গোলামের কান্না


Golam Azam1 বঙ্গবন্ধু হাসপাতালের প্রিজন সেলের বেডে বসে আছে গোলাম আযম। তারা সারা শরীর ঘামে জবজব করছে, বুক হাপড়ের মতো উঠছে আর নামছে। কারন একটু আগে ভয়াবহ স্বপ্নে দেখেছে সে। অত্যাধিক ভয়াবহ। সে স্বপ্নে দেখেছে, তার কেস কোর্টে উঠেছে। ট্রাইবুনাল তাকে বেকসুর খালাস দিয়েছে। সে আনন্দে সেলের ফ্রিজ থেকে সুরার বোতল বের করতেই দেখলো শাহবাগের উত্তেজিত জনতা হাসপাতালের কলাপসিপল গেট ভেংগে তার সেলের দিকে এগিয়ে আসছে। সে কিছু বুঝে উঠার আগেই সেলের দরজা ভেংগে জনতা ঢুকে গেলো ভেতরে।
এরপরের দৃশ্য অতি ভয়াবহ। প্রথম গোলাম আযমের পরনের জামা কাপড় তারপর তার হাত পা, মাথা, চোখ, চুল, নাড়িভূড়ি, মাংসপিন্ড সব চারিদিকে ছিটকে ছিটকে পড়তে লাগলো। এই পর্যন্ত দেখেই সে চিৎকার করে ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। পানির পিপাসায় তার বুকের ছাতি ফেটে যাচ্ছে কিন্তু দেখলো টেবিলের উপর পানি নাই। সে কোনমতে টয়লেটে গিয়ে টয়লেটের ট্যাপ থেকে পানি খেলো। ঘড়িতে দেখলো রাত একটা বাজে। বাইরে মৃদু আওয়াজ পেয়ে সে জানলার কাছে এসে দাড়াঁলো। তার জানলা দিয়ে শাহবাগ চত্বর স্পষ্ট দেখা যায়। সে দেখলো সেখানে এখনো স্লোগান চলছে – ‘গ তো গোলাম আযম, তুই রাজাকার তুই রাজাকার।’ তার বুক কেঁপে ওঠলো। হার্টবিট বেড়ে গেলো কয়েকগুন। বিড়বিড় করে বল্ল – ‘ইয়া খোদা! পানাহ দাও!!’

Golam Azam

নার্স কল করলো – নার্স এসে দেখে তার ব্লাড প্রেশার আশংকাজনকভাবে বেড়ে গেছে। নার্স বল্ল-
– আপনি আবারো জানালার পাশে গিয়েছেন, তাইনা?
গোলাম বল্ল – জ্বি।
– আপনি জানেন জানালার পাশে দাড়ালে আপনার ব্লাডপ্রেশার আর হার্টবিট বেড়ে যায়, তবুও যান কেন?
সে প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে গোলাম বল্ল- আমি বলেছিলাম আমার রূমের জানালাগুলো সব সাউন্ডপ্রুফ করে দিতে। এখনো করা হয় নাই কেন?
– সরকারী হাসপাতালে বিশেষ কারো জন্য বিশেষ কিছু করা হয় না। করতে চাইলে উপর মহলের অনুমতি লাগে। শব্দ কি খুব বেশী শোনা যাচ্ছে?
– বেশী মানে? শব্দের জন্য আমি রাতে ঘুমাতে পারি না।
– আগে তো বাস-ট্রাক চলতো সামনের রাস্তা দিয়ে। সে সময় তো কখনো বলেননি শব্দের জন্য ঘুমাতে পারেন না! এখন তো এই রাস্তায় বাস-ট্রাক কিছুই চলে না। আপনি কিসের শব্দ পান?
– এখনকার শব্দ আর তখনকার শব্দ কি এক? আপনি বুঝেন না??
– ও।
– আমাকে অন্য সেলে ট্রান্সফার করার ব্যবস্থা করা যায় না?
– অন্য কোন সেল খালি নেই। সবচে বড় কথা, এখানকার সবগুলো প্রিজন সেলের জানালা শাহবাগের দিকে মুখ করা।
(এটা শুনে গোলাম বিড়বিড় করলো, মনে হয় গালি দিলো জানালাগুলোকে।)
– কিছু বল্লেন?
– না কিছু না। আচ্ছা, এই লোকগুলা বাংলাদেশের এত জাগা থাকতে শাহবাগে আসলো কেন?
– শাহবাগ ছাড়া আর কোথায় যাবে বলুন? সামনেই এককালের রেসকোর্স মাঠ যেখানে পাকবাহিনী আত্নসমর্পন করেছিলো, তার আরেকটু এদিকেই শহীদ জননী জাহানারা ইমাম আপনাদের বিরুদ্ধে প্রথম গনআদালত বসিয়েছিলেন, এর ডানপাশে বাংলা একাডেমী যেখানে ভাষা শহীদেরা গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন, পশ্চিমে জাতীয় ও বিদ্রোহী কবির মাজার, একাত্তরের ভাস্কর্য….
– আচ্ছা থামুন, আর বলতে হবে না। বুঝতে পেরেছি। আচ্ছা আমাকে অন্য হাসপাতালে নেবার ব্যবস্থা করা যায় না?
– মনে হয় না। কারন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের বন্দীদেরকে সাধারনত এইখানেই ট্রিটমেন্ট দেয়া হয়। আর কোন সরকারী হাসপাতালে এই ব্যবস্থা নাই।
– ট্রিটমেন্ট!!
– হ্যাঁ, ট্রিটমেন্ট শব্দটা শুনলেই আপনি ভড়কে যান কেন?
– না…এমনি। কালকে সকালের নাস্তা কি?
– মুরগির ডিম…
– আচ্ছা ডিম ছাড়া আর কিছু দিতে পারেন না?
– ডিম আপনি পছন্দ করেন না কেন?
– আগে করতাম। এখন করি না। আপনি এখন যান। যাবার আগে বাতি নিভায় যান। ….না থাক নিভানো লাগবে না। আপনি যান।
– আজকে আপনার পত্রিকা পড়া হয় নাই। দিয়ে যাবো?
– পত্রিকা পড়ে আর কি হবে? পত্রিকায় তো খালি শাহবাগের খবর। আমার জন্য বল্লাম ‘আমার দেশ’ পত্রিকাটা রাখতে। তা না আপনারা দিলেন সমকাল। আপনি যান। যাবার আগে আমাকে একদলা তুলা দেন। কানে দিবো।

কানে তুলো দিয়ে ঘুমানোর পরও গোলাম শব্দ শুনতে লাগলো। আবছা আবছা শব্দ না। স্পষ্ট শব্দ। তুই রাজাকার! তুই রাজাকার!!

একটু পর আবার ঘুমিয়ে গেলো গোলাম আযম। ঘুমানোমাত্র বংগবন্ধুকে স্বপ্ন দেখলো সে। তার পাশে দাঁড়িয়ে হাসছেন। তাঁর বিশাল বপু আরো বিশাল হয়েছে যেন। তাঁর বুকও যেন আগের চেয়ে কয়েকগুন চওড়া হয়ে গেছে। গোলাম জিগেস করলো – হাসছেন কেন শেখ সাহেব?
– গোলাম আমার দেশের মা বইনদের ধর্ষন কইরা তাগো দিয়া পাকি ঔরসে পাকি বাচ্চা পয়দা করানোর নীল নকশা করছিলা মনে আছে?
– হ আছে তো!

– সেদিনের সেই পাকি জারজগুলা বড় হইয়া আজ শিবির করে। ৭১ এ তোমার ছাত্রসংঘ যারা করতো তারা আছিলো ৫২ এর বিরোধীতাকারী জারজ ফসল।
-জ্বি।
– আমার মেয়ে তোমারে এখন সাংগ পাংগসহ ধরছে। সে এই দিনটার জন্যই এতগুলা বছর অপেক্ষা করছিলো।
– (গোলাম নিশ্চুপ, আতংকিত।)
– ৭১ এ আমার নাম নিশালা মুইছা দিতে চাইছো। পারো নাই। মিলিটারি দিয়া পাকিস্তানে ধইরা নিয়া গিয়াও পারো নাই। পারছো?
– (গোলাম নিশ্চুপ, আতংকিত।)

Golam Azam2
– গোলাম, পাকি সেলের ভেতর আমার জন্য সত্যিকারের কবর খোড়া হইছিলো, আমারে মানসিকভাবে দুর্বল করার জ্যন, আর এই বুদ্ধিটা তুমি দিছিলা। মনে আছে?
– জ্বি মনে আছে শেখ সাহেব। (স্বপ্নের ভেতরো গোলাম দরদর করে ঘামছে)
– কোন লাভ হইছে? আমার নাম নিশানা মুছতে পারছো?
– (গোলাম নিশ্চুপ, আতংকিত। শুধু মাথা নাড়লো এদিক ওদিক।)
– বাংলার বুক থিকা আমার নাম কোনদিনও তুমি মুছতে পারো নাই, আর পারবাও না। তুমি যে হাসপাতালে আছো, সেই হাসপাতলটাও আমার নামে। দেখছো?
– (গোলাম নিশ্চুপ, আতংকিত। শুধু মাথা নাড়লো ওপর নীচ।)
– গত ৪২ বছর ধইরা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ তোমারে থুথু দিয়া গেছে। এখনো দিতেছে। আজীবনই দিবো। তুমি মরার পরও দিবো। সেইট বুঝো?
(গোলাম নিশ্চুপ, আতংকিত। শুধু মাথা নাড়লো ওপর নীচ।)
– মানুষ তোমারে এত ঘৃনা করে যে, তোমার এত সুন্দর একটা মুসলমান নাম, অথচ এই নাম গত ৪২ বছরে কোন শিশুর রাখা হয় নাই। এমনকি তোমার দলের লোকেরাও এই নামে তাদের কোন সন্তানের নাম রাখে নাই।
(গোলাম নিশ্চুপ, আতংকিত। শুধু মাথা নাড়লো ওপর নীচ।)
– ৬০/৭০ বছর ধইরা রাজনীতি করলা, জীবনে কোনদিন তোমার দলরে ক্ষমতায় নিতে পারলা না। না পাকিস্থানে না বাংলাদেশে। সারাজীবন আজ এর ঘাড়ে কাল ওর ঘাড়ে চইড়া রাজনীতি কইরা গেসো। তোমার জাগায় যদি একটা কুত্তাও ৬০/৭০ বছর ধইরা রাজনীতি কইরা যাইতো তাইলে মনে হয় সেও ক্ষমতায় যাইতে পারতো।
(গোলাম নিশ্চুপ, আতংকিত। শুধু মাথা নাড়লো ওপর নীচ।)

– ইসলামরে ইচ্ছামতো ব্যবহার করছো আজীবন। এই কারনে উপমহাদেশের বড় বড় ইসলামী দলগুলা এতদিন তোমাদের বর্জন কইরা আসছে কিন্তু আজ বাংলাদেশের প্রায় সব কয়টা ইসলামী দলও তোমাদের বর্জন করছে। শুধু বর্জন করে নাই ঘোষনা দিয়া বর্জন করছে। ঠিক না?
(গোলাম নিশ্চুপ, আতংকিত। শুধু মাথা নাড়লো ওপর নীচ।)
– সারাজীবন কি করলা তাইলে? মানুষের ঘৃনা নিলা। অভিশাপ নিলা। কই এই বুড়া বয়সে নাতি নাতনী নিয়া হাসি ঠাট্টায় দিন কাটাইবা তা না উল্টা প্রতি রাইতে ফাসিঁর দড়ি স্বপ্নে দেইখা চিক্কার দিয়া তোমার ঘুম ভাংগে। এইটা যে দুনিয়াতেই খোদার গজব, সেইটা বুঝো গোলাম?
(গোলাম নিশ্চুপ, আতংকিত। শুধু মাথা নাড়লো ওপর নীচ।)
– তোমার তো মইরাও রেহাই নাই গোলাম। শাহবাগে শুনলাম পুলাপাইন বলতেছে মরার পর তোমার লাশ নাকি বাংলার মাটিতে কবর দিতে দিবে না। এই খবর জানো?
(গোলাম নিশ্চুপ, আতংকিত। শুধু মাথা নাড়লো ওপর নীচ।)
– তোমার তো জানারই কথা। তুমি শাহবাগের এত কাছে থাকো!! একদম জাগা মতো আর টাইম মতো শুরু করছে পুলাপান আন্দোলনটা। হাহাহা!!

– আমার দেশের পুলারা যতবার রাস্তায় নামছে, ততবার তাদের দাবী আদাল কইরাই ঘরে ফিরছে। তুমি তো অনেক ইতিহাস দেখছো, সত্যি কইরা কও তো, বাংলার ইতিহাসে এমন কোন অধ্যায় আছে, যে সময় বাংলার মানুষ রাজপথে নামছে আর দাবী আদায় হয় নাই?
– (গোলাম নিশ্চুপ, আতংকিত। শুধু মাথা নাড়লো এদিক ওদিক।)
– এইবারো হবে। দাবী আদায় এইবারো হবে। ফাসিঁ দেওনের পর তোমার লাশ পাকিস্থানে পাঠায় দিবে। দেখলাম কফিনও রেডি কইরা ফেলছে। নিজের চোখে দেইখা আসলাম গোলাম। সিকিউরিটি সিলও মারা। সব প্রক্রিয়া শেষ এখন শুধু একটা জিনিসই বাকী। কি জানো সেইটা?
– গোলাম এবার বিস্ফরিত চোখে তাকিয়ে থাকে বংগবন্ধুর দিকে।
– তোমার লাশ। হা হা হা হা। গোলাম তোমার ফাসিঁ হওয়া লাশ। পুলাপান এখন শুধু এইটারই অপেক্ষায় আছে এখন। হা হা হা হা।

এ পর্যন্ত দেখেই গোলামের ঘুম ভেংগে যায়। তার শরীর আবারো ঘামে ভিজে গেছে। তার কপাল দিয়ে টপ টপ করে ঘাম পড়ছে। পাঞ্চাবী দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে ঘাম পড়ছে। আতংকে মুখ নীল হয়ে গেছে। গত ২১ দিন সে ঘুমাতে পারে নাই, এই কারনে তার চোখের নীচে কালি পড়ে গেছে। শেখ সাহেবের কথাগুলো তার কানে বারবার বাজতে লাগলো। গোলাম ডুকরে কেদেঁ উঠলো।

শওকত ওসমান লিখেছিলেন ক্রিতদাসের হাসি। আমি লেখলাম গোলামের কান্না। 

Golam Azam3

একটি ঐতিহাসিক পোষ্টার

https://www.facebook.com/proloyhasan/posts/10151487379907220?stream_ref=10

স্বপ্নদুয়ারে রেজিষ্ট্রেশন না করেও আপনার ফেসবুক আইডি দিয়েই মন্তব্য করা যাবে। নীচের টিক চিহ্নটি উঠিয়ে কমেন্ট করলে এই পোষ্ট বা আপনার মন্তব্যটি ফেসবুকের কোথাও প্রকাশিত হবে না।

টি মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *