আমাদের ছোট ভাই ’আকিহা’

ডিসেম্বরের এইরকম এক শীতল দুপুরে আমার সবচাইতে ছোট ভাইটা বলতে গেলে আমার চোখের সামনে জন্ম নিয়েছে। ৯৭ সাল, আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি। আমি অপারেশন থিয়েটারের দরজায় দাড়াঁয় ছিলাম। দেখলাম টকটকে লাল একটা নরম তুলতুলে আকিহাকে ট্রে এর মধ্যে এনে রখলো নার্স। মাত্রই নাড়ি কাটা হয়েছে। সারা গায়ে থকথকে লিকুইড।

আকিহা আমাদের পরিবারে বড় হতে লাগলো। ওর হাসি, ওর ফোকঁলা দাতঁ, ওর নাক চোখ মুখ সবকিছু আমি রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে দেখতাম। সবচে ভালো লাগতো ওর ছোট্ট ছোট্ট হাত আর পায়ের আঙ্গুলগুলো। এত ছোট ছোট আঙ্গুল!! আমি ওর মুঠোর ভেতর আমার আঙ্গুল ঢোকালেই ও খপ করে সেটাকে আকড়েঁ ধরতো, আর ছাড়তেই চাইতো না।
আমরা দু ভাই রোজ নিয়ম করে স্কুল থেকে ফিরেই ওকে নিয়ে পরতাম।
ও প্রতিদিন ভোর বেলা ঘুম থেকে ওঠেই আব্বু আম্মুর বিছানা থেকে নেমে এক দৌঁড়ে চলে আসতো আমার ঘরে। ও লাফ দিয়ে খাটে উঠে আমাদের দু ভাইর মাঝখানে সটান শুয়ে পড়তো। তারপর আমার গলা জড়িয়ে ধরে ঘুম। এদিকে আমি সকালে ঘুম থেকে ওঠে দেখতাম আকিহা আমার গলাটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে।
আমার নিজের সন্তান এখনো হয় নাই, কিন্তু ঘুম থেকে উঠে নিজের সন্তান গলা জড়িয়ে আছে, একটা বাবার জন্য এই ফিলিংসটা কেমন এটা আমি জানি।
যে বার দেশের বাইরে চলে আসি, আমি ভিসা পাবার পর আম্মু আমাকে জড়িয়ে ধরে কাদঁছেন, তার দেখাদেখি আকিহাও হাউ মাউ করে কান্না। ৭ বছরের একটা বাচ্চা তার ভাইর বিরহে বেদনায় কাদঁছে!
আমার ফ্লাইটের দিন প্রচন্ড বৃষ্টি। সাথে তুফান। বাসার গেটে মাইক্রোবাস। আকিহা সারাদিন কিছু খায়নি। চুপচাপ শুয়ে ছিলো বিছানায়। আমি ভয়ে ওর সামনে যাচ্ছিলাম না, জানি গেলেই একটা সিনক্রিয়েট হবে! যখন আমার সুটকেস এক এক করে গাড়িতে তোলা হচ্ছিলো, আকিহা ঝুম বৃষ্টির মধ্যেই আমাদের বাসার দরজা ধরে চিৎকার করে কান্না। আমি কাছে গিয়ে ওকে কোলে তুলে বল্লাম – আমার সাথে এয়ার পোর্ট যাবি?
গাড়িতে বসে ওকে আমার কোলে তোলে চামচ দিয়ে ওর মুখে ভাত তুলে দিচ্ছিলাম। একটু পর বল্ল – ’চামচ দিয়ে খাবো না। তোমার হাত দিয়ে খাইয়ে দাও ভাইয়া।’ আমি চোখ মুছতে মুছতে হাত দিয়ে ভাত মাখাতে লাগলাম।
পেছন ফেরার সাহস আমার হয়নি, তবু আমি জানতাম চেক ইন করার পর ও এয়ারপোর্টের গ্লাসে দু হাত রেখে অনেকক্ষন দাড়িঁয়ে ছিলো।
সিডনী পৌছেঁ বাসায় কল দিয়ে প্রথমেই আকিহাকে চাইলাম, ওর গলা শোনার জন্য প্রানটা আনচান করছিলো। প্রবাসের একা একা জীবনটাতে আম্মু আর আকিহার জন্য সবচাইতে বেশী খারাপ লাগতো। নিজেকে কি ভয়ংকর অসহায় লাগতো বলে বোঝাতে পারবো না। ফোনে জিগেস করতাম – ’তোমার জন্য কি পাঠবো, বলো।’
বলতো, ’ভাইয়া, আমার জন্য একটা রোবট পাঠাও’। একটা লেগো সেট পাঠালাম, ট্রান্সফরমার। তার অভিমান তবু যায়না, কারণ তার সত্যিকার রোবট চাই। একদিন আমি ওর জন্য রোবট কিনতে বেরিয়েছিলাম। হোন্ডার আসিমো। বেশ কিছু টাকা জমালাম, কিন্তু সেবার কেনা হয়নি, আব্বুকে পাঠাতে হলো কলকাতায়, চিকিৎসার জন্য। আকিহার আসিমোর টাকাটা সেখানে গেলো।
আমি আহিকার ছবি Flickr এ আর ই-মেইলে দেখে মনিটরে হাত বোলাতাম আর চোখের পানি ফেলতাম, ফোনে কতবার কেঁদেছি দুই ভাই হিসাব নাই।
রূমমেটদের দেখতাম তারা ফি বছর দেশে যেতো বেড়াতে। আমি পারতাম না, কারণ প্লেটের যে ভাড়া সেটা দিয়ে আমার এক মাসের বাসা ভাড়া হয়ে যেতো। শপিং আর দেশে থাকার খরচ দিয়ে আমার সেমিষ্টার ফিয়ের অর্ধেক হয়ে যেতো। তাই ডিপ্লোমা আর গ্রাজুয়েশন করার পুরো সময়টাতেই দেশে যাবার সামর্থ্য আমার ছিলো না।
সাড়ে ৭ বছর পর দেশে ফিরে দেখি আমার পিচ্চি ২ ফুট ভাইটা লম্বায় আমাকেও ছাড়িয়ে গেছে। এমনকি প্রস্থেও। 😀
আকিহা অসম্ভব লক্ষী একটা ছেলে। নিজের ভাই বলে বলছি না, এই বয়সের একটা ছেলের পক্ষে যতটা লক্ষী হওয়া সম্ভব, ও তার চাইতেও অনেক বেশী লক্ষী, ভদ্র আর অমায়িক। সে আমাদের বাসার কাউকে কিছু বলার আগে জিজ্ঞেস করে নেয় – “তোমাকে একটা কথা বলবো, কিছু মনে করবে না তো?” অথবা -”তুমি যদি প্লিজ কিছু মনে না করো, তাহলে কি ঐ কাজটা আমার জন্য করে দিতে পারবে?” আমি কোনদিন এর ব্যতয় হতে দেখিনি। আমি খুব এনজয় করি ওর এই কেতাবি ভদ্রতা। :v
আকিহা ক্রিকেটের একনিষ্ঠ ভক্ত। ক্রিকেটের হেন বিষয় নেই যা তার নখদর্পনে নেই। বিভিন্ন ম্যাচের চুলচেরা বিশ্লেষন সে করতে পারে। আমার কাছে তাকে মুটামুটি ক্রিকেটবোদ্ধা মনে হয়। আমি তার কাছ থেকেই ক্রিকেট দুনিয়ার দুটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় শিখেছিলাম।
১) Ashes Test Match (এটার যে এত চমৎকার একটা ইতিহাস আছে তা অনেক ক্রিকেট বোদ্ধারাও হয়তো জানেন না।)
২) টেষ্ট ম্যাচের ফলো অন পদ্ধতি।
সে আমার মতই বই পোকা হয়েছে। বই পেলে তার আর কিছু লাগে না। তার প্রিয় লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যার। সে দু বছর আগে লেখালেখিতেও হাত দিয়েছে। ইতিমধ্যেই সে দুটো কঠিন সায়েন্স ফিকশান লিখে ফেলেছে। আমি তার প্রতিভায় মুগ্ধ! এই না হলে আমার ভাই! B-)
সাত বছরে আকিহার সাথে আমি থাকতে পারিনি, নিজের হাতে ভাত মাখিয়ে খাওয়াতে পারিনি, ওর সাথে বসে Gta 5 – Grand Theft Auto V খেলতে পারিনি, (ছোটবেলায় এইটা ছিলো ওর সবচাইতে প্রিয় গেইম। ও কম্পিউটার চালানো শেখার আগে এই গেমটা চালানো শেখে!), একসাথে সাইকেল চালাতে পারিনি। ছেলেটা আমার চোখের আড়ালে এতটা বড় হয়ে গেছে, আমি সেটা নিজের চোখে দেখতেও পারিনি। আমার এই আফসোস জীবনে কোনদিন যাবে না।
আমি এখনো সেই পিচ্চি আকিহাটাকে মিস করি। আমার খুব ফিরে যেতে ইচ্ছে করে সেই সময়টাতে। আমি পিচ্চি আকিটাকে মিস করি, আমার নিজের সন্তানও সেই অতৃপ্তি পূরণ করতে পারবে কিনা জানি না।
২০০৮ এর সেপ্টেম্বর মাসে আকিহার এই ছবিটি তুলেছে আমাদের মেঝো ভাই GD Abir.
(এই লেখাটি কিছুদিন আগে চূড়ার পোষ্টে কমেন্ট আকারে লিখেছিলাম। আজ এটার পূর্ণাঙ্গরূপ দিয়ে নিজের ওয়ালে দিলাম।)

স্বপ্নদুয়ারে রেজিষ্ট্রেশন না করেও আপনার ফেসবুক আইডি দিয়েই মন্তব্য করা যাবে। নীচের টিক চিহ্নটি উঠিয়ে কমেন্ট করলে এই পোষ্ট বা আপনার মন্তব্যটি ফেসবুকের কোথাও প্রকাশিত হবে না।

টি মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *