এদেশে আরিয়ান-জাকিয়াদের যে কারনে জন্মাতে হয় না

বেশ কয়েক মাস আগে আমাদের অফিসে আরিফ নামের একটা তরুন ছেলে আসলেন এক পূর্ববর্তী পরিচয়ের সূত্রে। জানালেন, তারা পথশিশুদের নিয়ে কয়েক বছর যাবত কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের হাতেখড়ির জন্য একটা স্কুল বানানো হয়েছে, স্কুলের নাম ”মজার স্কুল” (লিংক কমেন্টে)। তো, র‌্যান্ডম যে যা পারেন টাকা পয়সা দেন – এই রকম না, বরং সে এসেছিলো একটা স্পেসিফিক অনুদান চাইতে।

আমাদের যেহেতু একটা আইটি কোম্পানি রয়েছে, সেহেতু আমাদের ব্যবহৃত পুরনো কোন পিসি বা ল্যাপটপ অনুদান হিসেবে দিতে পারবো কিনা সেটা জানতে এসেছিলেন। তাতে করে পথশিশুদের কম্পিউটার চালানোর হাতে খড়ি দেয়া যাবে। একটা পুরনো সেকেন্ড হ্যান্ড ল্যাপটপেরও ১২-১৫ হাজার টাকা দাম। এত টাকা দিয়ে ল্যাপটপ কেনার সামর্থ্যও তাদের নাই।

যা হোক, তাদের ফেসবুক ছবি, পরিচয়ের সূত্র যাচাই ও আরিফের সাথে দীর্ঘক্ষন কথা বার্তা বলে অফিসের বস রনি ভাই রাজি হলেন অনুদান দিতে। মজার স্কুলের জন্য আমাদের কোম্পানির পক্ষ থেকে দেয়া হলো একটা পুরনো এইচ পি ল্যাপটপ, একটা টেবিল ফ্যান ও কিছু নগদ অর্থ। শুধু তাই নয়, রনি ভাই প্রতি মাসে ’মজার স্কুল’কে কয়েক হাজার টাকা করে অনুদান দেবেন বলেও যেচে প্রতিশ্রুতি দিলেন।

আরিফ চলে যাবার পর পুরো ব্যাপারটিই তিনি নিজ মুখে আমাকে জানালেন। স্কাইপে আমাকে লিংক দিলেন মজার স্কুলের ফেসবুক পেজের। আমি পেজ ঘুরে দেখলাম, ছবি দেখলাম এবং অভিভূত হয়ে গেলাম। নিজের খেয়ে এইভাবে আমাদের দেশের কতিপয় তরুন এত আন্তরিকভাবে বনের মোষ তাড়াচ্ছেন, আপনাতেই তাদের প্রতি শ্রদ্ধাবনতঃ হয়ে গেলাম।

রনি ভাইর কাছে শুনলাম, এই তরুন ছেলে মেয়েগুলো প্রথমে নিজের পকেটের টাকা দিয়েই সব খরচ চালাচ্ছিলো। যখন আর পেরে উঠছিলো না, যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলো, তখনই তারা অনুদান চাইতে শুরু করলেন। এমনকি এখনও মজার স্কুলের গ্যাস, বিদুৎ ও পানির বিল তারা নিজের পকেট থেকেই পরিশোধ করে যাচ্ছেন।

রনি ভাই আমাকে জানিয়েছিলেন যে, বেশ কিছুদিন ধরেই তাঁর ইচ্ছে ছিলো, এইরকম কোন জনকল্যানমুলক খাতে যতটুকু সম্ভব অনুদান দেয়া। তাই এমন একটা জাগায় অনুদান দিয়ে তিনি তৃপ্ত। এছাড়াও, ঢাকার বাইরের একটা এতিমখানাতেও কয়েক বছর যাবত তিনি নিয়মিত অনুদান দিয়ে আসছেন।

গতকাল অফিসে আসার পর পরই রনি ভাই আরিফ ও তার বন্ধুদের গ্রেফতারের খবর জানালেন! তাদেরকে নাকি শিশু পাচারকারী হিসেবে ধরা হয়েছে। ১০ জন শিশু উদ্ধার(!) করা হয়েছে।

গতকাল সকালে ফেসবুক খুলে দেখলাম, আমি আগে থেকে তাদের না চিনলেও আমার অনেক ঘনিষ্ঠ ফেসবুক বন্ধুই মজার স্কুলের কথা, আরিফের কথা এবং তাদের কর্মকান্ডের কথা খুব ভালো ভাবেই অবগত আছেন। মজার স্কুলের ব্যাপক সামাজিক গ্রহনযোগ্যতা রয়েছে, এমনকি আমার অনেক বন্ধু কোন না কোন সময় এর ভলান্টিয়ার হিসেবেও কাজ করেছেন। তাই সঙ্গত কারনেই, তাদেরকে গ্রেফতারে আমার ফেসবুক বন্ধুরা অত্যন্ত মনক্ষুন্ন হয়েছেন। তারা ইভেন্ট পেজ খুলেছেন। অফিসিয়ালি কিভাবে এটা নিয়ে মুভ করা যায়, সে বিষয়ে কর্ম পরিকল্পনাও ঠিক করে ফেলা হয়েছে।

আজ বিকেল ৪ টায় সবাই মিলে মতিঝিল থানায় গিয়ে ডিসি সাহেবের কাছে যথাযথ কাজগপত্র পেশ করা হবে। কারন রামপুরা থানা যে ডিসি সাহেবের অধীনে রয়েছে, তিনি মতিঝিল থানায় বসেন। ইভেন্ট পেজের লিংকঃ https://goo.gl/uVbdKJ

এমন না যে, মজার স্কুল একটি বেওয়ারিশ স্কুল। এটা রীতিমতো সরকারীভাবে নিবন্ধিত একটি স্কুল । রেজিঃ নম্বরঃ এস-১২০৫৫। এমনকি তাদের এনজিও ‘অদম্য বাংলাদেশেরও’ বৈধ ডকুমেন্টস আছে। তাহলে পুলিশ ঠিক কোন প্রমানের ভিত্তিতে তাদেরকে শিশু পাচারকারী হিসেবে গ্রেফতার করলো?

প্রথম আলোর সংবাদ থেকে কোট করছি, “তবে উদ্ধার হওয়া নয়জন পথশিশু থানায় বিকেলে প্রথম আলোকে বলেছে, তারা আগে সদরঘাট ও কমলাপুর রেলস্টেশনের টোকাই ছিল। এনজিওটিতে ভালো থাকা-খাওয়ার পাশাপাশি তারা নিজেদের নাম লিখতে পারছে, পড়তে পারছে। এদের মধ্যে কেউ জানায়, মা বা বাবাকে না জানিয়ে এসেছে। আবার কেউ জানায়, রাগ করে বাসা থেকে বেরিয়ে আসার পর স্বজনদের সঙ্গে আর যোগাযোগ হয়নি।”

  • এই ঘটনার পরে তো পুলিশের আর কোন সন্দেহের অবকাশ থাকার কথা না। এ ছাড়া ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ফেসবুকে পেজেও গনমানুষ পরিস্কারভাবে জানিয়েছে যে আরিফ ও জাকিয়াদের গ্রেফতার করাটা পুলিশের নিছকই ভুল হয়েছে। (লিংক কমেন্টে)

দুঃখের বিষয় হলো, গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কথা বলতে দেয়নি পুলিশ।

”এ ব্যাপারে পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার মো. আনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা এনজিও চালু করলেও বিষয়টি রামপুরা থানা-পুলিশকে লিখিতভাবে জানাননি। কিংবা সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেননি। বাড়ির সামনে এনজিওর সাইনবোর্ড নেই।”

  • সাইবোর্ডের ব্যাপারটি না হয় বুঝলাম, কিন্তু এনজিও চালু করলে কি স্থানীয় থানায় জিডি করতে হয় নাকি? কেউ কি জানেন এমন কোন নিয়মের কথা?

ঘটনার সূত্রপাত, পুলিশি হেফাজতে নেয়া ঐ ১০ শিশুর একজন, মোবারক হোসেন (১৪) এর মাধ্যমে। তার চাচা মনির হোসেন রামপুরা থানায় মামলা করেন, সে মামলার প্রেক্ষিতেই গ্রেফতার করা হয়।

”মনির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের বাসা খিলগাঁওয়ের মেরাদিয়ায়। মোবারকের বাবা কামাল হোসেন মারা গেছেন। ছয় মাস ধরে মোবারক নিখোঁজ। নিখোঁজ হওয়ার পর তিনি খিলগাঁও থানায় একটি জিডি করেন। গতকাল সকালে যে বাসা থেকে মোবারক উদ্ধার হয়েছে সেই বাসার গৃহকর্মী মোবারককে আটকে রাখা হয়েছে বলে তাঁদের খবর দেন। ”

অথচ এ ব্যাপারে উপস্থিত প্রতিষ্ঠানের স্বেচ্ছাসেবীদেরকে জিজ্ঞাসা করলে তারা বলেন, ওই ছেলেটি কখনোই তার সঠিক কোনো ঠিকানা বলতে পারেনি। সে কখনোই কোথাও যেতেও চায়নি। হঠাৎ করে পুলিশের অভিযান এবং ওই বাচ্চার (মোবারক হোসেন) বক্তব্যে আমরাও বিস্মিত।

আমার ধারনা, ঘটনার মূল কালপ্রিট হলো, আরিফরা বনশ্রীতে যে বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন, সে বাসার গৃহকর্মী। সে কোনভাবে মোবারক হোসেনের কাছ থেকে তার চাচার ফোন নম্বর জোগাড় করেছে এবং নিজের ভালোমানুষি জাহির করতে গিয়ে সে নম্বরে ফোন দিয়ে খবর দিয়েছে। ব্যাপারটা যে আরিফ বা জাকিয়াকে সবার আগে জানানোর দরকার ছিলো, সেটা হয়তো তার মাথাতেই আসেনি। জানালে আরিফরা নিজেরাই স্বউদ্যোগে মোবারকের চাচার সাথে যোগাযোগ করতেন।

এ ঘটনা নিয়ে বাংলা মেইলের বরাতে বিস্তারিত পোষ্ট দেয়া হয়েছে রকমারী.কম এর ফেসবুক পেজ থেকেও। লিংক কমেন্টে। কারন রমকারী গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা সোহাগ ভাইও মজার স্কুলের একজন রেগুলার ডোনার, যিনি বর্তমানে হজ্বে আছেন।

পুরো ব্যাপারটিই স্রেফ ভুল বোঝাবুঝি। পুলিশ না বুঝে, কিছু খতিয়ে না দেখেই তাদেরকে ধরে হয়রানি করছে, এমনকি গত দুদিন ধরে রিমান্ডেও নিয়ে আরিফকে নির্যাতন করা হয়েছে বলে শুনলাম! আমি চিন্তা করছি, আরিফ আর তার বন্ধুরা যদি পুলিশের হাত থেকে ছাড়াও পায়, তবে গত কয়েকটা দিন যে পরিমান মানসিক ও শারীরিক অত্যাচারের ভেতর তাদের যেতে হয়েছে, সে সব কি তারা আদৌ ভুলতে পারবে? ভুলে আবার নতুন করে মজার স্কুলের কাজ শুরু করতে পারবে, নাকি তারা চিরদিনের মতো থমকে যাবে? আর যদি তাও হয়, তবে সেটাও নিশ্চয়ই অস্বাভাবিক কিছু হবে না?

যে কাজ সরকারের করার কথা ছিলো, সে কাজ নিজের বিবেকের তাড়নায় যেচে নিজের পকেটের পয়সা আর নিজের শরীরে ঘাম আর মূল্যবান সময় অপচয় করে আমাদের তরুনরা করে গেছে/যাচ্ছে, বিনিময়ে কি এই নিদারুন অপমান, হয়রানি আর অত্যাচারই ছিলো তাদের কপালে? এতে করে আমাদের দেশের আইন শৃখংলা বাহিনী আমাদের তরুনদের কি ম্যাসেজ দিলেন? তারা কি এদেরকে এবং নিরীহ ডোনারদেরকে ভয়ংকরভাবে নিরুৎসাহিত করলেন না? আমাদের প্রশাসন ও কর্তৃপক্ষের বোধদয় হবে আর কবে কেউ কি বলতে পারেন প্লিজ?

বেশ কয়েক মাস আগে আমাদের অফিসে আরিফ নামের একটা তরুন ছেলে আসলেন এক পূর্ববর্তী পরিচয়ের সূত্রে। জানালেন, তারা পথশিশুদের নিয়ে…

Posted by Proloy Hasan on Tuesday, September 15, 2015

ছবি ডিজাইনঃ প্রলয় হাসান। 

স্বপ্নদুয়ারে রেজিষ্ট্রেশন না করেও আপনার ফেসবুক আইডি দিয়েই মন্তব্য করা যাবে। নীচের টিক চিহ্নটি উঠিয়ে কমেন্ট করলে এই পোষ্ট বা আপনার মন্তব্যটি ফেসবুকের কোথাও প্রকাশিত হবে না।

টি মন্তব্য