একজন রুমী আর একজন শহীদ জননীর গল্প

1505023_10152104214362220_126622095_n

শাফি ইমাম রূমি তাঁর বড় আদরের বড় ছেলে ছিলেন। এলপভিস প্রিসলী আর জন লেনন শোনা উচ্চ শিক্ষিত ও অভিজাত পরিবারের সন্তান। ভাষা আন্দোলনের এক বছর পর জন্মছিলেন। ৭১ এ সেই রূমি টগবগে তরুন। বুয়েটে পড়তেন আবার একই সাথে ঢাবিতেও ক্লাস করতেন। তাই স্বাধিকারের আন্দোলনকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। ইলিনয় ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে (আমেরিকা) চান্স পেয়েছেন। সেখানে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে যাবেন। ভিসা, টিকেট সব আয়োজন শেষ। এমনকি সূটকেস গোছানও শেষ। আর মা শেষবারের মতো রান্না করছেন ছেলের জন্য। ছেলে তার খেতে খুব ভালবাসে। বিদেশ বিভূইয়েঁ কি খাবে না খাবে তার ঠিক নেই। তাই যাবার বেলায় ছেলেকে নিজের হাতে ইচ্ছেমতো খাওয়াতে চান।

এর ভেতর দেশে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো। ফ্লাইটের দিন ক্ষন ঘনিয়ে আসছে অথচ সারাদিন রূমির কোন খবর নাই। সেই সকালে বের হয়, ফেরে মাঝ রাতে। মা সারাদিন বাসায় বসে বসে টেনশনে মরেন।

একদিন ছোটভাই জামির মাধ্যমে বাবা শুনলেন বড় ছেলে যুদ্ধে যেতে চাচ্ছে। বাবার কাছে থেকে মা শুনলেন। মা আতঁকে উঠলেন।

একদিন দুপুরে, বাবা বাসায় নেই। রূমি এসে মার কাছে হাটুঁ গেড়ে বসেন। মাকে বোঝালেন – ‘মা, আমাকে এখন আমার দেশের খুব প্রয়োজন। আমি এইসময়ে দেশকে ফেলে কি করে চলে যাই বলো মা? মা তুমি যদি অনুমতি না দাও তাহলে আমি যুদ্ধে যাবো না, পড়তেই চলে যাবো। কিন্তু মনে রেখো মা, আমার তাহলে জীবনে কখনো আয়নায় নিজের মুখে দেখতে পারবো না। নিজের কাছে নিজেকে কখনো ক্ষমা করতে পারবো না।’ [মাত্র ১৯ বছরের একটা ছেলে কত অল্প কথায় আর কত চমৎকারভাবেই না মায়ের কাছ থেকে যুদ্ধে যাবার অনুমতি নিয়েছিলো]

এরপর আর মা তারঁ ছেলেকে না করতে পারেননি। ছেলের মাথায় হাত রেখে বল্লেন – “ঠিক আছে। যা তাহলে। তোকে আমি দেশের জন্য কোরবানি করলাম”। হুবহু এই কথাটিই বলেছিলেন।

এরপর ছেলে চলে গেলো। যে স্যুটকেস ছেলের বিদেশে যাবার জন্য তৈরী ছিলো, সেই স্যুটকেস থেকে অল্প কিছু জামা কাপড় নিলেন। যে খাবারগেুলো খেয়ে ছেলের বিদেশে যাবার কথা ছিলো, সেগুলো খেয়ে ছেলে যুদ্ধে যোগ দিলো।

রুমি এরপর মায়ের কাছে আসলেন ১৯৭১ সালের ২৯ আগষ্ট। সাথে কয়েকজন তরুন সহযোদ্ধা। রুমি ততদিনে একজন ঝানু ও দুর্ধর্ষ গেরিলা যোদ্ধা হিসাবে বন্ধু মহলে খুব জনপ্রিয়। এমনকি সেক্টর কমান্ডাররাও রুমির প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এদিকে মা দেখেন তারঁ ছেলে শুকিয়ে কাঠ, চুল উস্কোখুস্কো। তারঁ রাজপুত্রের মতো ছেলের একি হাল! মা আবারো আতঁকে উঠলেন! কিন্তু এতদিন পর ছেলেকে ফিরে পেয়ে আনন্দ আর ধরে না। মা মাঝরাতে রাধঁতে বসলেন। ছেলের প্রিয় খাবারগুলো রান্না করবেন। সেটা দেখে ছোটভাই জামী বড় ভাইকে টিপ্পনী কাটলো – “ওহ, তুমি তো আবার খেতে ভালবাসো, মনেই ছিলো না!” জামীর সাথে রুমির খুনসুটি ছোটবেলা থেকে। উত্তরে রুমি বল্লেন – “আর বলিস না, কতদিন পর যে আজ পেট ভরে খেতে পারবো!”
ডাইনিং টেবিলে বসে মা নিজের হাতে ছেলেকে যত্ন করে খাইয়ে দিলেন। আর ছেলে তারঁ মা আর ছোটভাইকে শোনাতে লাগলো এই কয়টা মাস কি কি সব কান্ড করে এসেছে!!

ভোর রাতের দিকে পাক বাহিনী তাদেঁর বাসায় হানা দিলো। এতক্ষন লিখছিলাম ‘একাত্তরের দিনগুলো’ পড়ার স্মৃতি থেকে। এবার উইকিপিডিয়া থেকে কোট করছি – “ধানমণ্ডি রোডের অপারেশনের পর রুমী তার সহকর্মীদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯৭১ সালের ২৯ আগস্ট তিনি তাঁর নিজের বাড়িতে কাটান, এবং এই রাতেই বেশকিছু গেরিলা যোদ্ধার সাথে পাক বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। পাকিস্তান হানাদার বাহিনী একটি অজ্ঞাত উৎস থেকে তথ্য নিয়ে বেশ কিছুসংখ্যক যোদ্ধাকে গ্রেফতার করেন যার মধ্যে ছিলেন আলতাফ মাহমুদ, বদি, চুন্নু, আজাদ ও জুয়েল। রুমীর সাথে তার বাবা শরীফ ইমাম এবং ভাই জামী ইমামকেও ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদের স্থানে রুমীকে ভাই ও বাবাসহ একঘরে আনলে রুমী সবাইকে তার যুদ্ধে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করতে বলেন। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন যে, পাক বাহিনী তার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সচেতন এবং এর সব দায়-দায়িত্ব তিনি নিজেই নিতে চান। ৩০ আগস্টের পর রুমী ও তার সহযোদ্ধা বদী এবং চুল্লুকে আর দেখা যায়নি।

ইয়াহিয়া খান ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ সালে সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দিলে অনেক আত্মীয় তাঁর জন্য আবেদন করতে বলেন। কিন্তু রুমী যে বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ধরা পড়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ক্ষমা চাইতে রুমীর বাবা শরীফ ইমাম রাজি ছিলেন না।”

আজ সেই রুমির জন্মদিন। বেচেঁ থাকলে আজ যারঁ বয়স হতো ৬২ বছর। বাষট্টি বছরের চির যুবা, চির অমর এই মানুষটাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা। শুভ জন্মদিন রুমি।

স্বপ্নদুয়ারে রেজিষ্ট্রেশন না করেও আপনার ফেসবুক আইডি দিয়েই মন্তব্য করা যাবে। নীচের টিক চিহ্নটি উঠিয়ে কমেন্ট করলে এই পোষ্ট বা আপনার মন্তব্যটি ফেসবুকের কোথাও প্রকাশিত হবে না।

টি মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *