একজন বৃদ্ধ ভিক্ষুকের খোজেঁ…

 

5958401776_ec2b911ff8_b

গাড়ির ভেতর থেকে খুব মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করেছিলাম একজন বৃদ্ধকে…ব্যস্ত রাজপথে দুপুরের গনগনে রোদের ভেতর সে ভিক্ষা করে সিগন্যালে দাড়িয়েঁ পড়া বাহনগুলোর জানলায় গিয়ে গিয়ে। আমি খুব মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করি, তারা কি করে। আমি খেয়াল করলামঃ

১. কিছু কিছু বৃদ্ধ ভিক্ষুক খুবই বুদ্ধিমান। তারা এক কাষ্টমারের কাছে বেশীক্ষন দাড়িয়েঁ থাকে না। দাড়ায়ঁ, হাত পাতে, দুয়েক লাইনের একটা বাক্য বলে ভিক্ষা চায়। এরপর কাষ্টমার ব্যাগ বের করে ভিক্ষা দেয় অথবা মাফ চেয়ে অন্যদিকে যেতে বলে। পুরো প্রসেসটাই খুব দ্রুত ঘটে। আমি ঘড়ি ধরে দেখেছি, প্রসেস শেষ হতে সব মিলিয়ে ১০ সেকেন্ড সময়ও লাগে না। গরমে সবার ত্রাহি মধূসুদন অবস্থা, তার উপর অনির্দিষ্টি কালের জন্য জ্যাম। অফিসে লেট। বাড়ীতে পৌছাঁতেও লেট। সুতরাং, ভিক্ষা দেবার ইচ্ছা থাকলেও মেজাজ খারাপের কারনে দেয়া যায় না। বৃদ্ধও আর সময় নষ্ট করে না। সে পাশের গাড়ীর দিকে ছুটে যায়। তার ১০ সেকেন্ডর অনেক দাম।

২. কিছু কিছু বৃদ্ধ খুবই অভিজ্ঞ। আমি খুব কাছ থেকে লক্ষ্য করেছি, তারা সে সব ক্লায়েন্টদের কাছেই হাত পাতে, যাদের কাছ থেকে ভিক্ষা না পাবার সম্ভাবনা খুবই কম। আমার ধারনা, দীর্ঘদিন ধরে ভিক্ষা করতে করতে তারা এখন এতই অভিজ্ঞ হয়ে গেছে যে, আক্ষরিক অর্থেই তারা মুখ দেখে বলে ফেলতে পারে, কে ভিক্ষা দেবে আর কে দেবে না। তাই, আমি খুব অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, এরা যাদের যাদের কাছে ভিক্ষা পাচ্ছে না, তাদের পরের সিরিয়ালের অনভিজ্ঞ ভিক্ষুকরাও তাদের কাছে ভিক্ষা পাচ্ছে না। আর যাদের যাদের কাছে অভিজ্ঞ ভিক্ষুকগুলো ভিক্ষা চাচ্ছে, তাদের ভেতর শতকরা ৯৫ ভাগ লোকই ভিক্ষা দিচ্ছে। ব্যাপারটা একটা পাই চার্ট একেঁ দেখাতে ইচ্ছে করছে। কোনদিন এটা নিয়ে উচ্চতর গবেষনা করলে আকাঁ যেতে পারে।

৩. অভিজ্ঞ ভিক্ষুকদের ভিক্ষা প্রক্রিয়াটা খুবই মজার। একটু ভালো করে খেয়াল করলেই মজাটা ধরতে পাওয়া যায়। এরা খুব অল্প সময়ের ভেতর অনেক ভিক্ষা পায় এবং ভিক্ষার টাকা বেশীরভাগ সময়ই দামী সিগারেট বা গাজাঁ বা অল্প বয়সী নারীর পেছনে খরচ করে। এটা অবশ্য শোনা কথা। আমি নিজের চোখে শুধু দামী সিগারেট খেতে দেখেছি। বাকী দুটো দেখিনি।

৪. সব সময় যে অভিজ্ঞতার কারনেই তারা অপাত্রে সময়ক্ষেপন করে না, তা নয়। কিছু কিছু বৃদ্ধ ভিক্ষা না পেয়ে পেয়ে বা হাত পেতে নিরাশ হতে হতে ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে গেছে। তাই তারা, “মাফ করো” কথাটা শোনামাত্র, [কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখেছি, ’মাফ করো’ বলার জন্য মুখ খোলামাত্র] অন্যদিকে হন হন করে হাটাঁ দেয়। এতটাই দ্রুত যে, যার কাছে ভিক্ষা চাওয়া হয়, সে নিজেও অবাক চোখে বৃদ্ধের চলে যাওয়া দেখে।

শুভ কামাল একবার এক ভিক্ষুকের কথা বলেছিলো। সদরঘাটের ভিক্ষুক। তারা শরীরের নীচের অংশ নাই, কোমর থেকেই শেষ হয়ে গিয়েছে। [দু হাতও নাই যতদূর মনে পড়ে], শুধু বুক আর মাথা নিয়ে একটা মাংস পিন্ড হাছড়ে পাছড়ে চলে রাস্তার ধুলাবালির উপর আর পথচারীদের কাছে আর্তস্বরে ভিক্ষা চায়। শুনে ব্যাপারটা অত্যধিক মর্মন্তুদ মনে হতে পারে। আমারো হয়েছিলো। সেটা দেখে শুভ কামাল বলে – ”ওর যে পরিমান সম্পদ আছে, আপনার-আমার দুজনের মিলেও তার অর্ধেক হবে না।” এরপর সে ঐ ভিক্ষুকের সম্পদের একটা সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেয়। বর্ণনা শুনে আমার ভিমড়ি খাবার অবস্থা। শুভ কামালদের রেস্টুরেন্টর আশে পাশে লোকটা ভিক্ষা করে এবং শুভ কামাল তার নিয়মিত খোজঁ খবর রাখেন। সুতরাং, শুভ কামাল বাড়িয়ে বলেছেন, এমনটা মনে হলো না। মন খারাপ হলো আমার। তাহলে কি লোকটা একটা প্রতারক? উত্তরটা শুভ কামালই দিলোঃ “ না, ঠিক প্রতারক না, কিন্তু অনেক দিনের অভ্যাস তো, বেচারা ছাড়তে পারতেছে না ঠিক। দেখবেন, যারা বছরের পর বছর ধরে ভিক্ষা করে, তারা সহজে এই পেশা ছাড়তে পারে না। ও-ও পারতেছে না। একটা প্রবল নেশার মতো হয়ে গেছে।” আমার ধারনা, সে ঠিকই বলেছে।

পল্টনের মোড়ে একবার রিকশা নিয়েছিলাম যাবার জন্য। যথারীতি সিগন্যালে আটকে গেলাম। পল্টনের সিগন্যাল মানেই জ্যাম। আমি মেজাজ খারাপ করে বসে রইলাম। একটু পরেই একজন বৃদ্ধ এসে ভিক্ষা চাইলো। আমি কানে রেডিও লাগিয়ে গান শুনছিলাম। বৃদ্ধ ভিক্ষুকদের সাধারনত খালি হাতে ফেরানো হয় না। আম্মুর কাছ থেকে পাওয়া অভ্যাস। কিন্তু এই লোককে খুব একটা ‍বৃদ্ধ মনে হলো না, বরং চুল দাড়ি পাকা হলেও বেশ সতেজ সতেজ ভাব।

গনগনে রোদ। ভ্যাপসা গরম। আমি ওয়াচ করা শুরু করলাম। লোকটার পরনে বহু পরনো একটা পাঞ্চাবী এবং লুগি। কিন্তু অবাক করা ব্যাপার, দুটোই পরিস্কার। একটু পর আরো অবাক হয়ে দেখলাম, লোকটা আমার সামনে থেকে যাচ্ছে না। এখনও দাড়িয়েঁ। বুঝলাম, সে ১ ও ২ নং ক্যাটাগরির বাইরের লোক। এই লাইনে নতুন মনে হয়। আমার রিকশার পাশে সেই লোকটা প্রায় ৩ ‍মিনিট দাড়িয়েঁ ছিলো। আমি দেখতে চাচ্ছিলাম তার ঘটনাটা আসলে কি? ৩ মিনিটে সে জ্যামে আটকে থাকা প্রায় অর্ধেক যানবাহনের কাছে পৌছেঁ যেতে পারতো। তার এই সময় নষ্ট করার মানে কি? কিন্তু প্রচন্ড রোদ থাকায়, লোকটাকে আর দাঁড় করিয়ে রাখতে সাহস পেলাম না। মানিব্যাগ বের করে ২০ টাকার একটা নোট দিয়ে বল্লাম – “চাচা, আপনার ধৈর্য্য দেখে আমি মুগ্ধ হইছি। ১০ টাকা আপনার ভিক্ষা। আর ১০ টাকা আপনার ধৈর্য্যর জন্য।” চাচা টাকাটা নিয়ে কপালে ছোয়ালো। টাকাসহ সালাম দিলো আমাকে মনে হয়!

এরপর চাচা আমার পেছনের রিকশার দিকে এগিয়ে গেলো। আমি তাকে দূর থেকে লক্ষ্য করতে থাকলাম। রিকশা বিদায় করে দিয়ে ফুটপাথের একটা চায়ের দোকানে বসে চায়ের অর্ডার দিয়ে তীক্ষ চোখে চাচাকে দেখতে লাগলাম। চাচা অনেক সময় নিয়ে, বলতে গেলে সবার কাছ থেকে ভিক্ষা ‘আদায়’ করে ছাড়লো। তারপর যখন জ্যাম ছুটে গেলো, চাচাকে দেখলাম প্রেস ক্লাবের দিকে হেটেঁ হেটেঁ একটা গলির ভেতর ঢুকে যেতে। আমি চায়ের বিল দিয়ে ছুটলাম পেছন পেছন।

এরপর যা দেখলাম, সেটা রূপকথা মনে হতে পারে, আমি বাড়িয়ে বলছি মনে হতে পারে, অথবা “ও, এ আর এমন কি, কতজনই তো করে” – মনে হতে পারে। কিন্তু সেদিন আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। আমার মন চাচার জন্য দয়াদ্র হয়েছিলো। আমি কাছে গিয়ে আমার মানিব্যাগের সবগুলো টাকা তাকে দিতে চেয়েছিলাম। সে নেয়নি।

এরপর যতবারই আমি পল্টনের মোড়ে গিয়েছি, ততবারই ঐ বৃদ্ধকে খুজেঁছি। পাইনি।

ছবি কৃতজ্ঞতাঃ আতা ইসলাম খান মজলিস

https://www.facebook.com/proloyhasan/posts/10152001601717220

স্বপ্নদুয়ারে রেজিষ্ট্রেশন না করেও আপনার ফেসবুক আইডি দিয়েই মন্তব্য করা যাবে। নীচের টিক চিহ্নটি উঠিয়ে কমেন্ট করলে এই পোষ্ট বা আপনার মন্তব্যটি ফেসবুকের কোথাও প্রকাশিত হবে না।

টি মন্তব্য