এক অঞ্জলী আনন্দাশ্রু

shopnoduarblog_1226334869_1-2548193497_4a353fd971অনেক বছর আগের কথা, হোম ইকোনমিক্স কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি। আমাদের বাসার একটা বাসা পড়েই আরেকটা বাসা ছিল। বাসা না বলে বিল্ডিং বলাই ভালো। অনেক দিন খালি পড়ে ছিলো। আমার ঘরের পড়ার টেবিল থেকে সরাসরি ঐ বিল্ডিংয়ের একটা জানালা দেখা যেত। প্রায়ই ঘুটঘুটে অন্ধকার থাকতো। ঐ অন্ধকার জানালাটা দেখেই আমার দিন শুরু হতো আর ওটা দেখেই শেষ। হঠাৎ একদিন অবাক বিস্ময়ে দেখলাম ঘরটায় আলো জ্বলছে। কিন্তু অনেক্ষন তাকিয়ে থেকেও কোন প্রানের অস্তিত্ব খুজেঁ পেলাম না। শুধুই একটা ফ্লোরেসেন্ট লাইট জ্বলছিলো।

আনন্দের সাথে প্রথম দেখাটা হুট করেই হয়েছিলো। ও একদিন আমাকে দেখে ওদের জানালার শিক ধরে আমার দিকে অনেক্ষন তাকিয়ে ছিলো। আমার গা শির শির করছিলো। কি আশ্চর্য! এত বছর পরেও অনুভূতিটা এখনও মনে আছে দিব্যি।

ও আসলে আমাকে প্রথম দেখাতে ঠিক ঠাহর করতে পারেনি। যখন পারল তখন দেখল আমিও ওর দিকে তাকিয়ে আছি কঠিন চোখে। সেটা বুঝার পর সাথে সাথেই সরে গিয়েছিলো জানালার সামনে থেকে। কতদিন আগের কথা, অথচ মনে হচ্ছে এই তো সেদিন!

এরপর অনেকদিন কেটে গেল। ও মাঝে মাঝে সাহস করে ইশারা করে আমাকে, আমি ইচ্ছে হলে রিপ্লাই দিতাম, না হলে দিতাম না। তবে এক সময় ব্যাপারটাতে বেশ মজা পেয়ে গেলাম।

আমাদের নিজেদের বানানো অনেক গুলো সাইন ল্যাংগুয়েজ ছিলো। যেমনঃ দুই হাতের তর্জনী এক করে পুরো ৯০ ডিগ্রি বৃত্তাকারে ঘুরে আবার দুই হাতের তর্জনীতে শেষ করে ডান হাতের তালু উল্টানোর মানে ছিলো- “সারাদিন কোথায় ছিলে? দেখিনি কেন?”
আমি দুহাত কড়জোড় করে কাধেঁর উপর দিয়ে নিয়ে দু হাতই লম্বা করে দিতাম, মানে হল “সারাদিন কলেজে ছিলাম, তাই দেখোনি।”

মাঝে আমার দু ভাগ্নি এসব হা করে দেখতো, একদিন খুব সাহস করে ওদের একজনকে দিয়ে আনন্দের কাছে প্রথম চিঠি লিখলাম। সাদা কাগজ, সবুজ কালি। আমার পরিচয় খুব সংক্ষেপে লিখে ওরটা জানতে চাইলাম। দুরু দুরু বুক। কি জানি কি হয়! ঠিকমত পৌছঁবে কিনা, পৌছলেও কি জবাব পাই!

দুদিন পর আনন্দের প্রতুত্তর পেলাম। ওর হাতের লিখা আর কথার মালা গাঁথার ক্ষমতা দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আনন্দ খুবই সুন্দর করে কথা বলতে পারত। যেমন ছিলো তার কথা বলার ভংগি তেমনি তার বাক্য বিন্যাস। আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতাম। ক্লাস শেষে ওকে নিয়ে টিএসসিতে বসে থাকতাম, নীলক্ষেতের ভাতের হোটেলগুলোতে বসে গরম গরম তেহারী খেতাম।

বেশীরভাগ সময়ই ও খুব চুপচাপ থাকতো। কত খুচিঁয়েছি ওকে এটা নিয়ে। পরে অভ্যাস হয়ে গিয়েছিলো। ওর মৌনতা আমার কাছে এত ভালো লাগত! মাঝে মাঝে ভীষন দার্শনিক টাইপ কথা বলে আমার মন খারাপ করে দিতো।

ওর কবিতাগুলো ছিলো আমার পৃথিবীর প্রথম এবং শেষ আশ্চর্য। আমাকে নিয়ে লেখা ওর কবিতাগুলো পড়ে আমার গায়ের রোমকূপ এখনও জেগে ওঠে। কি অসম্ভব আবেগ আর ভালোবাসা দিয়ে সেগুলো লেখা ছিল। কতদিনই না কেঁদেছি সেসব পড়ে। কতদিন বুকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়েছি। আমার সারা জীবনের সঞ্চিত গুপ্তধন ছিলো সেগুলো। আনন্দ জনকন্ঠের সাহিত্য সাময়িকীতে লেখালেখি করত। ওর ছদ্মনামটা বল্লে হয়ত অনেকেই চিনবেন।

ও চিঠিতে আনন্দ নামেই লিখতো। ভেবেছিলাম এটা বুঝি ওর মুখোশে নাম। তাই প্রথম যেদিন ওর সাথে দেখা হলো, জিজ্ঞেস করলাম- আপনার নামটা তো এখনও জানা হল না।
-কেন, আনন্দ!” ও অবাক হয়ে বল্ল।
-না মানে, আপনার আসল নামটা জানতে চাচ্ছিলাম।
-আরে আমার আসল নামই তো ওটা।
-কি বলছেন?” এবার আমি অবাক।
-হ্যাঁ, আমার ডাক নাম। পুরো নাম “মোঃ আনন্দ মুতমাঈন।” আমার এক চাচা এই নাম রেখেছিলেন।

আমি তো রীতিমত থ’! এমন তরো কারো নাম হতে পারে?

মাঝে মাঝে ও খুব পাগলামি করত। একদিন আমি আমার পড়ার টেবিলে বসে বসে পড়ছি। বাইরে প্রচন্ডা বৃষ্টি হচ্ছিল। হঠাৎ দেখি সে তাদের বাসার ছাদে উঠে খালি গায়ে ভিজছে। আমার দিকে পিঠ দেয়া ছিলো ওর। গায়ে একটা তোয়ালে চাপানোর আগে আমার দিকে ফেরেনি। ইশারায় বলেছিলো- “আজ আমার বৃষ্টি বার।” সব বৃষ্টিতে ও ভিজত না, বিশেষ বিশেষ দিনে ভিজতো। সেই দিনটা হতো ওর বৃষ্টিবার।

আমি ইশারায় বল্লাম- “আমি ছেলে হলে আজ আমিও ছাদে উঠে ভিজতাম।”
তবে আমিও একটা পাগলামি করেছিলাম। বিরাট পাগলামি। আমাদের বাসার খুব কাছেই একটা প্রেস ছিলো। ওখান থেকে বেশকিছু বিশাল সাইজের কাগজ কিনে এনে প্রতিটার একপিঠে লিখলাম- “আনন্দ, আমি তোমাকে ভালবাসি”। প্রায় হাজার টাকা খরচ করে টানা ৯ দিন ধরে ২৫ টা শিটে সর্বমোট ১৭,৩৮৭ বার ঐ বাক্যটা লিখেছিলাম। পরে ওগুলো একটার সাথে আরেকটা জোড়া লাগিয়ে বিশাল এক নকশী কাথাঁ বানিয়ে খুব সুন্দর করে প্যাকেট করে ওর ২৫ তম জন্মদিনে উপহার দিয়েছিলাম। সেই কবেকার কথা। সেইসব পাগলামীর কথা মনে হলে এখনও হাসি পায়।

আমরা দুজন দুজনকে অনেক কিছু দিতাম। বই, কার্ড, পারফিউম, জামা, জুতা, ফুল, গানের ক্যাসেট, চকলেট কোন কিছুই বাদ যেত না। আমার বড় ভাগিনার সাথে ওর খুব ভাব হয়ে গিয়েছিলো। আনন্দ মামা বলতে অজ্ঞান ছিলো। ও তখন ক্লাস সেভেনে না যেন এইটে পড়ত। পিচ্চিটা এখন কত বড় হয়ে গিয়েছে! এবছর ঢাবিতে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছে। আমাদের কথা ও ছাড়া আর কেউ জানত না। তাই ওকে যখন দেখি, তখন প্রায়ই অদ্ভুত এক স্মৃতিকাতরতা আমাকে আবিষ্ট করে রাখে। তাই এখনও ওকে একা পেলে যখন জিজ্ঞেস করি, “এ্যাই গাধা, তোর আনন্দ মামার কথা মনে আছে?” ও একটা লাজুক হাসি দিয়ে বলে- “আছে।” আমার দেখতে এত ভালো লাগে!

আমি যে স্যারের কাছে ব্যাচে পড়তাম, আনন্দ ছিলো তার দূর সর্ম্পকের ভাগ্নে। স্যার আমাদের কথা জেনে ফেল্লে আমাকে ব্ল্যাক মেইল করা শুরু করল। টেস্টে রেজাল্ট খারাপ করলেই বলত “দাঁড়াও, তোমাদের পীরিতি আমি ঘুচাচ্ছি।”
‘পিরীতি’ ঘুচানোর ভয়ে রেজাল্ট ভালো করতে হত। আমার মেজর ছিলো “চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট এন্ড নিউট্রেশন”। ফাইনাল সেমিস্টারে কিভাবে কিভাবে যেন পুরো ব্যাচের ভিতর আমি হায়েস্ট নাম্বার পেয়ে গেলাম। স্যারের খুশী দেখে কে! আনন্দ মওকা বুঝে গদগদ কন্ঠে বল্ল- “মামা, এবার আমাদের একটা পরিনতি করে দেও না।” স্যার সেদিন খুব হেসেছিলেন সেদিন।

আনন্দ তুখোড় মেধাবী ছাত্র ছিলো। ঢাবি থেকে ম্যানজেমেন্টে মাস্টার্স র্ফাস্ট ক্লাস র্ফাস্ট। চাকরীর অভাব হয়নি, কিন্তু করপোরেট পরিবেশ ওর কাছে গুমোট লাগতো। দু দুটো চাকরি ছেড়েছে। আর তাছাড়া, ছাত্রজীবন থেকে হঠাৎ করে কর্মজীবনে ঢোকার ব্যাপারটিকে ও কিছুতেই এ্যাডোপ্ট করতে পারেনি। কলেজ-ভার্সিটিতে পড়াকালীন সময়ে খুব কষ্ট করে টিউশনি আর বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করে পড়ার খরচ চালাতো। আর ঐ বাসাটা ছিলো ওর দূর সম্পর্কের এক বড় ভাইয়ের বন্ধুর।
স্যার বল্লেন এভাবে তো হবে না আনু। তোমার সেইভিংস আর আমার কাছ থেকে কিছু টাকা ধার নিয়ে তুমি এ্যাপটেক থেকে একটা কোর্স করো। দেখো সেটার সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারো কিনা। বাংলাদেশে তখন “এ্যাপটেক কম্পিউটার এডুকেশন” নতুন এসেছে। অনেক ইয়াং ছেলে মেয়ে সেখানে ভর্তি হচ্ছিল।

স্যারের উপকার আমরা জীবনেও ভুলব না। তিনি সেঁধে ওকে ত্রিশহাজার টাকা দিয়েছিলেন।
ও নেটওর্য়াকিং-এ এত ভাল একটা রেজাল্ট করল যে এ্যাপটকে ওকে নিজেদের টিউটর হিসেবে রেখে দিলো। বেতন মাসে দশহাজার টাকা। তখন এটাই অনেক ছিলো। আমাকে যখন ও চাকরির খবরটা প্রথম দেয় আমি এক জোরে চেঁচিয়ে উঠেছিলাম, রাস্তার সবাই নাকি আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো।

আনন্দ ছিলো বরিশালের ছেলে। জন্ম এবং বেড়ে ওঠা দুটোই বরিশালে। কিন্তু ও পুরোপুরি ঢাকার ভাষাতেই কথা বলতো। ও নিজে না বল্লে আমি কখনোই বুঝতাম না যে ওর বাড়ী বরিশাল। আমি জানতাম যে, মরে গেলেও আমার পরিবার বরিশাল এবং নোয়াখালিতে সম্পর্ক করবে না। তবু বুকে অনেক আশা নিয়ে চেষ্টা করেছিলাম। কোন ফল হয় নি। তার উপর ওর ভালো কোন চাকুরীও ছিলো না যে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করবো। কিন্তু যখন প্রায় স্থির সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম যে, আমার ভালবাসাকে কিছুতেই পরাজিত হতে দিবো না, ঠিক সে সময়েই ঘটে যায় আরেক অঘটন। আনন্দ একটা রাজনৈতিক ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ে। ওর বিপক্ষের লোকজন ওর নামে মিথ্যা মামলা করে। এ্যারেষ্ট ওয়ারেন্ট বের হয়। ও অনেক তদ্বীর করে বিভিন্ন জাগায় ছুটাছুটি করে গ্রেফতার হওয়াটা কোনমতে আটকায়। কিন্তু এরপর ও চলে যায় গ্রামে। বলতে গেলে নিভৃতে, রাতের অন্ধকারে ও ওর গ্রামের বাড়ী ভোলাতে চলে যায়। শুনেছি সেখানে গিয়ে সে মাছ আর পশুর বিশাল খামার দিয়েছে। গ্রামে যাবার পর আমার সাথে আর কোন যোগাযোগ হয়নি। আমি অনেক চেষ্টা করেও তার গ্রামের বাড়ির ঠিকানা বের করতে পারিনি।

এখনো সেই জানালা আছে। আছে আমার পড়ার টেবিল। আমি ওর জানালার দিকে আজও তাকিয়ে সন্ধ্যা পার করি। নীলক্ষেতের দোকানগুলো দেখলে আজও আমার বুক হু হু করে ওঠে। আমার আকাশে একটা সময় ছিলো দিনের বেলা ঝকঝকে সূর্যের বিভাবরী আর রাতে ছিলো জোসনার ছড়াছড়ি। আজ আমার আকাশে কেন এত মেঘের আনাগোনা? কেন এত দীর্ঘশ্বাস?

 [গল্পটি কয়েকবছর আগে সামহোয়্যারইনব্লগে প্রকাশিত হয়েছিলো। আমার আপন ছোটখালার জবানীতে লেখা। তার পরিত্যাক্ত ব্যক্তিগত ডায়রি থেকে অনুপ্রাণিত ও অনুলিখিত। ইষৎ সম্পাদিত।]

স্বপ্নদুয়ারে রেজিষ্ট্রেশন না করেও আপনার ফেসবুক আইডি দিয়েই মন্তব্য করা যাবে। নীচের টিক চিহ্নটি উঠিয়ে কমেন্ট করলে এই পোষ্ট বা আপনার মন্তব্যটি ফেসবুকের কোথাও প্রকাশিত হবে না।

টি মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *