জগতের সকল ইক্ষু মিয়ার জন্য একবুক সমবেদনা

Happily_ever_after_by_jucylucyinspired

আমাদিগের ইক্ষু মিয়ার সুখের সংসার। তাহার অতীব রূপবতী স্ত্রী কদলী বেগম তাহাকে প্রাণ দিয়া ভালবাসেন। প্রাণ-প্রাচুর্যের কোন অভাব তাহাদিগের সংসারে নাই। বিবাহের পূর্বে ইক্ষু মিয়া তাহার বর্তমান স্ত্রীর সহিত চুটাইয়া প্রেম করিয়াছেন।কত বিনিদ্র রাত্রি তাহাদিগের কাটিয়া গিয়াছে আকাশ কুসুম জল্পনায়। তবে তাহার মাখনের মতো গায়ের রংওয়ালা স্ত্রীর একখানা বিরাট দোষ হইলো তাহার অতি স্পর্শকাতর ত্বক। জগতের কোন প্রসাধনীই তাহার ত্বকে রূচে না। লাগাইবামাত্র আক্ষরিক অর্থেই ফোসঁকা পড়িয়া যায় অথবা ঘাঁ হইয়া যায়। তাহা না হইলেও নিদেনপক্ষে চামড়া উঠিবেই উঠিবে, চাই উহা শীতকালে হউক আর গ্রীষ্মকালে।

ইক্ষু মিয়া প্রথম প্রথম পাত্তা প্রদান করিতো না। কিন্তু বিবাহত্তর এই সমস্যা প্রকাটাকার ধারন করিলো। সকালে ঘুম হইতে উঠিবামাত্র সে দেখিতো, তাহার রূপবতী স্ত্রীর রূপ (ওরফে মুখন্ডল) হইতে সর্পের খোলসের ন্যায় কালো বর্ণের ছোট ছোট টুকরো টুকরো চামড়াংশ তাহাদিগের বিছানার চাদরে পড়িয়া রহিয়াছে। ইক্ষু মিয়া প্রায়ই এই দৃশ্য দেখিয়া দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া কহেন – “শ্যালকের কি বউ বিবাহ করিলাম! কপোলের [গালের] যে অবস্থা, অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে উহাতে চুম্বন করিলেও ফোসঁকা পড়িয়া যাইবে”। ভাগ্যিস তাহার স্ত্রী সেই সময় গভীর নিদ্রায় শায়িত হেতু স্বামীর কটুবাক্য শ্রবণ করেন না। তাহা না হইলে স্ত্রী ইক্ষু মিয়ার রবিবার এবং সোমবার বন্ধ করিয়া দিতো। যাহাকে কিনা দুষ্টু ভাষায় ‘সান্ডে-মান্ডে ক্লোজ’ বলা হয়।

ইক্ষু মিয়া নিদারুন খাইতে ভালবাসেন। কিন্তু এইদিকে তাহার ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয় নাই। তাহার রূপবতী ভার্যার অসমান্য রূপ থাকিলেও; গুন ছিলো যৎসামান্যই। তিনি ডিম সিদ্ধ এবং বাজারে পাওয়া প্যাকেটজাত স্যুপ ব্যতীত আর কিছুই রন্ধন করিতে পারেন না। ডিম ভাজিতে গিয়া‌ও ডিম এবং স্বহস্ত পুড়াইয়া ফেলেন। উপয়ান্তর না দেখিয়া ইক্ষু মিয়াকেই দিনে আপিস এবং রাত্রিরে হেসেঁল সামলাইতে হয়। ইক্ষু মিয়া ভাবিয়া দেখিয়াছিলেন, দিনে তিনবেলা স্যুপ নামক অখাদ্য গলাধ:করণ করার চাইতে সারাদিন অফিস করিয়া ক্লান্ত শরীরে রন্ধন করাও ঢের ভালো। কিন্তু সমস্যা আরো গুরুতর আকার ধারন করিলো যখন ইক্ষু মিয়া আবিস্কার করিলেন যে তাহার স্ত্রীর মুখ তাহার ত্বকের মতোই স্পর্শকাতর। স্যুপ এবং নিরামিষ ব্যতীত তাহার আর কিছু মুখে রূচে না। ইক্ষু মিয়া মানিয়া লইবার চেষ্টা করিলেন। কিন্তু হায়! প্রকৃতির কি লীলা!! বিবাহের কিছু দিবস বাদেই তাহার স্ত্রী পুরাপুরি নিরামিষভোজীতে রূপান্তরিত হইলেন। অপরদিকে গোমাংস হইলো ইক্ষু মিয়ার সর্বাধিক প্রিয় খাবার!!!

সুতরাং ঠিক হইলো, সপ্তাহে ৫ দিন ইক্ষুমিয়া তাহার ইচ্ছামতো রন্ধন করিয়া খাইবেন। সেইসাথে তাহার স্ত্রীর জন্য বিশাল এক পাতিল স্যুপ রন্ধন করিয়া রাখিবেন। উহা হইতে এক বাটি-এক বাটি করিয়া তাহার স্ত্রী প্রতিবেলায় ‘ক্ষুদ্রতরঙ্গে’, বিলেতী ভাষায় যাহাকে কিনা বলে ‘মাইক্রোওয়েভ’, উহাতে গরম করিয়া খাইবেন এবং/অথবা পান করিবেন। এবং সপ্তাহের বাকী ২ দিন তাহার স্ত্রী তাহার নিজের ইচ্ছেমতো যে কোন স্যুপ রন্ধন করিবেন। এই দুইদিন ইক্ষু মিয়াকে সেই স্যুপরূপী ছাইপাশ চোখ বুজিয়া গলাধ:করণ করিতে হইবে।

প্রথম সপ্তাহ ঠিকমতো চলিল। ইক্ষু মিয়া ৫ দিন গোমাংস এবং মুরগীভূনা রাধিঁলেন। বাকী দুই দিবস তাহার স্ত্রী ‘ইসপিনাচ স্যুপ’ তথা পুঁইশাকের ঝোল আর মাশরূমের ঘন সূরা রাধিঁলেন। ইক্ষু মিয়া আতংক নিয়া খাইতে শুরু করিয়াছিলেন। প্রথম কয়েক চামচ খাইবার পর তাহার আতংক কাটিয়া গেলো। কারন তিনি বুঝিলেন যে, সূপরূপী ঝোল দেখিতে যতই কদাকার হউক না কেন, ভক্ষন করিতে ততটা মন্দ নয়! এইরকম হইলে তাহার চিন্তার কোন কারন নাই। ইক্ষুমিয়া খুশী মনে আপিস গেলেন।

গোল বাধিঁলো পরের সপ্তাহে। বাজার করিবার দিন স্ত্রী ঘোষনা দিলেন, তাহার ৫ কেজি করলা এবং ৫ কেজি কাকরোল চাই। ইক্ষু মিয়া অবাক হইয়া জানিতে চাহিলেন, ‘এত করলা আর কাকরোল দিয়া করিবেটা কি?’ উত্তরে তাহার রূপবতী স্ত্রী যাহা বলিলেন তাহা শুনিয়া ইক্ষু মিয়ার শিরদাড়া দিয়া একটা শীতল স্রোত বহিয়া গেলো। তাহার স্ত্রী দন্ত বিকশিত করিয়া বলিলেন, ‘করলার স্যুপ পাকাইবো।’

সপ্তাহের ষষ্ঠদিনে আপিস গমনের পূর্বে ইক্ষুমিয়াকে তাহার স্ত্রী কদলী বেগম মনে করাইয়া দিলেন, ‘আজিকে শীঘ্র বাসায় আসিবে। আমি যত্ন সহকারে করলার সূপ প্রস্তুত করিয়াছি। তুমি ফিরিলে এক সাথে খাইবো’। ইক্ষু মিয়া হতভম্ব হইয়া জিগেস করিলেন – ‘সত্যি সত্যি উহা রন্ধন করিয়াছো?’ – কদলী বেগম বিরক্ত হইয়া বলিলেন – ‘তোমার কি ধারনা আমি তোমার সহিত মস্করা করিয়াছি?’ ইহার পর আর কথা চলে না।

ইক্ষু মিয়া কোনমতে আপিস করিয়া বাড়ি ফিরিবার পথে চিন্তা করিলেন, যে কোন উপায়ই হউক, এই বিষ খাওয়া হইতে নিজেকে বাচাঁইতে হইবে। আরও চিন্তা করিলেন যে, জগতে করলা নামক সবজিরূপ বিষটি না থাকিয়ে জগত সংসারের কি এমন ক্ষতিবৃদ্ধি হইতো? যাহা হউক, আমাদিগের ইক্ষু মিয়া বুকে সাহস সঞ্চয় করিয়া নিকটস্থ একটি রেস্তোরায় ঢুকিলেন এবং এক বাটি গো মাংসের কড়া ঝালওয়ালা রেজালা অর্ডার দিলেন। ভাবিলেন, যাহা আছে কপালে!

খানিকবাদে কদলী বেগম ফোন মারিলেন। অধৈর্য্য কন্ঠে শুধাইলেন – ‘তুমি কোথায়? আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করিতেছি। বিলম্ব হইতেছে কেন?’ ইক্ষু মিয়ার শরীর ঘামিতে লাগিলো। বেচারা চোখ বন্ধ করিয়া আরামসে গো মাংসের টুকরা চিবাইতেছিলেন, বেগমের ফোন পাইয়া উহা নিমিষেই গিলিয়া ফেলিলেন। আরেকটু হইলেই গলায় আটকাইয়া একটা কান্ড ঘটিয়া বসিতো। তিনি কোনমতে সামলাইয়া উঠিয়া বলিলেন – ‘একটা জরুরী কর্মে আটকাইয়া গিয়াছি। আজিকে আসিতে আরো কিয়ৎক্ষন বিলম্ব হইতে পারে। আমি দু:খিত প্রেয়সী। তুমি এইবেলা খাইয়া নাও। আমি বাটীতে আসিয়া ঠিক ঠিক খাইয়া লইবো।’ – কদলী বলিলেন – ‘আমি তোমাকে ছাড়িয়া কি রূপে খাইতে পারি বলো জানটুশ?’

ইক্ষু মিয়া বুঝিলেন, এত সহজে তাহার নিস্তার নাই। সে ফোন রাখিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া আবার খাদ্যে মনো:নিবেশ করিলেন।

কদলী বেগম হতাশ হইয়া ফোন রাখিয়া বাটির সূপটুকু করলার হাড়িতেঁ রাখিয়া দিলেন, পাছে গরম স্যুপ ঠান্ডা হইয়া যায় এই আশংকায়। স্যুপ সর্বদা গরম গরম খাইতে হয়। তাহাতেই স্যুপের প্রকৃত স্বাদ এবং পুষ্টিগুন নিহীত।

বেচারী একা থাকিয়া বোর হইলে আশে পাশে হাটিঁতে বাহির হন। আজও হইলেন। ভাবিলেন স্বামীর বিলম্বের কালটুকু বৈকালিক ভ্রমনে ক্ষেপন করিবেন। কিন্তু বাসা হইতে খানিক দূরে গিয়া একটা রেষ্টুরেন্টের ভেতর চোখ পড়িতেই কদলী বেগমের চক্ষু চড়ক গাছ! তিনি প্রায় হুংকার দিয়া রেস্তোরার অভ্যন্তরে প্রবেশ করিলেন।

পরবর্তী ঘটনা কি আর বলিবো? ইহার পর শাস্তি স্বরূপ ইক্ষু মিয়ার কপালে বিরাট দুর্যোগ নামিয়া আসিলো। রন্ধন রুটিন পাল্টানো হইলো। এখন হইতে সপ্তাহে ৭ দিনই নাকি তাহাকে স্যুপ খাইতে হয়। উহার ভেতর সপ্তাহে অন্তত: একদিন থাকে করলা অথবা কাকরোল অথবা উভয়প্রকারের সবজির সম্বিলিত স্যুপ। ইক্ষু মিয়ার মাঝে মাঝে মনে হয়, এই বিষের স্যুপ খাইয়াই একদিন তাহার মৃত্যু ঘটিবে। এই যন্ত্রনা হইতে নিস্কৃতি পাইতে আলাদা করিয়া আর আত্নহত্যা করিতে হইবে না।

স্বপ্নদুয়ারে রেজিষ্ট্রেশন না করেও আপনার ফেসবুক আইডি দিয়েই মন্তব্য করা যাবে। নীচের টিক চিহ্নটি উঠিয়ে কমেন্ট করলে এই পোষ্ট বা আপনার মন্তব্যটি ফেসবুকের কোথাও প্রকাশিত হবে না।

টি মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *