আমি যেভাবে আজ চাক্ষুষ করলাম বিধ্বস্ত রানা প্লাজা

সাভারের জন্য এলাকার কিছু ছেলে পেলে হাজার কয়েক টাকা তুলেছে এলাকা থেকে। তারা বাসে করে আজ বিকেলে যাবে। তাদের সঙ্গে আমিও গেলাম। এদিকে জগন্নাথ কলেজ থেকে ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্র ফেডারেশনের একটা বড় সড় দল পিকাপ ভাড়া করে প্রায় একই সময়ে সাভারে রওনা দিলো। তাদের সাথে আছে অক্সিজেনআর ওষুধসহ প্রচুর দরকারী রসদ। তারা আমাকে তাদের সাথেই যেতে অনুরোধ করেছিলো, কিন্তু আমি আমার এলাকার ছোট ভাইদের সাথেই যেতে বেশী স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করলাম।

দুপুরে হঠাৎ তুফানের কারনে যাত্রা বিলম্বিত হলো। সাভারে জীবনে অসংখ্যবার গিয়েছি। আমার বাবা তার স্বল্প বেতনের চাকরীর কষ্টার্জিত পয়সায় পৃথিবীর বুকে প্রথম যে একটুকরো জমি কিনেন, সেটা ছিলো সাভারের জমি। আমার বড় মামাও সেখানে ঘর বাড়ি বানিয়ে বাস করছেন। কিন্তু এত পরিচিত এই সাভার, বাস থেকে হেমায়েতপুর নেমে যেন আর চিনতে পারি না। এক রিকশাওয়ালাকে জিগেস করলাম, সাভারে যাবেন? পাশ থেকে একজন তরুণী বল্লেন, “ভাইয়া রিকশা দিয়ে তো সাভারে যেতে পারবেন না। আপনাকে রাস্তার ওপাশ থেকে বাস বা টেম্পোতে চড়তে হবে!”

আধঘন্টা পর সাভারে নামলাম। হাজার হাজার মানুষ পায়ে হেটেঁ যাচ্ছে। সেই ভীড়ে আমরা মিশে গেলাম। পথে যেতে যেতে ছবি তুল্লাম। প্রায় ১৫ মিনিট টানা হাটার পর এনাম মেডিকেলের সাইনবোর্ড দেখলাম, তার মানে আমরা গন্তব্যস্তলে প্রায় হাজির!

310898_10151597449002220_1923297969_n

আমাদের পাশ দিয়ে একটার পর একটা এ্যাম্বুলেন্স আর লজিসটিকস নিয়ে ট্রাক আর মাইক্রোবাস যাচ্ছে, মিরপুরের বিখ্যাত রেষ্টুরেন্ট ‘প্রিন্স’কেও দেখলাম বিশাল এক পিকআপ করে পানির বোতল, ওষুধ, স্যালাইন, শুকনো খাবার আর অক্সিজেনের সিলিন্ডার নিয়ে আসছে। এই প্রিন্সের উত্থান হয়েছে আমার চোখের সামনে, এই দুর্দিনে এর পাশে এসে দাড়ানোতে ভালো লাগলো খুব!

321627_10151597016397220_1104702988_n

পুলিশ বাশেঁর ব্যারিকেড দিয়ে ৩০ মিটারের প্যারামিটার সেট করে রাখছে ধ্বসে পড়া রানা প্লাজার আশে পাশে। সেখান দিয়ে সেনাবাহিনী, বিজিবি, দমকল বাহিনী আর সাংবাদিক – এদের ছাড়া আর কাউকেই ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। মানুষজন ভীড় করে আছে প্যারামিটারের চারপাশ ঘিরে।

পুলিশী বেষ্টনী পেরোতেই দেখি গনজাগরন মঞ্চের ফিল্ড হাসপাতাল। তার সামনে ইমরান ভাইকে দেখলাম একজন কর্মীর সাথে দাড়িয়ে কথা বলছেন। 379794_10151597565867220_1698811557_nচারিদিকে সেনাবাহিনী আর ক্যাটারপিলারের ক্রেইন পার্ক করা। আমার কল্পনায় রানা প্লাজার অবস্থান ছিলো রাস্তার বাম পাশে। এখন দেখি ডান পাশে! আমরা বিএনসিসির বাচ্চা একটা ছেলেকে আমাদের কালেকটেড টাকাগুলো দিয়ে বল্লাম, কেউ যদি অক্সিজেন কিনতে বাইরে যায়, তাকে যেন এই টাকাগুলো দেয়া হয়। সে মাথা ঝাঁকিয়ে একদিকে ছুটলো, দেখলাম কিছু লোক পিকআপে করে অক্সিজেন সিলিন্ডার আনছে, ভরাগুলো ফেলে তারা খালিগুলা নিয়ে যাচ্ছে আবার। ছেলেটা গিয়ে টাকাগুলো তাদের দিলো।

532752_10151597185437220_1769271324_n

আমরা ধ্বসে পড়া ভবনের সামনে গিয়ে দাড়ালাম। বাতাসে পচাঁ লাশের তীব্র গন্ধ! সেইসাথে এয়ারফ্রেশনারের লেবুময় ঘ্রাণও  নাকে এসে লাগছিলো একটু পর পর। লাশ আর লেবুর গন্ধ মিলে অদ্ভুত এক গন্ধ পাচ্ছিলাম। একজন কর্ণেলকে জিজ্ঞেস করলাম – “শেষবার কখন জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে?” সে জানালো – “বিকেল তিনটায়। কিন্তু হাসপাতালে নেবার আগেই মারা গেছে। এক বোতল পানি খেয়েছিলো শুধু, তারপরই শেষ!” বুঝলাম, বের করা হয়েছিলো ঠিক জীবিত না, মূমুর্ষাবস্থায়।

532845_10151597437292220_2031427901_n

ভেতরে একটা ফোকঁড় থেকে ভন ভন করে মাছি ওড়ছিলো। (গোল দাগ চিহ্নিত)

পাশ থেকে একজন বল্ল- “এর ভেতরো নিশ্চয়ই লাশ রয়েছে। নাইলে মাছি আসতো না!” আমি উদাস চোখে আকাশে তাকালাম। আমার চোখজোড়া কি চিল খুজছিলো? নাকি শকুন? মানুষরূপী শকুন সোহেল রানার চাইতেও কি তারা বেশী লাশখাদক?

দমকল বাহিনীর একজন কর্মী গলায় ক্যামেরা ঝুলানো দেখে সাংবাদিক মনে করে আমাকে বল্লেন – “ভাই, অক্সিজেন নাই। আপনারা এইটা নিয়ে পেপারে লিখেন। এখনো অনেক লোক জীবিত। তাদের অক্সিজেন দরকার।” পাশে দাড়ানোঁ আরো দুয়েকজন কর্মীও তার কথায় সায় দিলো। আমি বল্লাম, “অক্সিজেন কেনার জন্য কিছু টাকা আমরা দিয়েছি একটু আগে। আরো অক্সিজেনের যাতে ব্যবস্থা হয়, আমরা সে চেষ্টা করছি।”

384488_10151596950077220_1062907239_n

পাশে তাকিয়ে দেখি ভবনের ৮টি ফ্লোরের ৮টি ছাদ যেখানে এসে আছড়ে পড়েছে এক এক করে – মাঝখানে বিভিন্ন মেঝের চিড়ে চ্যাপ্টা হওয়া আসবাবপত্র দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ন্যাশনার ক্যাডেট কোরের সদস্যদের সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে দেখা যাচ্ছে। হাই স্কুলে থাকাকালীন আমি নিজেও  বিএনসিসির একজন সদস্য ছিলাম বলে আজকের মতো অনেকবারই গর্ব হয়েছে!

আমি ভবনের ভেতরে ঢুকতে চাইলাম। কিন্তু শুধু একা আমাকেই ঢোকার অনুমতি দেয়া হলো। রানা প্লাজার পাশের ভবনটির একটি বেড রুমের দেয়াল সেনাবাহিনী ভেঙ্গে ফেলে উদ্ধার কাজ শুরু করার জন্য। ধ্বসে পড়া রানা প্লাজায় ঢোকার আপাতত: এটাই একমাত্র প্রবেশ দ্বার। আমি সেখান দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম।
486845_10151597205432220_795021965_n

ভিতরে ঢুকেই দেখি অক্সিজেনের পাইপ ঢুকিয়ে গোল হয়ে বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।

485534_10151597220742220_1577427704_nএকজন জানালেন, এই পাইপটা ঢোকাবার জন্য যথেষ্ট রাস্তা বের করতে এদের কালোঘাম ছুটে গেছে। একজন স্বেচ্ছাসেবক ইলেকট্রিক করাত দিয়ে ফ্লোরের ঢালাইয়ের রড কাটছেন। নীচতলা পর্যন্ত অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করতে মৃত্যু গহ্ববরে নামছেন দমকল বাহিনীর একজন উদ্ধার কর্মী! 164670_10151597000112220_1699778069_n
একটু পর দেখলাম সেখানে হন্তদন্ত হয়ে ঢুকলেন মুসা ইব্রাহিম। সত্যি বলতে কি, প্রথমে আমি তাকে খেয়ালই করি নাই। তাকে প্রথমে ভেবেছিলাম স্বেচ্ছাসেবকদের কেউ। পরে আমার ক্যামেরার স্ক্রিনে ছবির এক্সপোজার আর হোয়াইট ব্যালেন্স চেক করতে গিয়ে দেখি – আরে এ তো মুসা ইব্রাহীম!

936723_10151597264647220_1991767368_n
আমি এরপর তার আরেকটা ছবি তুলে অন্যদিকে হাটা দিলাম। গিয়ে দেখি, সেনাবাহিনী, দমকল আর বিজিপির যেৌথ উদ্ধার কর্মীদল কাজ করে যাচ্ছে। আলো জ্বালাতে ও ইলেকট্রিক করাত চালাতে জেনারেটর, অক্সিজেনের পাইপ আর অন্যান্য সরঞ্জাম মাটিতে পড়ে আছে দেখলাম। ধ্বসে পড়া রানা প্লাজার ৭ তলার ফ্লোরে এখনো পুরোদমে উদ্ধার কাজ চলছে। পর পর ছয়টি ফ্লোর খুড়েঁ সেখানে ম্যানুয়ালি এয়ার সার্কুলেশন করা হচ্ছে ভেতরের মানুষজনকে বাচিয়েঁ রাখতে। উদ্ধার কর্মীরা জানাচ্ছেন, ভেতরে এখনো প্রচুর জীবিত মানুষ রয়েছেন।  তাদের জন্য অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন মূল টার্গেট।

922876_10151597003552220_2047696933_n

ভেতরে প্রচন্ড গরম। বাতাসে আর্দ্রতার পরিমান অস্বাভাবিক রকমের বেশী। আমি ভিতরে মাত্র মিনিট দশেক ছিলাম, কিন্তু আমার মনে হয়েছে আমি যেন ছিলাম ১০ বছর। প্রচন্ডরকম মানসিক ও শারীরিক চাপ পড়ে এই খানে ঢুকলে, ভেতরের লোকগুলো এই দুই চাপ সহ্য করেই টিকে আছে এতক্ষন ধরে। ভেতরের তাপমাত্রা মনে হলো ৪৫-৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মাত্র ১০ মিনিটের ভেতর আমি লিটারেলি ঘামে গোসল দিয়ে উঠেছিলাম। আমার সারা গা থেকে দর দর করে ঘাম ঝরছিলো।

379839_10151596964422220_271772517_n

সেনাবাহিনী বাইরের কাউকে হাত লাগাতে দিচ্ছে না। আমি নিজে হাত লাগাতে গিয়ে তাদের কাছ থেকে ঝাড়ি খাইছি। আমাকে বলে, “ছবি তুলতে আসছেন, তুলে চলে যান। আমাদের কাজ আমাদের করতে দিন!” আমি আর কথা না বাড়িয়ে আরো কয়েকটা শট নিয়ে চুপচাপ চলে আসলাম। ছাদ থেকে ছবি নেবার ইচ্ছে ছিলো, কিন্তু সেখানে ঢুকতে দিলো না। আমি ভাবলাম, ঢের হয়েছে। সাংবাদিক না হয়েও, কোন আইডি কার্ড না দেখিয়েও এই পর্যন্ত যে আসতে পেরেছি, সেই অনেক!

376072_10151596957822220_277416085_n

এ্যাপ্রোন পরা অল্প বয়সী তরুন তরুনী ছুটাছুটি করছেন পুরো স্পট জুড়ে। আমি নীচে নামতেই খবর পেলাম, এইমাত্র ভেতর থেকে জীবিত একজন তার বাবার সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করেছে। সেটা নিয়ে উদ্ধার কর্মীদের ভেতর ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেলো। এর ভেতর আমাকে একজন একটা ভয়াবহ; চমকে ওঠার মতো খবর দিলো! জানি না কতটুকু সত্যি, তার ভাষ্যমতে, আজ ভোরের দিকে কয়েকজন পোষাক শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তারা নাকি দুটা লাশের পাশে অন্ধকারের ভেতর চুপচাপ বসে ছিলো। উদ্ধারকর্মীরা তাদের উপরে ওঠাতে গেলে তারা নাকি বলে যে তারা ভেতরেই ভালো আছে। বাইরে আসতে চায় না। এরপর উদ্ধারকারীরা তাদের জোর করে আনতে গেলে তারা উদ্ধারকর্মীদের দিকে তেড়ে আসে, খামচে দেয়, কেউ কেউ কামড়ও দেয়। তবু শেষ পর্যন্ত তাদেরকে উদ্ধার করা গেছে। এনাম মেডিলেকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেবার পর তাদেরকে শেরে বাংলা নগরের মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করানো হবে!

আমার টিমের সাথে ফিরছি। মনটা অসম্ভব খারাপ। এতদূর বয়ে আসলাম, অথচ কিছুই করতে পারলাম না। অবাক হয়ে দেখি, বাঙ্গালীর ব্যবসায়িক বুদ্ধির কোন তুলনা নাই। সাভারে ধ্বসে পড়া রানা প্লাজার অদূরেই একটা কফিনের দোকান খোলা হয়েছে। দোকানদার রেডিমেড ১০/১২টা কাঠের কফিন বানিয়ে দোকানের সামনে সাজিয়ে রেখেছে যেন চাহিবা মাত্রই পাওয়া যায়। বলা বাহুল্য, এখন তার ব্যবসা রমরমা। অথচ এইখানে এর আগে কোন কফিনের দোকান আমার চোখে পড়ে নাই।

164258_10151597351537220_378770109_n

এনাম মেডিকেলে যাবার ইচ্ছে ছিলো, কিন্তু আমি খুব দুর্বল চিত্তের মানুষ। রক্তাক্ত দৃশ্য বা রক্তপাত দেখতে পারি না। তাই, ক্লিনিক-হাসপাতাল এসব আমি পারতপক্ষে এড়িয়ে চলি। তাছাড়া শারীরিকভাবেও দুর্বল লাগছিলো খুব। জগন্নাথ কলেজের ছাত্রদের ভাড়া করা একটা খালি পিকআপে ফিরলাম সবাই মিলে। আসার সময় বার বার মনে হচ্ছিলো সোহেল রানা নামের এই শুয়োরটাকে হাজার বার ফাসিঁ হওয়া উচিত। প্রতিবারের ফাসিঁর যন্ত্রনা যেন আগেরটার চেয়ে বেশী হয়।

রাতের আধার কেটে শা শা করে ছুটে চল্ল পিকআপটা, বাংলাদেশের ইতিহাসের ভয়ংকরতম একটা ট্রাজিডিকে পেছনে ফেলে। অথচ আমি নাকে তখনো লাশের গন্ধ পাচ্ছিলাম বাতাসে!

Protected by Copyscape Duplicate Content Protection Tool

 

https://www.facebook.com/proloyhasan/posts/10151597687557220?__mref=message

স্বপ্নদুয়ারে রেজিষ্ট্রেশন না করেও আপনার ফেসবুক আইডি দিয়েই মন্তব্য করা যাবে। নীচের টিক চিহ্নটি উঠিয়ে কমেন্ট করলে এই পোষ্ট বা আপনার মন্তব্যটি ফেসবুকের কোথাও প্রকাশিত হবে না।

টি মন্তব্য