আমাদের অফিসের বুয়া কাহিনীঃ দুটি সুখ-দুঃখের গল্প

images (1)

দুপুরের দিকে অফিসে গিয়ে দেখি অফিসের সবচেয়ে জুনিয়র প্রোগ্রামার ছেলেটা কিচেনে রান্নার যোগাড় যন্ত্র করছে। তাকে জিগেস করলাম, ঘটনা কি? সে বল্ল – বুয়া আসে নাই। কয়েক বার বুয়ার মোবাইলে কল করে ও তাকে পাওয়া যায় নাই। এই কারনে নিজেরাই রাধঁতে বসে গেছে।  আমার মেজাজ খিচড়ে গেলো! বুয়াটা আমাকে একটাবার জানাবে না?!! আমি ফোন দিলাম, ৫/৬ বার রিং হবার পর ফোন ধরলেন বুয়া সাহেবা।

– আপনি আজকে আসেন নাই কেন? আর আজকে যে আসবেন না, সেটা আমাকে সকালে বলে দিবেন না? তাহলে আমি লাঞ্চ বাইরে থেকে আনিয়ে রাখতাম। 
– ভাই, সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারি নাই। এই লিগা আসতে পারি নাই।
– ’ঘুম থেকে উঠতে পারেন নাই কেন? শরীর খারাপ নাকি?’ – আমার কন্ঠ এবার নরম হলো। আহারে বেচারী, শরীর খারাপ তাই হয়তো আসতে পারে নাই! 🙁 কিন্তু এরপর সে যা বল্ল সেটার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না!
– না ভাইজান, শরীর খারাপ না। কাইল রাইতে ফাটিত্ গেছিলাম..
– ’কই গেছিলেন!! পার্টিতে?!!’ – আমি রীতিমতো আকাশ থেকে পড়লাম। ‘কিসের পার্টি?’
– ’নি ইয়ারের ফাটিত্ ভাইজান। ঐ যে পটকা ফুটাইলো, গান-বাজনা হইলো, আমাগো বিল্ডিংয়ের সবাই গেছিলো ভাইজান…আমিও গেছিলাম আমার দুই মাইয়া নিয়া…বাসায় ফিরতে রাইত হইয়া গেছিলো…সকালে আর উঠতে পারি নাই ভাইজান, আপনার ফুনের আওয়াজে ঘুম ভাঙ্গলো…’
– আমি মুটামুটি বাকরুদ্ধ!
– বিয়ালে আইমু ভাইজান? আইয়া থালাবাসন ধুইয়া যামুনে…
– কোনমতে বল্লাম – আচ্ছা, এসো…
– ভাইজান, আরেকখান কতা, আমি তো রান্ধি বাড়ি নাই আইজকা, আমার লিগা যদি এক বাটি ভাত আর তরকারী রাকতারেন…সকাল তে কিছু খাই নাই ভাইজান…

images

আমি চেষ্টা করলাম কিছু বলতে। কিন্তু অবাক হয়ে খেয়াল করলাম আমার গলা দিয়ে কোন আওয়াজ বের হচ্ছে না। আমি ফোন রেখে দিলাম।

জুনিয়র ছেলেটা কিচেন থেকে হাত মুছতে মুছতে আমাকে এসে জিগেস করলো – কি বল্ল বুয়া? আসলো না কেন?
আমি তার দিকে উদাস চোখে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বল্লাম – ’নিউ ইয়ারের পার্টিতে গিয়েছিলো। ফিরতে রাত হয়েছে, সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারে নাই। তাই আজ আসতে পারে নাই।’

ছেলেটা বিরক্ত হয়ে বল্ল – ‘প্রলয় ভাই, ফাইজলামি কইরেন না। কাচাঁ মরিচ কাটছি এক গাদা, হাত জ্বলতেছে। এখন এই হাত নিয়ে কেমনে কোড লিখবো? আর আপনি ফান করতেছেন!’ আমি বল্লাম – ‘ফান করতেছি না। বুয়া এইটাই বল্ল আমাকে ফোনে। খোদার কসম।’

আমি দেখলাম ছেলেটার চোয়াল ঝুলে পড়লো। সে কিছু বলার আগেই আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বল্লাম – ’শুধু তাই না, তোমাকে খাবার রাখতে বলেছে তার জন্য। তার বাসায় রান্না হয় নাই। সে আজ তোমার রান্না খাবে। খেয়ে থালা বাসন ধুয়ে যাবে।” :/

দুপুরের দিকে অফিসে গিয়ে দেখি অফিসের সবচেয়ে জুনিয়র প্রোগ্রামার ছেলেটা কিচেনে রান্নার যোগাড় যন্ত্র করছে। তাকে জিগেস করলাম,…

Posted by Proloy Hasan on Thursday, January 1, 2015

               

       এবার খুব দুঃখের একটা ঘটনা বলি। এইটাও আমাদের অফিসের  বুয়াকে নিয়ে। কিন্তু তার আগে কিছু প্রারম্ভিকাঃ

বেশ কয়েক বছরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পর আজ একজন বন্ধুর সাথে কথা হলো ফেসবুকে। আমরা একসাথে অনেকটা সময় কাটিয়েছি প্রবাসে। সেদিন হঠাৎই ওকে খুজেঁ পেলাম ফেসবুকে। কথা প্রসংগে জানালো – আংকেল; মানে ওর বাবা প্রায়ই আমার কথা জিজ্ঞেস করেন। আমি বল্লাম – ’আংকেলকে আমার সালাম দিও।’ ও বল্ল – ’বাবা মারা গেছেন আড়াই বছর হলো!’ শুনে কিছুক্ষনের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। মনে পড়লো আংকেলের সাথে আমার ছোট্ট ঘটনাবহুল স্মৃতি….

অষ্ট্রেলিয়া চলে আসার কয়েক মাস আগে, একদিন বিকেলে আমাদের মিরপুরের মসজিদ থেকে আছরের নামায পড়ে বের হচ্ছি, এমন সময় দেখি একজন বৃদ্ধ মানুষ মসজিদের বারান্দায় বেকায়দায় পড়ে আছেন। আমি প্রায় ছুটে গেলাম। তাকেঁ টেনে তুল্লাম। অনেক বছর আগের ঘটনা, যতদূর মনে পড়ে, তারঁ পায়ের রগে টান লেগেছিলো বা এমন কিছু। যা হোক, তিনি আর কিছুতেই হাটঁতে পারছিলেন না। আমি রিকশা নিয়ে আসলাম তারঁ জন্য। মসজিদ থেকে রিকশার স্ট্যান্ড ছিলো বেশ খানিকটা দূরে। তাকেঁ আমি রিকশায় তুলে আমিও তারঁ পাশে চড়ে বসলাম। তাকেঁ একদম বাসায় পৌছেঁ দিয়ে তবেই বাসায় ফিরলাম আমি। পথিমধ্যে তিনি আমার এ ব্যবহারে যে যারপরনাই খুশী হয়েছেন, সেটা জানাতে ভুল্লেন না।

সেই সূত্রে তার ছোট ছেলে আরিফের সাথে পরিচয়। আমার দু বছর পর ও অষ্ট্রেলিয়া আসলো। দেখা হবার পর জানালো, আংকেল নাকি এখনো আমার কথা মনে করে, তাকেঁ দেয়া আমার সেই ছোট্ট ও খুবই গুরুত্বহীন সেবাটুকু স্মরণ করে আমার কথা জিগেস করে। আমি ভীষন লজ্জা পেয়ে যাই।

images (2)

 

প্রারম্ভিকা শেষ। এবার বুয়ার হৃদয়বিদারক গল্পটা শুরু করা যাক।

আরিফের সাথে আজ যখন কথা বলছিলাম, তখন আমাদের অফিসের লিড প্রোগ্রামার শাকিল ভাই জিগেস করলেন, মন খারাপ কেন? বল্লাম, বন্ধুর বাবা মারা যাবার সংবাদে মন খারাপ। আমি তাকেঁ পুরো ঘটনাটা বল্লাম। তিনি বল্লেন, তাহলে শোনা আমাদের প্রাক্তন বুয়ার কাহিনী। 

আমাদের অফিস যখন আগের ঠিকানায় ছিলো, সেখানে একজন পৌঢ়া মহিলা ছিলেন অফিস পরিচারিকা। রান্না বান্না বাদে সব কাজই করতেন তিনি। বিশেষ করে ধোয়া পাকলির কাজ। কয়েক মাস পর সিদ্ধান্ত নেয়া হলো, অফিস স্পেস বাড়ানো হবে এবং এই কারনে সেই দালানেরই ৭ তলায় অপিস মুভ করা হবে। কিন্তু বুয়া বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ। তার পক্ষে সপ্তাহে ৬ দিন এত উপরে উঠা নামা করা কষ্টকর হবে বিধায় তাকে শাকিল ভাইরা জানিয়ে দিলেন, বুয়া চাইলে অন্য কোথাও কাজ খুজতেঁ পারে। বুয়া প্রায় কেদেঁ দিলেন। জানালেন, এই অফিসে কাজ করেই তার সংসার চলে। সংসারে সে আর তার এক নাতনী। ৭ তলায় উঠতে নামতে তার কোন সমস্যা হবে না। তবু সে অন্য কোথাও কাজ করার ভাবতেও পারবেন না।

যা হোক, বুয়া ৭ তলায় কাজ শুরু করার কিছুদিনের মাথাতেই যথারীতি আরো অসুস্থ্য হয়ে গেলেন। সে সময় শীতকাল। ঠান্ডা লেগে তার নিউমোনিয়া হয়ে গেলো। তারপরও সে নিয়মিত কাজে আসতো। এই অবস্থা দেখে অফিস থেকে কিছু টাকা এডভান্স দিয়ে ও ওষুধপত্র কিনে দিয়ে তাকেঁ মুটামুটি বাধ্য করা হলো কয়েকদিনের ছুটি নিতে। কেননা, সে কিছুতেই ছুটি নিতে চাচ্ছিলো না। কারন, বুয়ার আশংকা ছিলো, তাকেঁ ছুটিতে পাঠিয়ে হয়তো অন্য কোন বুয়াকে কাজে নিয়োগ দেওয়া হবে। এই কারনে, যেদিন সে চলে যায়, সেদিন শাকিল ভাইর সাথে তার নিন্মক্ত কথা হয়ঃ

– বুয়া, আপনি কিছুদিন ছুটি নিন। আপনাকে টাকা দিলাম। যা ইচ্ছা হয় কিনে খাবেন। আর যে ওষুধগুলা দিলাম, সেগুলো ঠিকমতো খাবেন।

– বাবা, আমার ছুটির দরকার নাই…

– আপনার ছুটির দরকার আছে। যেটা বলতেছি সেটা শুনেন। এই শরীর নিয়ে অফিসে আসলে আপনি আরো অসুস্থ্য হয়ে যাবেন।

– আচ্ছা ঠিকাছে বাবা, আমি যাইতেছি। কিন্তু তোমরা অন্য কাউরে কাজ দিয়ো না বাবা। আমি ছুটি থিকা আইসা তোমাগো অফিসেই কাজ করতে চাই বাবা।

– না অন্য কাউকে নেয়া হবে না। আপনিই এখানে কাজ করবেন।

– বাবা, সত্যি কইরা কইতাছো তো?

– হ্যাঁ সত্যি করে বলছি। আপনি নিশ্চিন্ত মনে বাসায় যান।

শাকিল ভাইর রূম থেকে বের হবার পর, সে কিছু টুকটাক কাজ করে অফিস থেকে বের হবার পর আবার সে শাকিল ভাইর রূমে আসলো।

– বাবা, তোমারা অন্য কোন বুয়ারে কাম দিয়ো না কিন্তু। আমি দুয়েকদিনের বেশী ছুটি নিমু না বাবা। একটু সুস্থ্য হইলেই ফিরা আসমু বাবা।

– আহ বল্লাম তো! আপনি নিশ্চিন্তে থাকেন, আমরা আপনার কাজগুলো কোনমতে চালিয়ে নিবো। আপনি ফিরে এসে আবার আগের মতই জয়েন করবেন। ছুটির জন্য আপনার কোন বেতনও কাটা যাবে না।

বুয়া মুটামুটি আশ্বস্ত হয়ে অফিস থেকে বের হয়ে গেলো। এরপর প্রায় ১৫ দিন তার কোন খোজঁ নেই। এদিকে বুয়ার কোন মোবাইল নাম্বার বা বাসার ঠিকানাও অফিসে দেয়া হয়নি। শাকিল ভাই মনে করেছিলেন, সামান্য ঠান্ডা তো, দ্রুতই সুস্থ্য হয়ে উঠবেন। কিন্তু ১ সপ্তাহ যাবার পরই টেনশন শুরু হলো। কিন্তু ২ সপ্তাহ যাবার পর তারা ভাবলেন, বুয়া হয়তো অন্য কোথাও কাজ নিয়েছে বা কোন কারনে তাদের না জানিয়ে গ্রামের বাড়ী চলে গেছে। অফিসের কাজের চাপে এইটা নিয়ে আর মাথা ঘামানোর সুযোগ তারা পায়নি।

১৫ দিন পর বুয়ার নাতনী অফিসে এসে জানালো, বুয়া মারা গেছেন।

সেদিন তাদের মন এতটাই খারাপ ছিলো যে, কোন কাজই হয়নি অফিসে। বস রনি ভাই বল্লেন, ধুর ভাল্লাগতেছে না, অফিস বন্ধ করে বাসায় যাইগা। *ালের অফিস করতে আর ভাল্লাগে না। কিন্তু পেটের তাগিদে অপিস বন্ধ হয়তো করতে পারেন নি। কিন্তু অফিসে সেদিন কোন কাজ হয়নি। সবাই চুপচাপ অপিস শেষ করে বাসায় চলে গিয়েছে।

বলতে বলতে শাকিল ভাইর চোখ টলমল করে উঠলো। বল্লেন – “প্রলয়, বুয়ার শেষ কথাগুলো এখনো কানে বাজে।”

এরপর থেকে আজ পর্যন্ত বুয়ার পদে সত্যি সত্যিই আর কাউকে নেয়া হয়নি। বুয়াকে দেয়া কথা শাকিল ভাইরা রেখেছে।

বেশ কয়েক বছরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পর আজ একজন বন্ধুর সাথে কথা হলো ফেসবুকে। আমরা একসাথে অনেকটা সময় কাটিয়েছি প্রবাসে। …

Posted by Proloy Hasan on Saturday, August 22, 2015

ইলাসট্রেশনঃ গুগল

স্বপ্নদুয়ারে রেজিষ্ট্রেশন না করেও আপনার ফেসবুক আইডি দিয়েই মন্তব্য করা যাবে। নীচের টিক চিহ্নটি উঠিয়ে কমেন্ট করলে এই পোষ্ট বা আপনার মন্তব্যটি ফেসবুকের কোথাও প্রকাশিত হবে না।

টি মন্তব্য