এক বুক অপরাহ্ন

হুইল চেয়ারে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা

ভোর হতেই বর্ষার বিরাম নেই। বারান্দার গ্রিল ধরে কাব্য চুপচাাপ বসে আছে হুইল চেয়ারে। আনমনে বৃষ্টি দেখছে। কি অদ্ভুত এক উন্মাদনা আছে এই বর্ষনে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে কেমন যেন ঘোর লেগে যায়। তিনি পৃথিবীতে আসার পর পৃথিবীর বুকে অর্ধশতাধিক বর্ষাকাল এসেছে। তবুও যতবারই তিনি বৃষ্টি দেখেন ততবারই সেটাকে নতুন বলে মনে হয়।

ওর নামের কল্যানেই কিনা, কলেজ লাইফে কবিতা লেখার বেশ ঝোঁক ছিল। অনেক আগের সেই কবি মনের খানিকটা ছিটে ফোটা হয়ত এখনও, এই বুড়ো বয়সেও রয়ে গেছে। অনেক অনেক দিন আগে মৃন্মিয়ীকে নিয়ে ও বিশাল একটা কবিতা লিখেছিলো। সেটা পড়ে মেয়েটার সেকি কান্না! ইদানিং খুব বেশী মনে পড়ছে ওকে।ছাদে গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে কাব্যর প্রচন্ড ইচেছ করছে । কিন্তু হুইল চেয়ার নিয়ে তো আর সিড়ি বেয়ে ছাদে উঠা যায় না। অবশ্য পৃথ্বাকে ক্ষল্লেই ও নিয়ে যাবে। কিন্তু এই মূহুর্তে ওর কাঁধে শরীরের ভর রেখে মেয়েটাকে কষ্ট দিতে মন চাইছে না। আর ছাদে যাবার কথা শুনলে ও তাকে ঘর থেকে বের হতে দেয় কিনা সন্দেহ।

মেয়েটার মা যাবার পর ওর বাবা আরেকটি বিয়ে করে, শেষে সৎ মায়ের পীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে ও আশ্রয় নেয় কাব্যর কাছে। ওর নানা ছিলেন কাব্যর বাল্য বন্ধু। একটু পোটে ধরনের ছিলেন। লোকমুখে কাব্য শুনেছে, ১৯৭১ সালে তাদের গ্রামের এক রাজাকারকে পিটিয়ে মেরে ফেলবার অপরাধে পাকিস্তানী সৈন্যরা তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। যে ছিলো তাদের গ্রামের চেয়ারম্যান, পাকিস্তানী মিলিটারিরা গ্রামে ঢোকার পর যে নিজেকে রাজাকার বলে প্রকাশ্যে ঘোষনা দেয়।

বুড়ো বয়সে মেয়েটা তার চমৎকার সঙ্গী হয়েছে। পৃথ্বাও নানুভাই বলতে অজ্ঞান। একটু আগে এসে জানতে চাইলো- ‘নানু, এখানে বসে আছো যে; ঠান্ডা লাগবে তো।’ উনি কোন কথা বল্লেন না। আর পৃথ্বাও জানে তার এই চিরকুমার নানা বেশ নিঃসঙ্গচারী। র্নিজনতাকে ভীষণ পছন্দ করেন। তাই ও-ও কথা না বাড়িয়ে ওর কাজে চলে গেল।

কাব্যর ধারনা বৃষ্টি আর ঘ্রান, এ দুটো জিনিস খুব স্মৃতি প্রবন। এগুলোর সংস্পর্শে আসলে পুরনো দিনের কথা সাধারনত বেশী মনে পড়ে। আজ এই বর্ষন মুখর দিনে পুরোন দিনের কথা কাব্যরও খুব মনে পড়ছে। বিশেষ করে মৃন্ময়ীর কথা। খুব স্পষ্ট ভাবে। যেন এই তো মাস খানেক আগের কথা। অথচ এরি মধ্যে পেরিয়ে গেছে আটত্রিশটি বছর।

ওর ভালোবাসা, মুক্তিযুদ্ধ, স্বজন হারাবার বেদনা, ভাঙ্গা গড়ার ইতিহাস, সব যেন নিয়তি এক সুতোয় গেথেঁ রেখেছে। ক্রমেই স্মৃতির ধুলো জমতে থাকে ওর অবচেতন মনে। এভাবে এক সময় ও হারিয়ে যায় স্মৃতির রাজ্যে।

১৯৭০ সাল। মৃন্ময়ীর সাথে ওর প্রথম পরিচয় সে বছরের বাংলা প্রথম দিনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নববর্ষ উদযাপন সংক্রান্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মত ওরাও যোগ দিয়েছিলো। সেদিন কাব্য শতশত ছেলেমেয়ের সামনে তার স্বরচিত কবিতা পাঠ করে ভীষণ লজ্জা পেয়েছিলো।

কবিতা পড়ে ভীষন নার্ভাস হয়ে মঞ্চ থেকে নেমে এসে বন্ধুদের মাঝে দাঁড়াতেই হঠাৎ দুটি মেয়ে সামনে এসে দাঁড়ালো। একজন বল্ল- “বাহ। আপনি তো দারুন কবিতা লিখেন!” আরেকজন বল্ল- “আপনার আবৃত্তিও খুব চমৎকার।” সরাসরি প্রশংসায় হতচকিয়ে গেল কাব্য। মিন মিন করে শুধু বল্ল “জ্বি,ধন্যবাদ”।

প্রথম মেয়েটি বল্ল আমার নাম “তন্দ্রা। ফিজিওলজি ডিপার্টমেন্ট। ও আমার ক্লাসমেট, মৃন্ময়ী।”

এতক্ষনে ভাল করে তাকাল ও মেয়েটার দিকে। অপরুপা দেখতে। আর খুবই ভদ্র। কিভাবে কিভাবে যেন ওদের পরিচয়টা আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে গেল।হঠাৎ একসময় আবিস্কার করল, ওরা দুজনই দুজনের প্রেমে পড়ে গেছে।

এরই মাঝে ২৫ শে মার্চের কাল রাতে পৃথিবী স্তম্ভিত হয়ে গেল। দেশের যুব সমাজ প্রতিশোধের আগুনে ঝলসে উঠল।

আচমকা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। দেশের বিভিন্ন জাগা থেকে খবর আসতে লাগলো মুক্তিরা পাকিদের অমুক অমুক ঘাটিঁ উড়িয়ে দিয়েছে। প্রতি খবর শোনার পর বুকে আনন্দের বান ডেকে যেত ওর। হঠাৎ ও সিদ্ধান্ত নিল পাকদের তাড়াতে ও-ও অংশগ্রহন করবে। মৃন্ময়ীকে এটা জানাতেই দুহাতে প্রচন্ড ধরে ওকে চেপে ধরে চেচিয়ে বলতে লাগল না, তুমি কোথাও যাবে না, তুমি আমার কাছে থাকবে।”

কি ছেলেমানুষ ছিলো মেয়েটা!

একরোখা কাব্যকে মেয়েটা থামাতে পারেনি। শেষবার বিদায়ের সময় ও এসে দাঁড়াল সামনে। লম্বা চুল বড় খোপা করে বাধা। চোখে কাজল, ঠোটে লিপস্টিক, কপালে ছোট্ট একটি লাল টিপ। অদ্ভুত সুন্দর একটি শাড়ী পড়েছিলো মৃন্ময়ী।
কাব্য মুগ্ধ স্বরে বল্ল – “এ তো দেখছি স্বর্গের দেবী। আমার মৃন্ম কই?”

শুনে হু হু করে কেঁদে ফেল্ল মৃন্ময়ী। কাজল ধোয়া অশ্রু গাল বেয়ে পড়ছিলো। সেটা তর্জনি দিয়ে মুছে দিয়ে ও বল্ল- “আমাকে হাসিমুখে বিদায় দাও মৃন্ম, কাঁদলে তোমার এই কান্নামাখা মুখ হয়ত সারা জীবন মনে থাকবে আমার। দেখ না আমি হাসছি, যাতে আমার হাসি হাসি মুখটা তোমার মনে সবসময় গেথেঁ থাকে।”

মৃন্ময়ী বাধ ভাঙ্গা কান্নায় ঝাঁপিয়ে পড়ল কাব্যর বুকে। – “তুমি ধরেই নিয়েছো আমাদের আর কোনদিন দেখা হবে না, তাই না?” কান্নার দমকে শেষের কথাগুলো বোঝা গেল না। আসলে কাব্য ভেবেছিলো ও নিজে মারা যাবে। মৃন্ম নয়।

যুদ্ধের মাঝে একবার আজিমপুরে ওদের বাসায় গিয়েছিলো কাব্য। ওরা যে দালানে থাকতো, দেখলো কামানের গোলার আঘাতে তার একপাশ ধসে পড়েছে। পুরো দালানটাই খা খা করছিলো। মৃন্মদের বাসায় ঢুকে দেখল ঘরের সব আসবাব পত্র ছড়ানো ছিটানো। দেয়ালে দলা দলা রক্তের ছোপ। মেঝেতেও, তাতে কাউকে টেনে নেবার চিহ্ন। মৃন্মর ঘরের মেঝেতে ওর বই পত্রগুলো ছড়ানো ছিটানো। একটি ডায়রির ছেড়া পাতা, একটা জামার ছেড়া অংশ, একটি চুলের ফিতা, একটি ভাঙ্গা চুরি মেঝেতে পড়ে ছিলো এসবও। অতিরিক্ত শোকে পাথর হয়ে গেল কাব্য। সব একটা একটা করে একটা কাপড়ের ব্যাগে ভরে রাখলো। এই অমূল্য ব্যাগটা আর শেষতক ওর সাথে থাকেনি। পাকিদের হামলার শিকার হয়ে সেটা হারিয়ে ফেলে। শুয়োরেরা ওর মৃন্ম আর মৃন্মর স্মৃতি, দুটোকেই ওর কাছ থেকে নিয়ে গেছে।

পরের অপারেশন গুলোতে ওর মাথার রক্ত টগবগ করে ফুটেছে। পাকি আর্মি দেখলেই মৃন্মর ঘরের এলোমেলো দৃশ্যের কথা মনে পড়ে। ওর তখন ইচ্ছে করত পুরো পৃথিবীটা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাড় খার করে দিতে।

কয়েকটা রাজাকার কে সেবার ধরে এনেছিলো ওদের সেক্টর কমান্ডার বিগ্রেডিয়ার আতাহার ভাই। প্রচন্ড শীতের ভেতর খালি গায়ে সারারাত বেঁধে রেখেছিলো। ভোরে ওদের পেটের সাথে ডিনামাইট বেঁধে মুখে কাপড় গুজে একটা গ্রামের বড় একটা ব্রীজের নীচে বেঁধে রাখা হল। উপর দিয়ে একটা আর্মি জীপ যেতেই ডিনামাইট দিয়ে কাব্যরা ব্রীজটা উড়িয়ে দেয়। এক ঢিলে তিন পাখি মারল। পাকি মরল, রাজাকার মরল, আর ব্রীজ না থাকাতে আর কোন আর্মি কনভয় গ্রামে ঢুকতে পারেনি। অপারেশনের এই প্লানটা করেছিলো কাব্য নিজে। আতাহার ভাই কি যে খুশী হয়েছিলেন!

যুদ্ধ তখন শেষের পথে, জীবনের শেষ একটা গেরিলা অপারেশনে ওর উরুতে ৪ ইন্চি একটি বুলেট এসে বিধেঁ। আসলে বার বার মৃন্মর কথা মনে পড়াতে এ্যামবুশ করার সময় প্রচন্ড উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলো ও। পাকি ক্যাম্পের ভিতরে গিয়ে ওরা তিনজন একসাথে শত্রুসেনা লক্ষ্য করে ব্রাশ ফায়ার করল। অর্তকিতে আক্রমনে সেনারা হতবিহ্ববল হয়ে পড়ল। ১০/১২ জন সেনা স্পট ডেড। গুরুতর আহত হলো প্রচুর। ওদের মিশন ছিলো শত্রুসেনার এ্যামিউনেশন ছিনিয়ে নেয়া। কারন ওদের স্টক প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিলো। কয়েক শ কার্টুন গোলা বারুদ দেখে কাব্যর চোখ চকচক করে উঠল। যে মজুদ আছে তাতে অনায়াসে আরো ৩০/৪০ টা অপারেশন করা যাবে। এমন সময় হঠাৎ একটা আহত সেনা পিস্তল দিয়ে ওকে গুলি করল। জবাবে ঐ সেনার খুলি উড়িয়ে দিল কাব্য।

গত ৩৮ বছরে এই সব স্মৃতি মনে করে ও যে কতবার কেঁদেছে তার ইয়ত্তা নেই। আজও কাঁদল।

হঠাৎ পৃথ্বাকে চেঁচিয়ে ডেকে বল্ল- “আমাকে একটু ছাদে নিয়ে যাবি নানুভাই? প্লিজ!”

পৃথ্বার কাধে ভর করে ছাদে গেল কাব্য। বৃষ্টি ততক্ষনে অনেকটাই ধরে এসেছে। খুব শীত করতে লাগল কাব্যর। গায়ের পান্জাবী ভিজে চুপসে গেল। মৃন্ম এমন সময়ে থাকলে কি বলত ওকে?
—“এ্যাই, তুমি আবার বৃষ্টিতে ভিজছো? এই বয়সে ঠান্ডা বাঁধালে কে দেখবে তোমাকে? আর পাগলামি কর নাতো, সারাজীবন তোমার পাগলামী সহ্য করেছি। ও চলে যেতেই মৃন্ম ওর পান্জাবী ধরে টান দিয়ে নীচু স্বরে বলত–এ্যাই কোথায় যাচ্ছ, ভিজবে না বৃষ্টিতে?”

কাব্যর চোখ বেয়ে অঝরে জল…..বৃষ্টির কারনে পৃথ্বা বুঝতে পারল না।

হঠাৎ অদ্ভুত একটা দৃশ্য দেখতে পেল কাব্য। বৃষ্টির ক্রমাগত ধারায় ওর কিছুটা দূরে একটা হলোগ্রাফিক স্ক্রীনের মত ঝাপসা একটা পর্দার সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে একটি মুখ দেখা যাচ্ছে। চুল বড় খোপা করে বাঁধা। চোখে কাজল, ঠোটে লিপস্টিক, কপালে ছোট্ট একটি লাল টিপ। ওকে বলছে, “এ্যাই, কি দেখছো, ভিজবে না বৃষ্টিতে?”

(এই গল্পটি আমি ক্লাস টেনে পড়ার সময় লিখেছিলাম। লেখার সময় অত্যন্ত মন খারাপ ছিলো। এবং পরবর্তীতে এইটা যতবার পড়েছি আমার চোখ আদ্র হয়েছে…)

পোষ্টের ছবিটি রুপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যদিও ইনি একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। ছবিসত্বঃ প্রলয় হাসান। স্থানঃ গনজাগরণ মঞ্চ, শাহবাগ।

স্বপ্নদুয়ারে রেজিষ্ট্রেশন না করেও আপনার ফেসবুক আইডি দিয়েই মন্তব্য করা যাবে। নীচের টিক চিহ্নটি উঠিয়ে কমেন্ট করলে এই পোষ্ট বা আপনার মন্তব্যটি ফেসবুকের কোথাও প্রকাশিত হবে না।

টি মন্তব্য