Status

আম্মু, অবুঝ মেয়ে আমার!

মৃআমাকে নিয়ে অনেক টেনশন আমার বুড়ি মেয়েটার। আমার কাছে একদম বাচ্চা মেয়েদের মত বায়না ধরে। প্রতিদিন তাকে ফোন করতে হবে, প্রতিদিন ই-মেইল করতে হবে আর প্রতিদিন এসএমএস করতে হবে। আমার সবকিছু তাকে জানানো চাই ই চাই। আমি খানিকটা বিরক্ত হয়ে বলি, ‘তুমি যে কি বল না আম্মু! এত সময় কোথায় আমার? তাছাড়া, যে কোন একটা করলেই তো হয়। ফোন, ইমেইল, ম্যাসেজ সব একদিনে করতে হবে কেন?’ কিন্তু কে শোনে কার কথা?

খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে ক্লাসে চলে যাই। ট্রেনের দুলুনিতে বসে বসে আম্মুর মোবাইলে এসএমএস পাঠাই। বাংলাদেশে তখন ভোর ৪ টা।

”আম্মু, এখন ট্রেনে করে ক্লাসে যাচ্ছি। আচ্ছা, তুমি অঞ্জন দত্তের ঐ গানটা শুনেছো না? ঐ যে, বসে আছি ইষ্টিশানাতে। ওটাতে একটা লাইন ছিলো না? “ট্রেনের দোলাতে রোজ দুপুরে, মায়ের কোলের সেই দোলাটা, মনে পড়ে যায় আমার।” আম্মু তোমার আমি এ গানটা শুনতে শুনতে যাচ্ছি। তোমার কোলের দোলা মনে পড়ছে।

এই সময়ে তারঁ ঘুমিয়ে থাকার কথা, অথচ প্রায় সাথে সাথেই রিপ্লাই আসে। যেন আমার ম্যাসেজের জন্যই অপেক্ষায় ছিলো।

”সাবধানে থাকিস বাবা, ওখানকার ট্রেইন তো খুব জোরে চলে। সিটের সাথে ভালো করে সেটেঁ বসে থাকবি। আর হাতল বা লোহার রড থাকলে শক্ত করে সেটাকে ধরে রাখবি। রাস্তা ঘাটে গান টান শুনিস না বাবা, দোয়া দরুদ পড়তে পড়তে যা। নাস্তা খেয়ে বের হয়েছিস?”

এই হল আম্মু। মনে মনে আমি হাসি। আমি স্বান্তনার স্বরে লিখি,

”তুমি একদম চিন্তা করবে না আম্মু আমি ট্রেনের হ্যান্ডেল শক্ত করে ধরে বসে আছি। ট্রেনের বাবার সাধ্য নাই আমাকে এক চুল নড়ায়। ট্রেনে উঠেই আমি তোমাকে শিখিয়ে দেয়া দোয়া পড়েছি আম্মু। হুম সকালে কলা, ডিম আর কমলার জুস দিয়ে নাস্তা করেছি।”

ক্লাসের পর ক্যাম্পাসে বসে ল্যাপটপ থেকে আম্মুকে মেইল করি। – ”আম্মু, আমি ব্রেকে আছি। একটা ক্লাস শেষ হলো এখন আরেকটার জন্য ওয়েট করছি। এই ফাকেঁ কিছু খাবো। (পেটে একদমই খিদে নেই। আম্মুকে খুশী করার জন্য খাওয়ার কথা বলা।) ক্লাস শেষ করে কাজে যাবো। রাতে বাসায় ফিরে ফোন দিবো তোমাকে।”

প্রচন্ড ক্লান্ত হয়ে প্রতি রাতে বাসায় ফিরে দেশে ফোন দিতে হয়। সারাদিন কি করলাম সেগুলোর খুটিনাটি বর্ননা দিতে হয়। প্রতিবারই ফোন রাখার আগে কড়া করে ধমক খাই ‘খবরদার একদম রাত জাগবি না, নিশাচর হস নে।’

এস এস সি পরীক্ষার জন্য রাত জাগার বদ্যাভাস হয়েছিলো। নিশাচর তখন থেকেই হয়েছি। আম্মু জানেনা, পড়ার চাপে আর তাঁর দেয়া নামের অবদানে আমাকে এখন সারারাত অনলাইনে থাকতে হয়।

অস্ট্রেলিয়ান এ্যামবাসি যেদিন আমার পাসপোর্টে ভিসার ষ্টিকার লাগিয়ে দিলো, বাসায় এসে আম্মুকে ধরে সে কি কান্না আমার!

আম্মু নিজের হাতে আমার ব্যাগ গুছিয়ে দিলো। আম্মু জানতো যে আমি মাথার বালিশ ছাড়া ঘুমাতে পারি কিন্তু কোলবালিশ ছাড়া কখনই আমার ঘুম হয় না। তাই আমার সু্টকেসে আমার কোলবালিশটাও ভরে দিলেন। কেউ কোনদিন কোলবালিশ সাথে নিয়ে বিদেশে গিয়েছে কিনা জানিনা তবে সিডনি এয়ারপোর্টের কাস্টমস অফিসার যখন আমার ব্যাগ চেক করছিল, আমার কোলবালিশটা দেখে সে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলো। তখন তাকে বলেছিলাম ‘This is my lap pillow, I cant sleep without it, that’s why my mom gave it along with me, You can check it out.’ মহিলাটার মুখ দেখে মনে হল জীবনে এর আগে কোনদিন তিনি এমন অভিæতার মুখোমুখি হননি। আম্মুকে ফোনে এই ঘটনা বল্লে তো সে হাসতে হাসতে শেষ।

যেদিন দেশ ছেড়ে আসি, দেখলাম আমার মেয়েটার লাল মুখ কাঁদতে কাঁদতে আরো লাল হয়ে গেছে।

আমার একটা চশমা কয়েকমাসের বেশী যায় না। ভেঙে ফেলি। তাই আম্মু বুদ্ধি করে আমার ব্যাগের ভেতর কয়েক জোড়া চশমা দিয়ে দিয়েছিলেন। এখন বুঝি, আম্মু আমার কত্ত বড় উপকার করে ছিলেন। এখানে চশমার যা দাম, চশমা কিনতেই আমার সেমিস্টার ফি’র অর্ধেক চলে যেত। আম্মু প্রায়ই মজা করে বলতেন, তোর চোখ আর চশমার পেছনে যতটাকা খরচ করেছি, সেই টাকা দিয়ে আমি তোর মত আরেকটা ছেলে পালতে পারতাম।

অথচ আমার চোখের এই দুরবস্থার জন্য কিন্তু সে-ই দায়ী। ক্লাস টু তে তিনি আমার হাতে সত্যজিৎ রায় তুলে দিয়েছিলেন। সেই যে শুরু হল। তারপর একে একে তাঁর সবগুলো প্রিয় লেখকের প্রায় সবগুলো বই আমাকে দিয়ে গলাধঃকরন করানো হল। সেই সাথে তারঁ ব্যাক্তিগত লাইব্রেরির সব বই! উফ! আমাকে বইয়ের পোকা বানিয়ে ছেড়েছিলো আম্মু! মানুষের মায়েরা তাদের ছেলেদেরকে কতকিছু উপহার দেয়। আমি পেতাম শুধু বই। কোন জন্মদিন বা কোন অকেশনে আমার মনে পড়ে না আম্মুর কাছ থেকে আমি বই ছাড়া অন্যকিছু পেয়েছি। শেষে আমার বইয়ের এমন নেশা হল যে আব্বুর ভয়ে কম্বলের নীচে র্টচ লাইট জালিয়ে বই পড়েছি! এর পরও চোখ বাবাজি যে এখনও সাথে আছে এই তো বেশী। তবে আম্মুর প্রচেষ্টা হয়ত কিছুটা হলেও সার্থক হয়েছিলো। তাইতো, মিঠু আন্টি একদিন বল্ল-‘ আপা, আপনার ছেলেটি তো বই ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না।’ আম্মু মুচকি হেসে বল্লে, ‘হুমম, পরে ‘ই’ এর জাগায় ‘উ’ না হলেই হয়।’ আমি তো প্রথমে বুঝতেই পারিনি, পরে যখন বুঝলাম, তখন খুবই মজা পেয়েছিলাম আম্মুর কথায়। আম্মুর রসবোধ আমাকে সবসময়ই মুগ্ধ করেছে।

সেদিন আম্মুকে ফোনে ক্লাসমেট বান্ধবী লরেনের কথা বলতেই আমাকে বলে, ‘দেখিস, বিদেশী মেয়েদের সাথে আবার কোন সর্ম্পকে জড়াস না যেন। ওদের চরিত্রে বিশাল বিশাল সমস্যা থাকে।’ আমি তো হাসতে হাসতে শেষ।

অনেক বছর আগে, চশমার দোকানের ওয়েটিং রুমে হঠাৎ লিনুর সাথে দেখা হবার পর যেদিন আমাকে বলেছিলো,’ তুই কি সাইকেল নিয়ে এদিকেই আসিস নাকি?’ আমি সেদিনও হাসতে হাসতে কুটিকুটি হয়েছিলাম। কারন আম্মু হয়ত ভেবেছিলো, আমি প্রতিদিন বিকালে ওর সাথে ডেট করতেই সাইকেল নিয়ে বের হই। আম্মু, আমার অবুঝ মেয়ে, একজন মানুষ আমার জীবনে আসবে, আর আমি সেটা তোমার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখব, সেটা কি কখনো হয়?

আম্মুর গানের গলা খুবই চমৎকার ছিলো। সেসব দিনের কথা এখনো মনে পড়ে ভীষন, খুব ছোট বেলায় আমার যখন জ্বর হত তখন আম্মু আমাকে নিয়ে রাতের বেলা আমাদের বাসার ছাদে বসে বসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিত আর আমাকে গান শুনাতো। আম্মুর কাঁধে মাথা রেখে খুব মন দিয়ে তাঁর গান শুনতাম। মোমের পুতুল মোমের দেশে, আমরা সবাই রাজা, আমাদের দেশটা স্বপ্নপুরী, বাবা বলে গেলো আর কোনদিন গান করনা, বুলবুল পাখি ময়না টিয়ে – এইগান গুলো আম্মুর মুখ থেকে শুনে শুনে সব মুখস্ত করে ফেলেছিলাম। শিশুতোষ সেই গানগুলো আমার কাছে ছিলো ঘুম পাড়ানি গান। আম্মুকে বলেছিলাম, আমার যদি কখনো একটা দুষ্ট বুড়ি হয়, আমি তোমার কাছে ওকে গান শিখতে দিবো। তুমি তোমার জানা সব গান ওকে শিখাবে। তখন ওই বুড়িটা তার এই বুড়ো ছেলেটাকে তোমার শেখানো ওই গানগুলো গেয়ে তোমার মত করেই ঘুম পাড়াবে।’

আম্মুর খুব শখ ছিলো মা ডাক শোনার, কিন্তু জীবনে খুব কমই তারঁ এই শখটা পূরন করতে পেরেছি। বন্ধুরা যখন মা বলে ডাকত, তখন মনে হত মা বুঝি খুব ভিন্ন কিছু, সে আমার চিরচেনা ‘আম্মু’ নন। প্রথম প্রথম কেমন যেন লজ্জা করত। তাই মামনি ডাকতাম। আরেকটু বড় হলে ‘আম্মু।’ এবং আমি আম্মুতেই বেশী স্বাচ্ছন্দ্য। ছোটবেলায় আম্মু বলেছিলেন, তোমার আম্মুই তোমার মা।

কতদিন রাতে ঘুমাই না। আম্মু, এখন সারারাত নির্ঘুম কাটলেও কেউ আর আমাকে ঘুম পাড়ানি গান গেয়ে শোনায় না। আমার প্রচন্ড ইচ্ছে করে, ছোটবেলার মতো করে তোমার কোলে মাথা রেখে ঘুমাতে, তুমি মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে। আমি তোমার একটা আঙ্গুল আলতো করে ধরে ঘুমাবো। ঠিক ছোটবেলার মতো।

[soundcloud url=”https://api.soundcloud.com/tracks/178477381″ params=”auto_play=false&hide_related=false&show_comments=true&show_user=true&show_reposts=false&visual=true” width=”100%” height=”450″ iframe=”true” /]

পালবাসা সিদ্দিকী – মা

স্বপ্নদুয়ারে রেজিষ্ট্রেশন না করেও আপনার ফেসবুক আইডি দিয়েই মন্তব্য করা যাবে। নীচের টিক চিহ্নটি উঠিয়ে কমেন্ট করলে এই পোষ্ট বা আপনার মন্তব্যটি ফেসবুকের কোথাও প্রকাশিত হবে না।

টি মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *