কোরবানী ঈদ নামচা

Eid-ul-Adha_st-1-568x424.১. ঈদের নামায পড়তে গিয়ে প্রতিবারই তাকবীরে তাহরীমা নিয়ে বিভ্রাট সৃষ্টি হয়। এমন দুর্লভ নামায, বছরে মাত্র দুবার, সুতরাং সে নামাযের নিয়ম কানুনে পাবলিক ভুল করবে সেটাই স্বাভাবিক। অবশ্য প্রতিবারই নামায শুরু করার আগে ইমাম সাহেব পই পই করে নামাযের নিয়ম বলে দেন, কিছু পাবলিক তবুও ভুল করে।

আজ আমার পাশে দাড়ানোঁ মুরুব্বি গোছের মানুষটা এক অভিনব ভুল করলেন। ১ম রাকাতে সার্বজনীন ভুলটা করলেন কিন্তু ২য় রাকাতে রুকুতে না গিয়ে সোজা চলে গেলেন সিজদায়। তার হয়ত কিছুক্ষনের জন্য মনে হয়েছিলো তিনি তারাবীর নামায পড়ছিলেন। কারন তারাবীর নামাযে মাঝে মাঝে রুকু ছাড়াই সেজদাতে চলে যেতে হয়। তো এরপর মুরুব্বীর পাশে দাড়াঁনো একটা বাচ্চা ছেলে মুরুব্বীর পিঠে হাতে দিয়ে বলতে লাগলো – ‘নানা, উঠেন। উঠেন।’ মুরুব্বী তখন সিজদা থেকে দাড়িয়ে রুকুতে গেলেন। কিন্তু জামাত ততক্ষনে সিজদায় চলে গেছে।

২. আমাদের গরু জবাই করতে আসলো সদ্য দাড়িঁ গজানো কিশোর বয়সী মাদ্রসার একটা ছেলে। ছেলেটা ছোটখাট, কিন্তু তার হাতের রানদা টা মনে হলো তার চাইতেও লম্বা। আমি ভ্রু কুচঁকে ভাবলাম, এই ছেলে কিভাবে এত বড় গরু জবাই করবে? কিছু বুঝার আগেই ছেলেটা আল্লাহ আকবার বলে ছুরি বসিয়ে দিলো। কিন্তু গরুটা তখনও তড়পাচ্ছে। ছেলটা গেট দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলো, আব্বু তখন ধমক দিয়ে ওকে আবার নিয়ে আসলো। আবার যখন ছুরি বসালো, তখন আব্বু পেছন থেকে এমন এক ধমক দিলো – ”আরে ব্যাটা, রগটা কাট আগে” বলে, বেচারা ভয়ে ছুরি হাত থেকে ফেলে দিলো। আব্বুর তখন মেজাজ খারাপ। নিজেই ছুরি তুলে কাজ সারলো। এরপর গজ গজ করতে বল্ল, ’কই থেকে এইসব পুলাপানকে ছাড়ে!’ খুব সম্ভবত আজই ছেলেটার ‘জবেহকারী’ হিসাবে প্রথম দিন। আমার মত, এইসব কোমলমতি শিশুদের এই কাজে না দিয়ে সরকারীভাবে প্রতি এলাকায় কিছু প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত লোক নিয়োগ করা উচিত ঈদের দিন গরু জবাইর জন্য।

৩. আমার স্কুলপড়ুয়া ছোটভাই খুব আগ্রহ করে মাংস কাটতে বসেছে। গরুর চর্বিতে হাত পিছলে গিয়ে যেন ধারালো বটিতে আঙ্গুল না কাটে এই জন্য আম্মু তার পাশে এক বাটি ময়দা রেখে দিয়েছে। (তবু শেষ রক্ষা হয়নি। একটু আগে শুনলাম সে স্যাভলন আর তুলা খুজঁছে।)

আব্বু চাপাতি দিয়ে গরুর রান থেকে মাংস কেটে কেটে ওকে দিচ্ছে, ও পিস পিস করছে। আমি দূর থেকে ছবি তুলছি। আর ভাবছিঃ

ক. এই দৃশ্য উপমহাদেশে শুধু বাংলাদেশ-ভারতেই দেখা যায়। এশিয়ার মুসলিমদেশগুলো, এমনকি মিডল ইষ্টেও এখন এইভাবে কুরবানী দেয়া হয় না। পদ্ধতি আরো বেশী আধুনিক আর শর্টকার্ট। কারো এত সময় বা আগ্রহ কোনটাই নাই যে বাড়ীতে কোরনবানী দিয়ে নিজেরাই মাংস কাটতে বসে যাবে। আর নন-মুসলিম দেশ গুলোর কথা নাইবা বল্লাম। ওখানে জন্ম নেয়া এবং/অথবা বেড়ে ওঠা মুসলিম শিশুগুলো কোনদিনই এই দৃশ্য দেখে না। কোরবানী উৎসবের একটা বিরাট অংশ ওদের কাছে কখনই ধরা দেয় না। তারা বছরের অন্যান্য দিনের মতই ’প্যাকেটজাত মাংস’ খেয়ে ঈদ পালন করে।

খ. বুড়ো হয়ে যাচ্ছি। তার প্রমান হলো, একটা সময় আব্বুর সাথে হাটেঁ গিয়ে গরু কেনা থেকে শুরু করে ঈদের দিন জবাই করা, গরু কাটা, বাড়ী বাড়ী গিয়ে মাংস বিলানো; আর সবশেষে দুপুরে চালের রুটি দিয়ে তাজা গোশত ভূনা খাওয়া – এসব কাজ অসম্ভব আগ্রহ নিয়ে করতাম। গত বছর থেকে আমি খুব অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম যে, ছোটবেলার সেই ‘অসম্ভব আগ্রহের’ প্রায় পুরোটাই ফিকে হতে বসেছে।

৪. ঈদের আগে গরু কিনতে গিয়ে বিশাল সব অভিজ্ঞতা হয়েছে। গাবতলী হাটে ক্রেতার চেয়ে গরু ছিলো অনেক বেশী। তবু কোন এক অজ্ঞাত কারনে গরু বিক্রেতারা দাম ছাড়েনি। আমরা দামাদামি করে করে হাল ছেড়ে দিয়েছি, তারা দাম ছাড়েনি। শেষে রাত ১০ টায় ক্লান্ত হয়ে গরু কিনে বাড়ী ফেরা। ফেরার পথে বুঝলাম, ঘন্টাখানেক দামাদামি করে যে গরুটা কিনলাম সেটা আদতে একটা ক্ষ্যাপাটে গরু। আমি কিছুতেই তার রশি ধরে রাখতে পারি না। আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যায় এমন অবস্থা। পথিমধ্যে, রাস্তা দিয়ে যাওয়া আমাদের পাশ দিয়ে যাওয়া গরুর উপর কয়েকবার সে চড়ে বসতে চাইলো। প্রথমে ভাবলাম, কোন কারনে গরু সাহেবের মন বিক্ষিপ্ত। পরে বুঝলাম, ঘটনা অন্য।

৫. হাত-পা বেঁধে ইউপি চেয়ারম্যান পেটাচ্ছেন আমজাদ হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে। তাঁর তিন শিশুসন্তান হাউমাউ করে কাঁদছে। বাবাকে না পেটানোর অনুরোধ করছে। কিন্তু অবুঝ শিশুদের আর্তি ‘বুঝদার’ চেয়ারম্যানের মন গলাতে পারেনি। চার ঘণ্টা বেধড়ক পেটানোর পর থামলেন চেয়ারম্যান ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা। গত রোববার রংপুরের বদরগঞ্জে ঘটে এ ঘটনা। চেয়ারম্যান শহিদুল হক মানিকের অভিযোগ, আমজাদ বাড়িতে চোরাই গরু রেখেছেন। তবে পিটুনির শিকার হওয়া আমজাদ বলেছেন, তিনি বাড়িতে কোনো চোরাই গরু রাখেননি। গত ইউপি নির্বাচনে তিনি শহিদুল হকের পক্ষে কাজ না করায় তাঁর ওপর অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে। ঈদের দিন সকাল বেলা এই ধরনের খবর পড়লে ঈদের দিনটা আনন্দের সাথে শুরু হবার কোন কারন নাই। মনে হচ্ছিলো, গরুর বদলে দেশের কয়েকটা ইউপি চেয়ারম্যানকে কোরবানী দেয়া দরকার।

৬. এবারের ঈদে আমরা অপূর্ব এক সাম্প্রদায়িক মেলবন্ধন দেখলাম। দিন তিনেক আগে শাঁখারি বাজারে গিয়ে দেখি, একদিকে ঢাক বাজিয়ে বিশাল মন্ডপ বানিয়ে পূজো দেয়া হচ্ছে, আরেকদিকে কোরবানির গরুর হাট বসেছে। ঈদের আগের দিন হয়ে গেলো বিজয়া দশমী, সদরঘাটে বুড়ি গঙ্গায় যেখানে প্রতিমা বির্সজনের মধ্য দিয়ে উৎসবমুখর দুর্গাপূজো শেষে হলো, সেখানে তখনও ট্রলার ভর্তি করে বিভিন্ন জেলা থেকে গরু আনা হচ্ছিলো কোরবানীর জন্য। বাংলাদেশ ছাড়া এমন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আর কোন দেশে কি পাওয়া যাবে? কারন ভারতে ঘটা করে পূজো হয়, কিন্তু অত ঘটা করে কোরবানী হয় না। ফাকিস্তানে ভাইস ভার্সা। ঘটা করে কোরবানী দেয়া হয়, কিন্তু পূজো? একেবারেই না। বাকী রইলো আমার দেশ। আমার দেশে দুটোই পাশাপাশি একই ঘনঘটায় হয়েছে।

৭. আমার জন্য একটা ব্যাক্তিগত আনন্দের ব্যাপার আছে আজকের দিনে। আব্বুকে বলেছি, কোরবানীর চামড়া বিক্রির টাকাটা আহনাফ তহবিলে দেয়া হবে। আব্বু রাজী হয়েছেন। প্রতিবার এই টাকা যায় কোন এক এতিমখানা বা গ্রামের মসজিদে। এবার একটা জরুরী কাজে ব্যয় হবে।

New-Eid-Mubarak-Wallpaper

 সবাইকে পবিত্র ঈদুল আদহার শুভেচ্ছা। ঈদ মোবারক।

স্বপ্নদুয়ারে রেজিষ্ট্রেশন না করেও আপনার ফেসবুক আইডি দিয়েই মন্তব্য করা যাবে। নীচের টিক চিহ্নটি উঠিয়ে কমেন্ট করলে এই পোষ্ট বা আপনার মন্তব্যটি ফেসবুকের কোথাও প্রকাশিত হবে না।

টি মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *