও না।

সুতরাং, নতুন নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান কাজ হবে, ক্ষমতায় গিয়ে অনুজদের জন্য গনতন্ত্র চর্চার উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা। একজন নেতৃত্ব যদি এটা করতে না পারে তবে তারও এক নায়কে পরিনত হবার সম্ভাবনা থেকে যায়। কারন কেউই চায় না তার নিজের হাতে গড়া সাজানো বাগান অন্য কেউ এসে তছনছ করে দিক। স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেন নাকি একটা সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ” দীর্ঘসময় ধরে অনেক কষ্ট করে ইরাককে আমি স্বয়ংসম্পূর্ণ করে এই পর্যায়ে নিয়ে আসতে পেরেছি। আমি চাই না, আমার পরে অযোগ্য কেউ এসে আমার এই সাজানো বাগান আগাছায় ভরিয়ে দিক! ইরাককে আমি এই পর্যন্ত এনেছি, আমি একে আরো সামনে নিয়ে যাবো। এর শেষ পর্যন্তও আমিই থাকবো।” বোঝা গেলো, এক নায়কদের ক্ষমতা না ছাড়ার একটা কারন হলো অযোগ্য নেতৃত্বের আশংকা। তবে ক্ষমতার লোভ বা রাষ্ট্রের উন্নতি টিকিয়ে রাখার ‘অজুহাত’ যাই হোক না কেন, গনতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে, সরকার ও দেশ পরিচালনায় গনতান্ত্রিক ধারাকে এমনভাবে সমুন্নত রাখা যাতে করে ক্ষমতার পালা বদল হলেও রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকে। দেশের নেতারা কখনই গনমানুষের দাবীকে ঘিরে কোন পরিকল্পনা বা নীতি প্রণয়ন করে না। যেসব করে সেগুলো হয় লোক দেখানো নয়তো নিজেদের স্বার্থে। দীর্ঘদিন ধরে এই দুষ্টচক্র অব্যাহত থাকার ফলে, গনমানুষের ভোটে নির্বাচিত একটা সরকারও পুরোপুরি জনবিছিন্ন হয়ে যেতে পারে। স্থানীয় সাংসদরা (সরকারদলীয় ও বিরোধীদলীয়) ভোগ বিলাসে মত্ত হয়ে উঠেও জনবিছিন্ন হয়ে যায়, এমনটা আমাদের দেশেই হরহামেশা দেখা যায়। আর জনবিছিন্ন হবার ফলে, জনগনের দাবী পূরণ করা তো দূরের কথা, জনগনের দাবীটা যে কি, সেটাই বেশীরভাগ সময় তারা জানতে পারে না।

এই দুষ্টচর্চা এবং দুষ্টচক্রের অবসান ঘটাতে হবে, নতুন নেতৃত্বকে যতটা সম্ভব জনগনঘেষাঁ হতে হবে।

সে অভিযোগ করেছে, তরুন প্রজন্ম তাদের ভোটাধিকারের ব্যাপারে যথেষ্ঠ সচেতন নয়। তারা শুধু মার্কা দেখে ভোট দেয়। অভিযোগ কিয়দংশ সত্য। তবে আমার মনে হয় না তরুণ প্রজন্মের সবাই শুধু মার্কা দেখে ভোট দেয়। যারা দেয় তারা যতটা না নিজের বিবেচনায় দেয় তার চাইতে বেশী দেয় অপরের (পরিবার, আত্নীয়-স্বজন-বন্ধু-বান্ধব) প্রভাবেই। এখনকার তরুণেরা অনেক বেশী স্মার্ট, অনেক বেশী রাজনীতি সচেতন নাগরিক। ভোটাধিকার প্রয়োগ করে তারা সঠিক নেতৃত্ব নির্বাচনের চেষ্টাটুকু কিন্তু ঠিকই করে যায়। আপামর জনগনের মত তারাও জানে যে, এখানে “সবচেয়ে ভাল” নেতৃত্ব খুজেঁ বের করার সুযোগ নেই। যাদের যেটা করতে হয়, সেটা হলো “সবচেয়ে কম খারাপ” নেতৃত্বকে নির্বাচিত করা।

অভিযোগ করা যতটা সহজ, পথ বাতলে দেয়াটা ততটা সহজ নয়। এখনকার তরুন প্রজন্ম উন্নতিকামী। তারা হতাশ নয়, বিহ্ববল নয়, তারা সমালোচনামূলক উপদেশকে পজিটিভদৃস্টিতেই দেখে। তারা তাদের শক্তি সমদ্ধে সচেতন। এই সচেতনতাটাকে আরো বাড়াতে এবং সঠিক পথে পরিচালিত করতে হবে। এরজন্য প্রয়োজন স্বল্পমেয়াদী (যেমন:সরকারীভাবে প্রণোদনা সৃষ্টি), মধ্যমেয়াদী (যেমন:পারিবারিকভাবে উৎসাহ) ও দীর্ঘমেয়াদী (যেমন:শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার) পরিকল্পনা।

আমাদের গৌরবদীপ্ত ছাত্ররাজনীতির ইতিহাস ও বর্তমান প্রেক্ষাপটঃ

বাংলাদেশে সুষম রাজনীতির বয়স কিন্তু বেশী না, বড় জোড় ৫০ এর দশক থেকে ৮০ এর দশক। এরপর, ছাত্র রাজনীতি কলুষিত (মূলতঃ এরাশাদের আমল থেকে)হওয়া শুরু করেছে। সর্বপ্রথম এরশাদই নাকি দলীয় স্বার্থের খাতিরে ছাত্রদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র তুলে দেন। সেই এরশাদের শাসনামলে যেসব শিশুরা জন্মগ্রহণ করেছে, মূলত তারাই তো এখন তরুন প্রজন্মের অগ্রভাগে রয়েছে।

অভিবাবক এবং শিক্ষার্থীর ছাত্ররাজনীতিকে ভয় পাবার কারনটা সহজেই অনুমেয়। পত্রিকার পাতা খুল্লেই দেখা যায় বিদ্যাঙ্গনে দলীয় কোন্দলে বা ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ায় ছাত্রদের লাশ পড়ে আছে! গত বিশ বছরে এর খুব একটা ব্যতয় হয়নি। সুতরাং, এই কারনে জনগনের ছাত্র রাজনীতির প্রতি অনীহা তৈরী হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। তবু যেসব অভিবাবকেরা ছাত্র রাজনীতিকে ভয় পান, তাদেরকে বলবো বাংলাদেশসহ ভারতবর্ষের ইতিহাসের দিকে তাকাতে। সেখানকার ইতিহাসে ছাত্র রাজনীতির অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। বৃটিশ খেদাও আন্দোলন থেকে শুরু করে দেশভাগ, ৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যথ্থান, ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ, ৯০ এর এরশাদ পতন আন্দোলন – কোথায় ছিলো না ছাত্ররা? যখনই কোন আন্দোলনের ডাক এসেছে, ছাত্ররা সবার আগে গিয়ে রাজপথে দাড়িঁয়েছে। আমি তো মনে করি, ছাত্ররা রাজনীতি না করলে এই আন্দোলনগুলোর সফলতা এত সহজে আসতো না, আর বাংলাদেশের ইতিহাসটাও হয়তো অন্যরকমভাবে লেখা হতো।
আমাদের বাপ-দাদাদের আমলে ছাত্ররাজনীতি করা ছিলো গর্বের বিষয়। মাস্টারদা সূর্যসেন, প্রীতিলতা সেন, অপারের চারু মজুমদার, বিপ্লবী ক্ষুদিরাম এরা ছিলো এক একজন কিংবদন্তী আইকন। এখন ছাত্র রাজনীতি এই পরিমান কলুষিত হয়ে গেছে যে আমার জন্মের পর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের কোন ছাত্র নেতাকে আইডল হিসেবে পাইনি।

মতিয়া চৌধুরী, রাশেদ খান মেননের মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা তো বলতে গেলে কিশোর বয়স থেকে ছাত্র রাজনীতি করছেন। রাজনীতির জন্য তারাঁ কম ত্যাগ স্বীকার করেন নাই, কম কষ্ট করেন নাই। কিন্তু তবু কেন তারাঁ এতটা বছরেও দেশকে তেমন কিছু দিতে পারেনি? এ ব্যর্থতা কার?
ছাত্ররাজনীতির নাকি দল নাকি ব্যক্তিবিশেষের?

তরুন বা নতুন প্রজন্মের মন থেকে ছাত্র রাজনীতিভীতি দূর করতে না পারলে পুরনো ও অযোগ্য নেতৃত্বের দুর্বিপাকেই আটকে থাকবে জনগনের ভাগ্য।

অভিবাবক ও শিক্ষার্থীদের বুঝতে হবে যে, রাজনীতি বা ছাত্র রাজনীতি ছাড়া যেমন যোগ্য নেতৃত্ব খুজেঁ বের করা বা তাকে কাজে লাগানো কোনটাই সম্ভব নয় তেমনি ছাত্র রাজনীতি ছাড়া মূলধারার রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্বও সম্ভব না। সুতরাং, যোগ্য ও সঠিক নেতৃত্ব পেতে হলে ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমেই পেতে হবে, রাজনীতির বাইরে থেকে নয়।

এটা সত্যি যে, যারা দলীয় স্বার্থের উপরে ওঠে জনগনের কল্যানে রাজনীতি করতে চায়, তাদের জন্য বর্তমান নেতারা সবরকম পথ বন্ধ করে রেখেছেন-নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই! বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্থান পুরো ভারতবর্ষেই মুটামুটি একই চিত্র।

আমাদের রাজনীতিকরা এমন একটা বলয় তৈরী করে রেখেছেন যে, নতুন কেউ রাজনীতিতে আগ্রহ পাবে না, আর পেলেও তাকে কখনই মূলধারার রাজনীতিতে আসতে দেয়া হবে না। তাকে সরিয়ে ফেলা হবে যে কোন ভাবেই। কারন, নতুন কেউ আসা মানেই একজন নতুন প্রতিদ্বন্ধী। আর একজন নতুন প্রতিদ্বন্ধী মানেই নিজের অস্তিত্বের কফিনে একটা বাড়তি পেরেকের আবির্ভাব। তাই সঙ্গতকারনেই নতুনদেরকে আমাদের রাজনীতিবিদরা মেনে নেয় না। অথচ তরুন প্রজন্মের হাতে ক্ষমতা তুলে দেবার কথা প্রায়শঃই শোনা যায় তাদের মুখ থেকে, “নতুন নেতৃত্ব চাই” – বলে বলে তাদের মুখে ফেনা তুলে ফেলতে দেখা যায়। পুরো ব্যাপারটাই একটা আই ওয়াশ বৈ আর কিছু না। তরুনদের ভোট বৈ আর কিছুতে অংশগ্রহন তাদের কাম্য নয়। এই ব্যাপারটি শুরু থেকেই আমরা বুঝতে পেরেছিলাম কিন্তু ব্যাপারটিকে নির্মোহ ও নিরপেক্ষভাবে ধাপে ধাপে বিশ্লেষন করেছেন ব্লগার আরিফ জেবতিক ভাই। গতবছর তিনি “প্রিয় তরুণ প্রজন্ম, তোমাকে একাই জেগে থাকতে হবে…” শিরোনামে একটা লেখা দিয়েছিলেন বিডিনিউজ২৪ এ।
রাজনীতি অথবা ছাত্র রাজনীতি নিয়ে যাদের মতামত শতকরা শতভাগ অথেনটিক, আমি তাকেঁ তাদের একজন বলে ভাবি। কারন পুরো লেখাটিতেই তিনি যা বর্ণনা করেছেন, সেসব তিনি কোন বইপুস্তক বা পত্র-পত্রিকা পড়ে জানেন নাই, বরং একটা দীর্ঘসময় ধরে সক্রিয়ভাবে ছাত্ররাজনীতির ভিতর দিয়ে গিয়ে সেখানকার নোংরা এবং নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে খুব কাছ দেখেছেন, উপলদ্ধি করেছেন, লেখার পরতে পরতে সে অভিজ্ঞতাই ব্যক্ত করেছেন। নতুনদের প্রতি রাজনীতিবিদদের মনোভাব নিয়ে আমার যেটুকু সংশয় ছিলো, তার লেখা পড়ে সেটুকুও কেটে গেলো। আমি নিশ্চিত হলাম, নতুনদের আমন্ত্রন জানানে হলেও রাজনীতিতে তারা আসলে অবাঞ্ছিত! অতীতে রাজনীতিবিদরা ছাত্রদের নিজেদের স্বার্থে টিস্যু পেপারের মত ব্যবহার করেছেন। যখন প্রয়োজন ছিলো তখন আলতো করে আগলে রেখেছেন, প্রয়োজন শেষে যথারীতি আস্তাকুড়ে ছুড়ে ফেলে দিয়েছেন। তাই তরুন প্রজন্মের প্রতি আরিফ জেবতিক ভাইয়ের পরামর্শ ছিলো, রাজনীতিকে জড়াবার চেয়ে ব্যক্তিগত পর্যায়ে দেশের জন্য কাজ করে যাওয়া। শিরোনামটিও সে বিবেচনাতেই লেখা হয়েছে।
সুতরাং, কোন তরুন যদি ভাবে, রাজনীতিবিদরা ফুলের ডালা নিয়ে তাদের বরণ করে নেবার অপেক্ষায় আছে, তাহলে বলবো সে জেগে জেগে দিবাস্বপ্ন দেখছে।

যারা মুখ বুজে নির্বিচারে সরকারের অরাজকতা সহ্য করে যায় তাদের লেখিকা এখানে কাঠগড়ায় দাড়ঁ করিয়ে দিক নির্দেশনা দেবার চেষ্টা করেছেন। তার মতে, জনগন যেহেতু স্বেচ্ছায় ভোট দিয়ে নেতা নির্বাচন করে, তাহলে তাদের ব্যর্থতার দায়ভারও জনগনের। তাহলে কেন এত অভিযোগ? তার যুক্তি ঠিক আছে। সহ্য করার ব্যাপারটি আসলে হয়তো আমাদের মজ্জাগত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, কিন্তু এর পেছনে কারনগুলো কি আমরা খুজেঁ বের করার চেষ্ট করেছি?

যারা পদদলিত হয়েও মুখ বুজে চুপচাপ সহ্য করে, এর কারন বের করতে গিয়ে মুটামুটি ৭ টি জিনিসের মনোভাব ও অভাবকে খুজেঁ বের করা যায়:-

১. অমুক আগে করুক তারপর আমি করবো। (উদ্যোগের অভাব)

২. জান-মালের নিরাপত্তা নিয়ে উৎকন্ঠা ( সাহসের অভাব)

৩. কোথা থেকে আন্দোলন বা সোচ্চার হওয়া শুরু করবে বুঝতে না পারা (বিচক্ষনতার অভাব)

৪. সেটা বুঝতে পারলেও আন্দোলন কিভাবে কাজ করবে সেটা নিয়ে কনফিউজড থাকা (কর্মপরিকল্পনার অভাব)

৫. যাদের পার্টি করি তাদের বিরুদ্ধে কিভাবে বলি (ব্যাক্তিত্ববোধের অভাব)

৬. এক সময় সব ঠিক হয়ে যাবে/দেখি না কি হয়/যেমনে আছে চলুক [এই জাতীয় লোকের সংখ্যাই সবচে বেশী] (দূরদর্শীতার অভাব)

৭. সুবিধাবাদী মনোভাব। এরা গাছেরটা খায়, নীচেরটাও কুড়ায়। মুখ খুল্লে বা প্রতিবাদ করলে এই কারজ করতে পারবে না বলে এরা বেশীরভাগ সময় চুপচাপই থাকে।

লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এই ৭ টি গুনই একজন নেতা হবার জন্য সমানভাবে প্রয়োজনীয়। এর একটাও যদি মিসিং হয়, তাহলে যোগ্য নেতৃত্ব আশা করা যায় না।

তিনি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় রাজনৈতিক শিক্ষাপদ্ধতি চালু করার কথা বলেছেন। ভাল প্রস্তাব। কিন্তু এ ব্যাপারে স্পষ্টঃ কোন দিক নির্দেশনা দেননি। তাহলে বাংলাদেশের কিশোর ও তরুনদের কিভাবে রাজনৈতিক চর্চার শিক্ষা দেয়া যায়?

আমার ধারনা, রাজনৈতিক চর্চার শিক্ষা দেবার আগে বর্তমান প্রজন্মকে রাজনীতিকে আগ্রহী করে তুলতে হবে। রাজনীতির প্রতি তাদের যে বিতৃষ্ণা রয়েছে, সেটা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। কারন বিতৃষ্ণা বা ঋনাত্নক মনোভাব নিয়ে কিছু শিখলে সেখান থেকে ভাল ফল আশা করা যায় না।

সুষ্ঠু ইতিহাসকে জানাবার প্রক্রিয়া তরুন প্রজন্মের মাঝে রাজনীতিতে আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারে। খুব বেশী কিছু না, মাত্র তিনটি বিষয়ের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস জানলেই রাজনীতি শিক্ষার প্রিরিকিউজিশেন পূরন করা সম্ভব:

১. বাংলাদেশের ইতিহাস (বিশেষ করে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ)
২. ভারতবর্ষের ইতিহাস (বিশেষ করে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগ ও পাকিস্থান গঠন)
৩. আন্তজার্তিক রাজনীতির ইতিহাস (বিশেষ করে ১ম ও ২য় বিশ্বযুদ্ধ এবং বিট্রিশ সাম্রাজ্য)

আমার ধারনা, এই ৩ বিষয়ের ইতিহাসে যার স্পষ্ট ও সঠিক ধারনা থাকবে, রাজনীতির প্রতি সে আপনা আপনিই আগ্রহী হয়ে উঠবে।

অষ্ট্রেলিয়াতে দেখেছি, স্কুল-কলেজের কিশোর কিশোরীদের নিয়ে ডামি কার্যক্রমের আয়োজন করা হয়, যাদের অধিকাংশই আঠারের বেশী। (১৩-১৯ বছরের ছেলেমেয়েদের কিশোর কিশোরী বলে) ।

তাদেরকে দিয়ে ডামি পার্লামেন্টে ডামি সরকার গঠন করে ডামি অধিবেশনের ব্যবস্থা করে হাতে কলমে সরকারের ধারনা দেয়। তবে, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় দেখেছি, রাজনীতির প্রতি অষ্ট্রেলিয়ার তরুণ প্রজন্মের তেমন একটা আগ্রহ নাই। অনেকটা বাংলাদেশের মতই অবস্থা!

সরকার যদি রাজিও থাকে, তবু অভিবাবকদের তোপের মুখে এবং/অথবা শিক্ষার্থীদের অনাগ্রহের কারনে বাংলাদেশে এইরকমটা চালু করা কষ্ট ও সময়সাধ্য হবে বলে মনে হয়।

তবে আমি তরুনদের নিয়ে আশাবাদী। আমি মনে করি, নতুন নেতৃত্ব যদি আসে, তাহলে সেটা তরুনদের ভেতর থেকেই আসবে। পুরনোদের সময় হয়েছে বিদায় নেবার। আমরা চাই, পুরনোদের কন্ঠে ধ্বনিত হোক সুকান্তের ছাড়পত্র!

এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান;
জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ-পিঠে।
চলে যেতে হবে আমাদের।
চলে যাব- তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি-
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
অবশেষে সব কাজ সেরে,
আমার দেহের রক্তে নতুন শিশুকে
করে যাব আশীর্বাদ,

তারপর হব ইতিহাস।।

 

 

স্বপ্নদুয়ারে রেজিষ্ট্রেশন না করেও আপনার ফেসবুক আইডি দিয়েই মন্তব্য করা যাবে। নীচের টিক চিহ্নটি উঠিয়ে কমেন্ট করলে এই পোষ্ট বা আপনার মন্তব্যটি ফেসবুকের কোথাও প্রকাশিত হবে না।

টি মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *