আমরা যে ভাগ্য নিয়ে জন্মেছি, আগামী প্রজন্ম সে ভাগ্য নিয়ে আসবে না!

msm

ছোটবেলায় আমি ভাবতাম, মামা-খালাদের ভালবাসা পাওয়াটাই বুঝি স্বভাবজাতঃ নিয়তি। কিন্তু বড় হয়ে বুঝলাম, অনেকেই তা পান না। বিশেষ করে, আমার ধারনা, আমাদের আগামী প্রজন্ম মামা-খালার আদর থেকে পুরোপুরিভাবে বঞ্চিত হবে। মামার আদর আর খালার ভালাবাসা কি জিনিস, সেটা তারা শুধু তাদের পূর্বসূরীদের কাছ থেকেই শুনবে বা বইতে পড়বে বা কম্পিউটারের স্ক্রীনে দেখবে। কিন্তু নিজেরা কখনো সেটা উপলদ্ধি করবে না। এই আদর-ভালবাসা পেতে কেমন লাগে, কেমন সুখ অনূভূত হয় তারা তা কখনই বুঝবে না।

কেন আমার এই ধারনা হলো সেটা বলছি। আমার বন্ধুমহল, আত্নীয় মহল এবং সর্বোপরী আমার ফেসবুক ফ্রেন্ডলিষ্টে নিদেনপক্ষে কয়েক ডজন মেয়ে আছেন, যারা তাদের বাবা-মার একমাত্র সন্তান। প্লিজ নোট, একমাত্র মেয়ে বলিনি। বলেছি একমাত্র সন্তান। মানে তাদের কোন ভাইও নেই। বোনও নেই। তাই সেইসব মেয়েদের সন্তানদের জন্য আমি মুটামুটি আতঙ্কগ্রস্থ। কারন আমার ধারনা, মামার আদর ছাড়া, খালার ভালবাসা ছাড়া জীবনটা আসলে অর্থহীন। এরা একটা প্রায় অর্থহীন জীবন নিয়ে বড় হবে।

আমি এ বেলায় আমার মামা-খালাদের নিয়ে কিছু টুকরো টুকরো স্মুতিকথা সেই প্রজন্মের জন্য উৎসর্গ করে যাচ্ছি। তারা নিজেরা না পাক, অন্যের স্মৃতিকথা থেকে সেসব খানিকটা হলেও বুঝতে পারুক।

লেখাটি অনেক বড়। যাদের ধৈয্য বা সময় কম, তারা স্কিপ করে একদম নীচের প্যারায় চলে যেতে পারেন।

ছোটবেলায় আমি বড় হয়েছি নানা বাড়ীতে। মামা-খালাদের অপত্য স্নেহে। উপরি হিসাবে ছিলো নানুর আদর। (যেটা এখনও প্রতিটি ঘন্টায় পাই।) আম্মু ছোটবেলায় আমাকে সময় দিতে পারতেন না তেমন। কারন আম্মু তখন কলেজের ছাত্রী। আম্মুর অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছিলো ঠিকই, কিন্তু পড়াশোনা ছাড়েন নি। পলিটিক্যাল সাইন্সে অনার্স মাষ্টার্স করা আম্মুর জোরে জোরে না পড়লে পড়া মুখস্ত হতো না। তারঁ সেই পড়ার সুবাদে ক্লাস ওয়ানে থাকতেই বিখ্যাত দার্শনিক ও পলিটিক্যাল সাইন্সের জনক এরিষ্টটল আর প্লেটোর নাম শুনে শুনে কান পচেঁ গেছিলো। আম্মু তারঁ বান্ধবীদের কাছ থেকে নোট এনে সারা রাত পড়ার টেবিলে বসে গুন গুন করে পড়তেন। আমরা দু ভাই মশারীর ভেতর বিছানায় শুয়ে শুয়ে তারঁ গুনগুন শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তাম। আম্মু রেজাল্টও খারাপ করেন নি। অনার্স আর মাষ্টার্স দুটোতেই সেকেন্ড ক্লাস।

খুব ছোটবেলায় আম্মুর মূল কাজ ছিলো শুধু আমাকে ব্রেষ্ট ফিডিং করানো। তারপর ন্যাপি বদলে দেয়া থেকে শুরু করে আমাকে গোসল করোনো, খেলাধুলা করানো, কোলে নিয়ে ঘুম পাড়ানো – এসবের পুরোটাই আমার তিন মামা আর দু খালারা ভাগাভাগি করে করতেন। তারাঁ আমাদের দু ভাইকে আক্ষরিক অর্থেই নিজের সন্তানের মতো কোলে পিঠে করে মানুষ করেছেন। তাদেরঁ সরাসরি সান্নিধ্যে ছিলাম টানা ২২ বছর। এই বাইশ বছরে কোনদিনও মনে হয়নি আমার আদর যত্নের কোন রকম কমতি হচ্ছে বরং বড় হবার পরও ছোটবেলার মতই আদর পেতাম তাঁদের কাছ থেকে। আমার ছোটবেলার সমস্ত স্মৃতি তাই আমার নানু বাড়ীকে ঘিরে। আমার মামা আর খালাদের ঘিরে।

মামাদের আদর ছিলো আমার কাছে রূপকথার মতো। আমার বয়স যখন ৩ বছর তখন আমি পাশের বাসায় টিভি দেখতে যেতাম। একদিন আমি টুলের উপর দাড়িঁয়ে টিভি দেখছি, বাসার ছোট ছেলেটা আমাকে দেখে জানালার পর্দা নামিয়ে দিলো যাতে আমি না দেখতে পাই। আমি চিৎকার করে কান্না শুরু করে দিলাম। তাই দেখে মামা সেদিন বিকেলেই একটা ঝকঝকে নতুন সিটিজেন ১৪ ইঞ্চি সাদাকালো টিভি কিনে আনলেন। মামা তখন একটা গার্মেন্সের ম্যানেজার। বেতনও যে খুব ভালো তা না। কিন্তু বড় ভাগ্নের জন্য এতগুলো টাকা দিয়ে হুট করে একটা টিভি কেনার মতো বিলাসীতা করতে তিনি দুবার ভাবেন নি। বলছি ২৫/২৬ বছর আগের কথা। তখন ঢাকা শহরে টিভিওয়ালা পরিবার মনে হয় হাতের আঙ্গুল দিয়ে গোনা যেতো।

শরীর একটু খারাপ হলেই মেঝ মামা। তিনি আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতেন, ওষুধ কিনে দিতেন। মেঝমামার একটা ছোটখাট কাপড়ের দোকান ছিলো স্থানীয় মার্কেটে। সে রাতে বাসায় আসার আগে পাঙ্গাস মাছ কিনে আনতেন। ছোটবেলা থেকেই লেবু আমার ভীষন প্রিয়। তিনি হালি হালি লেবু কিনে আনতেন আমার জন্য। আমার মুসলমানির পর মেঝমামা কি কান্ডটাই না করলেন! এমন আয়োজন করলেন লোকে ভাবলো বুঝি বিয়ের উৎসব। রীতিমতো কার্ড ছাপিয়ে ছাদে প্যান্ডেল করে শ খানেক লোককে দাওয়াত করে খাওয়ালেন। আমাকে সারপ্রাইজ দেবার জন্য পাশের এলাকা থেকে ভিসিআর ভাড়া করে এনে ব্রুস লির মুভি দেখালেন। আহারে স্মৃতি!

ছোট মামা আমাকে নিয়ে প্রতি বছর বই মেলায় নিয়ে যেতেন। হাটঁতে হাটঁতে যখন পা ব্যথা করতো, মামা তখন আমাকে কাধেঁ তুলে নিতেন। ক্লাস ফাইভে থাকতে তার কাছেই প্রথম সাইকেল চালানো শিখেছিলাম। মামা পেছনে বসে থাকতেন, আমি সামনের সিটে বসে চালাতাম। মামা কোন এক ফাকেঁ সাইকেল থেকে নেমে গেলেন টেরও পেলাম না। মামা পেছনে বসে থাকলে মনে সাহস পেতাম। ভাবতাম, মামা যেহেতু সাথে আছে। পড়ে যাবো না। পড়লেও মামা ধরে ফেলবেন। কিন্তু যখন বুঝলাম মামা আমাকে নিজে চালাতে শেখানোর জন্য নেমে গেছে, সাথে সাথে সাইকেল নিয়ে আছড়েঁ পড়লাম। হাত পা ছিলে ডালে খোচাঁ খেয়ে রক্তারক্তি অবস্থা! মামার সেই ভাগ্নে কয়েক বছর পর মোটর সাইকেল চালানোও শিখে। ছোটমামা যদি সাইকেল চালানো না শিখাতেন, তাহলে হয়তো আমি কোনদিনও মোটর সাইকেল চালাতে পারতাম না।

বড় খালার আদরও ছিলো রূপকথার মতই। প্রতিরাতে, হ্যাঁ প্রতি রাতে সে আমাদের দুইভাইকে রুপকথার গল্প বলে ঘুম পাড়াতো। সারাদিন বাসার কাজ করে সে এমনতেই ক্লান্ত, কিন্তু আমরা সেটা বুঝতে চাইতাম না। তাকে গল্প বলিয়েই ছাড়তাম। গল্প বলতে বলতে সে ঘুমিয়ে পড়লে আমি তাকে ডেকে তুলতাম। তারপর আবার গল্প শুরু হতো, একটু পর আবার বড় খালা ঘুমে তলিয়ে যেতেন। ততক্ষনে আমরাও হয়তো ঘুমিয়ে যেতাম। না গেলে আবার তাকে ডেকে তুলতাম। গল্প বলে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে রাত একটা দুটো বেজে যেতো। অথচ খুব সকালে ঢাবিতে আন্টির ক্লাস ক্লাস ছিলো। বড় খালা ঢাবি থেকে ইসলামিক হিস্ট্রতে অর্ণাস মাষ্টার্স করেছিলেন।

ছোটখালার সাথে আমার বয়সের ব্যবধান বেশী না থাকায় তার প্রায় সব বান্ধবীরা আমাকে মনে করতো খালার ছোটভাই। খালার বান্ধবীরা আমাকে এখনো আদর করে ছোট ভাই বলে ডাকে। ত্রিশের কাছাকাছি পৌছানোঁ একটা মানুষকে ত্রিশ পার করা একটা মেয়ের জন্য “বাবা” বলে ডাকাটা মনে হয় খুবিই ডিগ্রেডিং। তাই প্রথম প্রথম তাদেরকে শুধরে দিতাম। এরপর আর দিইনি।

ছোটখালা যখন হোম ইকোনমিক্স কলেজে পড়েন তখন আমি ক্লাস নাইনে। কলেজ পড়ুয়া ছোট খালার প্রেমর স্বাক্ষীও আমি। তার কাছে চিঠি আসতো, সেই চিঠির উত্তর আমাকে লিখে দিতে হতো। কারন ছোটখালা একদিন লুকিয়ে লুকিয়ে আমার ডায়রি পড়ে আবিস্কার করেছে যে আমার লেখার হাত নাকি ভালো। এই কারনে সেই হাতটাকে সে তার কাজে লাগাতো। আনন্দ নামে একটা ছেলের সাথে খালা প্রেম করতো। ছেলেটা দেখতে কালো, কিন্তু চেহারা বেশ কাটাকাটা। আর লিখতো দুর্দান্ত। খোজঁ নিয়ে জানলাম, জনকন্ঠের সাহিত্য পাতায় নিয়মিত লেখালেখি করে। খালা নাকি তার লেখা পড়েই প্রেমে পড়েছে! খালা আমার কাছ থেকে ঈদের সালামি ধার করে আর নিজের টাকা জমিয়ে স্থানীয় একটা প্রেস থেকে কয়েক রিম কাগজ কিনে সেগুলো এক সাথে জোড়া লাগিয়ে প্রায় ৫ হাজার বার লিখলো – ”আনন্দ, তোমায় ভালবাসি।” আহারে প্রেম! তাদের কখনো কোনদিন ডেটিং হয়নি। একবার নীলক্ষেতের এক রেস্টুরেন্টে খালার সব বান্ধবীরা মিলে গেট টুগেদার করেছিলো, ঐ দিন নাকি সে এসেছিলো। তারপর আর কেনাদিন সামনা সামনি তাদের দেখা হয় নাই। চিঠি নিয়ে আমি স্বশরীরে তার বাসায় যেতমা। ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দিতাম। আমার সাথেই তার দেখা হয়েছে খালার চাইতে অনেক বেশী। লোকটা প্রচুর স্মোক করতো। সে সময় স্মোকারদের আমি পছন্দ করতাম না।

 কিন্তু কিভাবে কিভাবে যেন তাদের ব্রেকাপ হয়ে যায়। আমি জানি না, কারন খালা আমাকে এ ব্যাপারে কখনই কিছু বলে নি। শুধু এটুকু জানি, হঠাৎ সে গ্রামের বাড়ি চলে গেলো। কাউকে কিছু না বলেই। বরিশালের ছেলেদের কত রকম বদনাম শুনলাম তখন! খোজঁ নিলাম, রাজনৈতিক কারন। সে বাম করতো। কি যেন একটা রাজনৈতিক ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছিলো বেচারা। তারপর শত্রুতামি করে মামলা। ওয়ারেন্ট বের হলো। সেটা থেকে বাচঁতে গ্রামে গিয়ে গা ঢাকা দিয়েছিলো। তারপর আর খবর জানি না। খালা তো রাত দিন কাদতেঁ লাগলেন। খালাকে সেই অবস্থা থেকে বাচাঁলেন তারই স্কুল জীবনের বন্ধু যে কিনা এখন আমার খালু! আমি আমার কাজিন রিহানের পাকামো নিয়ে মাঝে মাঝে যে স্ট্যাটাস দেই, এই রিহান আমার সেই ছোটখালার ছেলে।

আমার বড় মামার এখন চুলে পাক ধরেছে, তার তিন ছেলে। বড় ছেলে কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। সাভারে তার বিশাল বাড়ী। সাভার মার্কেটে সবচেয়ে বড় জুতার দোকান তার। আশুলিয়াতেও জমি কিনেছেন। মেঝ আর ছোটমামা দুজনেই ইতালি থাকেন নিজেদের বউ বাচ্চা নিয়ে। সেখানে নিজেরা স্থায়ী হয়েছেন। নিজেদের ব্যবসা হয়েছে। দেশে জমি কিনেছেন, ফ্ল্যাট কিনেছেন, বাড়ী করেছেন। লেখাপড়ার গন্ডি আমার মামারা কেউই কলেজ পেরুতে পারেন নি, বিক্রম পুরের ছেলেদের যা হয় আর কি! কিন্তু এক একজন বিজনেস ম্যাগনেট হয়ে গেছেন! আর আমার বড় খালা ক্যান্টমেন্টে থাকেন। খালু আদমজী স্কুলের সিনিয়র টিচার। তাদেরও প্রেমের বিয়ে। মজার ব্যাপার, তাদেরও একটা মাত্র সন্তান। একটা মাত্র মেয়ে। ও পড়ে ক্লাস নাইনে। ছোটখালা আমাদের বাড়ীর কয়েকটা পরেই থাকেন।

 আমি, আমার ছোটভাই, আব্বু এবং আম্মু – আমরা সবাই তাদের কাছে আজীবনই ঋনী হয়ে থাকবো। আমার মামা-খালাদের ঋন শোধ করা তো দূরের কথা, সেই চেষ্টা করার ধৃষ্টতাও আমার নাই। মামা খালাদের নিয়ে স্মৃতি লিখে আসলে শেষ করা সম্ভব নয়। শুধু তাদেরকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরন করাই সম্ভব। আমি ভাবতাম, মামা-খালাদের ভালবাসা পাওয়াটাই নিয়তি। কিন্তু বড় হয়ে বুঝলাম, অনেকেই তা পান না। বিশেষ করে, আমাদের ভবিৎষত প্রজন্মের একটা বড় অংশ যে পাবে না, সেটা তো হলফ করেই বল্লাম। সেদিন দিয়ে চিন্তা করলে বলবো, আমি অত্যন্ত ভাগ্য নিয়ে জন্মেছিলাম যে আমি অসাধারন ৩ জন মামা আর ২ জন খালা পেয়েছিলাম।

ছবি সৌজন্যে

 

স্বপ্নদুয়ারে রেজিষ্ট্রেশন না করেও আপনার ফেসবুক আইডি দিয়েই মন্তব্য করা যাবে। নীচের টিক চিহ্নটি উঠিয়ে কমেন্ট করলে এই পোষ্ট বা আপনার মন্তব্যটি ফেসবুকের কোথাও প্রকাশিত হবে না।

টি মন্তব্য

2 thoughts on “আমরা যে ভাগ্য নিয়ে জন্মেছি, আগামী প্রজন্ম সে ভাগ্য নিয়ে আসবে না!

    • প্রলয় হাসান says:

      ইয়েস চলবে! 😀

      আামর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হচ্ছে, চাচা ছাড়া জীবনটা শুধু যে চলে তা নয়, নির্ভেজালভাবে চলে। অপরদিকে মামা-খালারা না থাকলে জীবনই বৃথা। অন্যভাবে বলতে পারো, ১০০ জান চাচা = একটা মামা/খালা। মানে শতজন চাচার কাছ থেকে যে আদর পাওয়া যায়, একজন মামা বা খালার কাছ থেকে তার চাইতেও বেশী আদর পাওয়া সম্ভব। 🙂

      অনেক ধন্যবাদ শামীম। তুমি স্বপ্নদুয়ারের প্রথম মন্তব্যকারী। ১ সের ধইন্যপাতা লও। B-)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *